আর আমি ভেবেছিলাম–এ ঘটনা থেকে রেহাই পেতে হলে আমাকে ভিন্ন পথ নিতে হবে। আমি প্রধানমন্ত্রীর নামে একটি দরখাস্ত দিলাম। আমি লিখলাম–যে অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে তার জন্যে আমিই দায়ি। আমার বন্ধু বা তার পরিবার আদৌ কোনো কিছু জানে না। ৭১ সালে বারবার আমি ওই বাড়িতে এসেছি, আশ্রয় নিয়েছি। আমার সাথে অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা ওই বাড়িতে যাতায়াত করেছে। আমরা কে কখন কী করেছি সে কথা বাড়ির কর্তাদের জানার কথা না। সুতরাং সকল দায়িত্ব আমার। এজন্যে যে কোনো দণ্ড আমি মাথা পেতে নিতে রাজি। দরখাস্তটি লিখে আমি প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠিয়ে দিলাম।
দু’দিন পরে পুরোনো গণভবনে গেলাম। প্রধানমন্ত্রী যেন চিৎকার করেই বললেন–আপনি কী করেছেন জানেন? আপনি যে অস্ত্র রেখেছেন সে অস্ত্র দিয়ে ঢাকা দখল করা যায় এবং ঢাকা ধ্বংস করে দেয়া যায়। গোয়েন্দাদের রিপোর্ট হচ্ছে–এমন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কেউ কোথাও অস্ত্র লুকিয়ে রাখেনি। আমার কিছু বলার ছিল না। প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে চুপচাপ থাকলেন। পরে জিজ্ঞাসা করলেন–আপনি দরখাস্ত করেছেন কেন? কে আপনাকে বলেছে সব দায়িত্ব ঘাড়ে নিতে? এ কাজটি কি না করলে চলত না। আমি চুপ করে থাকলাম। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ঠিক আছে আদালতে মামলা হোক। কমপক্ষে আপনার পনের বছর সাজা হবে। থাকেন স্বাধীন বাংলার জেলখানায়। সাথে সাথেই প্রধানমন্ত্রী হেসে ফেললেন। বললেন–আদালতের রায়ের পর আমি দণ্ড মাফ করে দেব আপনার দিকে তাকিয়ে। আমি বললাম–আমি কারো কাছে মাফ চাইতে শিখিনি। এই বলে প্রধানমন্ত্রীর কক্ষ থেকে বের হয়ে এলাম। দেখা হলো প্রধানমন্ত্রীর সচিব রফিকুল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে। রফিকুল্লাহ আমাদের সাথে ছাত্রলীগ করত। তার সঙ্গে ছিল দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। মাঝখানে তাকে দিয়ে অনেক কাজও করিয়েছি। অনেক কিছুই এখন মনে নেই। তবে কিছু ঘটনা এখনো ভুলতে পারিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার অধ্যাপক হুমায়ুন কবীর খুন হলেন। এই খুনের বৃত্তান্ত সঠিকভাবে এখনো কেউ বলতে পারে না। পুলিশ কোনো হদিস করতে পেরেছে বলে আমি জানি না। হুমায়ুন কবিরের স্ত্রী সুলতানা রেবু এক। সময় আমাদের দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। হুমায়ুন কবীর খুন হয়ে যাওয়ায় পারিবারিকভাবে অর্থনৈতিক বিপর্যয় দেখা দেয়। আমি বঙ্গভবনে গেলাম। দেখলামদূরে তার কক্ষে প্রধানমন্ত্রী বসে আছেন। পাশে দাঁড়িয়ে রফিকুল্লাহ চৌধুরী। রফিকুল্লাহকে বললাম, চেক বইটা নিয়ে আসুন। প্রধানমন্ত্রী, আপনার তহবিল থেকে দুই হাজার টাকার একটি চেক লেখেন সুলতানা রেবুর নামে। তার টাকার বড় প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী হেসে বললেন, আপনি কি প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন নাকি। হুমায়ুন কবীর কি মুক্তিযোদ্ধা? তার পরিবারকে টাকা দেবো কেন। আমি বললাম–টাকা দিতে হবে এটাই শেষ কথা। আমার যুক্তি হচ্ছে–আপনি প্রধানমন্ত্রী। আপনার আমলে হুমায়ুন কবীর খুন হয়েছে। আপনার সরকার এখনো আততায়ীকে ধরতে পারেনি। তাই আপনাকে জরিমানা দিতে হবে দুই হাজার টাকা। প্রধানমন্ত্রী জোরে হেসে ফেললেন। রফিকুল্লাহ চৌধুরী চেক লিখে নিয়ে এল। প্রধানমন্ত্রী স্বাক্ষর করলেন। এ ঘটনার কী ব্যাখ্যা হতে পারে সে কথা আমি কোনোদিন ভাবিনি। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আমাকে সেই সরকারের খাস দালাল বলা যেতে পারে। বলা যেতে পারে খয়ের খা। খয়ের খা না হলে এ কাজটি করা কি আদৌ সম্ভব এবং সকলেই ধারণা করতে পারে, গোপনে শেখ সাহেবের সাথে সম্পর্ক রেখে আমি প্রকাশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে কড়া কড়া কথা লিখছি। এ অভিযোগ আমি কম শুনিনি। কিন্তু কোনোদিন গায়ে মাখিনি। এ ঘটনার ভিন্ন চিত্রও আছে।
গণভবনে ঢুকলেই রফিকুল্লাহ চৌধুরী আমাকে বলতেন এই যে বিহারিদের দালাল দাদা আবার তদবিরে এসেছেন। আমি সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা। আমাদের পেশায় তখন অসংখ্য অবাঙালি সাংবাদিক ছিলেন। তাদের জীবনের নিরাপত্তা ছিল না। নিশ্চয়তা ছিল না চাকরিতে। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলাম ওরা এদেশে থাকতে চাইলে ওদের চাকরি খতম করা যাবে না। ওরা পাকিস্তানে যেতে চাইলে তাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আমার সে অনুরোধ প্রধানমন্ত্রী রেখেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর জীবনের এই দিকটি আমার মনে হয় কেউ কোনোদিন আবিস্কার করার চেষ্টা করেননি। আর সেই সুবাদে গণভবনে গেলে আমাকে বিহারিদের দালাল বলা হতো। এ হচ্ছে নানা সময়ের নানা ঘটনার কিছু বিবরণ।
সেদিন প্রধানমন্ত্রীর কক্ষ থেকে তার সচিব রফিকুল্লাহ চৌধুরীর কক্ষে এলাম। বললাম রফিকুল্লাহ একটি কাজ করতে হবে। অস্ত্র উদ্ধারের যে ঘটনাটি নিয়ে হইচই হচ্ছে তার সঙ্গে আমি জড়িত। আপনি ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষকে বলবেন, একটু ধীর গতিতে যেন এ ঘটনার তদন্ত করা হয়। কারণ আমার মনে হচ্ছে এ ঘটনার সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত। এই কথাগুলো বলে আমি গণভবন থেকে বের হয়ে এলাম।
পরের দিন গণভবনের ঢুকতেই রফিকুল্লাহ চৌধুরী বললেন, আপনার জন্য আমার বিপদ হয়েছে। আমি পুলিশ কর্মকর্তাদের কাছে আপনার ব্যাপারটি বলেছিলাম। এর পরেই ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা দল বেঁধে গণভবনে আসে। তারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। প্রধানমন্ত্রী আমাকে ডেকে বেশ কিছু কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। একথা শুনে আমি প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে ঢুকে গেলাম। বললাম-রফিকুল্লাহ চৌধুরীকে ডাকুন। রফিকুল্লাহ এল, প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, আপনি নাকি রফিকুল্লাহকে গালাগাল দিয়েছেন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে রফিকুল্লাহ নির্দোষ। আমি রফিকুল্লাহকে বলেছিলাম পুলিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে। রফিকুল্লাহ আমার কথা তাদের বলেছে। প্রধানমন্ত্রী বললেন, একথা রফিকুল্লাহ আমাকে বলেনি। তার বলা উচিত ছিল, আপনি তাকে ওই অনুরোধ জানিয়েছেন। এবার রফিকুল্লাহ মুখ খুলল। সে বলল-দাদা, আপনার মামলা নিয়ে অনেক গণ্ডগোল হবে। আমাদের দফতরে অসংখ্য চিঠি এসেছে আপনার বিরুদ্ধে। অভিযোগ করা হয়েছে, আপনার মামলা বলেই কোনো কিছু করা হচ্ছে না। অপরাধীদের ধরা হচ্ছে না। আর আমাদেরও বলার কিছু থাকছে না।
