আমার তখন উভয় সঙ্কট। সাংবাদিকদের ব্যাপার নিয়ে সরকারের সাথে মতানৈক্য হচ্ছে। কোনো ব্যাপারেই সরকারের সঙ্গে সমঝোতা হচ্ছে না। তার মধ্যে এ মামলার দেন-দরবারও করতে হচ্ছে। পারিপার্শ্বিক অবস্থান এমন দাঁড়াচ্ছে, সরকারের সঙ্গে সংঘর্ষ হতে হতেও এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী একদিন আমাকে ডেকে বললেন-তাড়াতাড়ি আপনার মামলার সুহারা করা যাবে না। ভিন্নপথ অবলম্বন করতে হবে।
ঘটনাটি আমিও বুঝতে পারছিলাম। আমার ধারণা হচ্ছিল পুলিশের কর্মকর্তারা তাদের হিসাবে প্রধান আসামীকে তারা গ্রেফতার করতে চান। প্রধান আসামী আমার আশ্রয়দাতা বন্ধু। কেউ গ্রেফতার হোক বা তার বিরুদ্ধে মামলা হোক তাতে আমার আপত্তি করার কথা নয়। অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হবে। কিন্তু আমার ভয় আদালতে বিচারের নয়। আমার ভয় হচ্ছে পুলিশি নির্যাতনের। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পুলিশি নির্যাতন তুঙ্গে উঠেছিল। তদন্তের নামে অভিযুক্তদের ওপর এমন অত্যাচার চালানো হতো, অনেক নির্দোষ ব্যক্তিও সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে। অনেকে সুস্থ শরীরে বাড়ি ফিরতে পারেনি। আর এ ব্যাপারে আমিও খুব কম বড় সাক্ষী ছিলাম না।
সেকালে অনেক দল নিষিদ্ধ না হলেও গোপনে কাজ করত। কখনো প্রকাশ্যে আসত না। এরা গ্রেফতার হলে তার খোঁজ পাওয়া যেতো না। এদের অনেকেই আমার বাসায় আসত। অনুরোধ জানাতে তাদের গ্রেফতারের খবর পত্রিকায় ছাপিয়ে দিতে। পত্রিকায় ছাপা হলে তাদের আর চির জীবনের জন্য অদৃশ্য হতে হতো না।
এ পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী জানতেন। তিনি আমার ভয় বুঝতে পেরেছিলেন–কেন আমি বন্ধুকে আদৌ গ্রেফতার করতে দিতে চাচ্ছি না। কারণ তিনি যতো নির্দেশই দেন না কেন তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ যে আমার বন্ধুর হাত-পা ভেঙে দেবে না তার নিশ্চয়তা দেয়া খুবই কঠিন ছিল।
এ পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী একটি অদ্ভুত পরামর্শ দিলেন। জানি না কোনো দেশের কোনো প্রধানমন্ত্রী এ ধরনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন কিনা। কেন আমার জন্যে নিয়েছিলেন আজও আমার কাছে বোধগম্য নয়। তিনি বললেন, আপনার বন্ধুকে ছ’মাসের জন্য কলকাতায় পাঠিয়ে দিন। আরএসপির ধর্মতলা স্ট্রিটে আপনাদের এককালের পার্টি অফিস আছে। কোলকাতায় থাকতে আপনার পার্টির সকল নেতারাই আমার পরিচিত ছিল। ওখানে গিয়ে সে ছ’মাস থাকুক। ছ’মাস পরে বাংলাদেশে ফিরুক। তখন পরিস্থিতি অনেক সহজ হবে। পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে তখন একটা সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল, এ মানুষটাকে আমি বুঝতে পারছি না। আমি বললাম আমার বন্ধুর পাসপোর্ট ভিসা কিছুই নেই। সে কী করে যাবে। তাকে কে পাসপোর্ট দেবে। প্রধানমন্ত্রী বললেন, তাকে সিলেট সীমান্ত দিয়ে পাঠিয়ে দিন। ওই সীমান্ত দিয়ে সহজেই ওপারে চলে যেতে পারবে। আমাকে সে কাজই করতে হলো।
বলতে পারেন–কে এই প্রধানমন্ত্রী, কী তার পরিচয়। তার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক। কী সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক। আমার বন্ধুকে তিনি কোনোদিন দেখেননি। তার সঙ্গে কোনো পরিচয় নেই। কিন্তু শুধুমাত্র আমার কথায় যে পরমার্শ তিনি দিলেন তা আইনের চোখে অবৈধ। আদৌ গ্রহণযোগ্য নয়। অথচ একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী আমাকে পরামর্শ দিলেন আমার বন্ধুকে বাঁচাবার জন্য। আমার ধারণা হচ্ছে তিনি তখন কোনো কিছুই করতে পারছিলেন না আমার জন্যে। অথচ তার কিছু করার গভীর ইচ্ছা ছিল। আমার আরো মনে হয়েছে, সেই ইচ্ছার ভিত্তিটি ছিল একান্তই রাজনৈতিক। রাজনীতির সঙ্গে আবেগ এবং মতামত সম্পর্ক বড় গভীর। রাজনীতির ধারক ও বাহকেরা যেমন বন্ধুর জন্য জীবনবাজি রাখতে পারে। তেমনি শত্রুর বিরুদ্ধে হতে পারে চরম হিংস্র।
এটাই ছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত উপনিবেশগুলোর জাতীয় নেতৃত্বের একটি চিত্র। ইন্দোনেশিয়ার সুকর্ণ থেকে শুরু করে বার্মার অং সান সুচি, ভারতের নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, জওহরলাল নেহেরু, মিসরের নাসের ও বাংলাদেশের শেখ মুজিবুর রহমানের একই চরিত্র। এরা জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন। ফলে সৃষ্টি হয়েছে অকুণ্ঠ অহমিকা। এই অহমিকার জন্যে তারা নিজের শ্রেণি চরিত্রের বাইরে গিয়ে কথা বলে ফেলেন। কখনো ধমক দেন পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে। এই চরিত্রগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা না হলে ইতিহাসে তারা কখনো চম বাম আবার কখনো চরম ডানপন্থী হিসেবে চিত্রিত হন। তাঁদের পক্ষে ভালোবাসা হয় পর্বত প্রমাণ। আর এক সময় বিরুদ্ধবাদিদের ঘৃণা হয় সাগরের মতো অতলান্ত। এই প্রেক্ষাপটে বিচার না হলে আমি মনে করি শেখ সাহেবের সেদিনের ভূমিকার সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের পরামর্শে বন্ধুকে ভারতে পাঠালাম। আপাতত এ ব্যাপারে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া গেল। কিন্তু ১৯৭৩ সালে আমার কাছে আদৌ স্বস্তিপূর্ণ ছিল না। শুরু হয়েছিল ভিন্নভাবে। ‘৭৩ সালের প্রথম দিকে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে অখণ্ড এশিয়া সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই সম্মেলনের উদ্যোগ নিয়েছিল ভারতের জাতীয় সাংবাদিক সমিতি (ন্যাশনাল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট) এবং আনন্দবাজার পত্রিকা। আমাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল ওই সম্মেলনে। যদিও সাংগঠনিকভাবে আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল ভারতের জার্নালিস্ট ফেডারেশনের। আনন্দবাজারের দৃষ্টিতে ওই সংগঠনটি ছিল বামপন্থীদের দখলে। একথা আমাকে বলেছিলেন আনন্দবাজারের মালিক সম্পাদক অশোক কুমার সরকার। নয়াদিল্পি সম্মেলনে কোলকাতা থেকে তাঁর সঙ্গে বিমানে যাচ্ছিলাম। তিনি আমাকে কমিউনিস্টদের আকৃতি-প্রকৃতি এবং চরিত্র খুব গভীরভাবে বুঝাচ্ছিলেন।
