তখন পোশাক পাল্টেছি। কিন্তু দাড়ি তখনো বড় হয়নি। রাস্তায় নামলে মানুষ চিনতে পারে। এমন সময় ওই বন্ধুর বাড়ির গৃহশিক্ষক এক মওলানা সাহেব ছুটিতে যেতে চাইলেন। তাঁর বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তার শূন্যপদে আমি নিয়োজিত হলাম। আমার দায়িত্ব কোরআন পড়ানো এবং নামাজ রোজা শেখানো। মওলানা সাহেব কিছুদিন আমার পড়ানো লক্ষ্য করলেন। বললেন–হুজুর আপনি বড় বেশি কথা বলেন। আর নকশালদের মতো গল্প করেন। বুঝলাম, এখানে থাকা নিরাপদ নয়। সিদ্ধান্ত হলো ভারতে চলে যাব। কিন্তু কিভাবে যাব। সেদিন পাকিস্তানি বাহিনী হোমনা-রামচন্দ্রপুর অভিযান চালাচ্ছে। আমাকে যেতে হবে ডেমরা, মাধবদী হয়ে নরসিংদী। সেদিন ঠিক দুপুরবেলা ওই বন্ধুর মোটরসাইকেলে চড়ে ডেমরা ঘাটে পৌঁছলাম। ওপারে আমার জন্যে অপেক্ষা করেছিল নরসিংদীর কাজী হাতে আলী। তার সাথে আগরতলা রওনা হয়ে গেলাম। সে অনেক কথা।
আবার জুলাইয়ের প্রথমে ঢাকায় ফিরলাম। ওই বন্ধুর বাসায়ই আবার উঠলাম। জুলাইয়ের শেষে আবার ভারত যাত্রা করলাম। সীমান্ত পাড়ি দিতে পারলাম না। আবার ফিরলাম ওই বন্ধুর আশ্রয়ে। শুনলাম, আমার মতো কেউ আছে জেনে ওই বাড়ি দু’বার তল্লাশি হয়েছে। আমার বন্ধু এককালে সামরিক বাহিনীর লোক ছিলেন। তাই পরিস্থিতি সামলাতে পেরেছেন।
এবার বিপদ এল ভিন্ন দিক থেকে। ওই এলাকায় একটি মসজিদ আছে। ওই মসজিদের ইমাম সাহেব অসুস্থ। পাড়ার লোক আমার আশ্রয়দাতাকে অনুরোধ জানাল। আমি যেন ওই মসজিদে শুক্রবার ইমামের ভূমিকা পালন করি। বন্ধু স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এবারও শেষ রক্ষা হলো। তিনি বললেন, আমাদের মওলানা সাহেব কোথাও ইমামতি করেন না। তাঁর পীর সাহেবের নিষেধ আছে। এ পরিস্থিতিতে আমাকে আবার ঢাকা ত্যাগ করতে হলো। তিনি আমাকে ঢাকার বাইরে যাবার ব্যবস্থা করলেন। আমাদের এক দলীয় কর্মী তার আত্মীয় আমার সাথে ঢাকা থেকে লঞ্চে বৃহত্তর নোয়াখালীর রায়পুরা গেলেন। রায়পুরা, লক্ষ্মীপুর, বেগমগঞ্জ এবং কুমিল্লা জেলার গুণবতী হয়ে আমি দ্বিতীয়বারের জন্য ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে পৌঁছালাম।
এবার সেই বন্ধুর পরিবার বিপর্যস্ত। স্ত্রী গ্রেফতার হয়েছেন অস্ত্র আইনে। আমি এখন কী করবো। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমাকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতেই হবে। তবে আমার দলের অভিযোগ হলেও আমি এ ধরনের ঘটনা আদৌ জানতাম না।
সে এক বিতর্ক ছিল স্বাধীনতার পরবর্তীকালে। সকলের হাতেই অস্ত্র। অস্ত্র রাখা নিষিদ্ধ নয়। যুদ্ধকালে অস্ত্র নিয়েছি হাতে। সে অস্ত্র কেন দেব? কাকে দেব। ফলে শুরু হলো অস্ত্রের ঝনঝনানি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অস্ত্র ব্যবহৃত হলো বাড়ি গাড়ি জমি দখলে! যে ঐতিহ্য থেকে আজো রেহাই পাওয়া যায়নি।
কিন্তু রাজনীতিকরা কী করবে। অস্ত্র আছে। প্রশিক্ষণ আছে। অস্ত্র জমা দেবো কেন। ভবিষ্যৎ বিপ্লবে কাজে লাগবে এ অস্ত্র। কিন্তু বিপ্লব কবে কখন হবে–এ অস্ত্র ততদিন আদৌ কার্যকর থাকবে কিনা এ বিতর্কের শেষ কোথায়। আমার বক্তব্য ছিল বিপ্লবের জন্য অস্ত্র মজুদ রাখার প্রয়োজন নেই। বিপ্লবের বড় অস্ত্র জনতার ঐক্য। আর বিপ্লবের কালে সামরিক বাহিনী বিপ্লবের শরিক হবে। তাই অস্ত্র মজুদ করে লাভ হবে না। এতে ব্যক্তিগতভাবে সন্ত্রাস হবে। এ সন্ত্রাস দিয়ে বিপ্লব হবে না। গণঅভ্যুত্থান দিয়ে বিপ্লব করতে হবে। কিন্তু এ তত্ত্ব শুনতে ভালো হলেও কাজে আসেনি। বারবার ঘটা করে অস্ত্র সমর্পণের নাটক করা হয়েছে। সবাই অস্ত্র জমা দেয়নি। আর এক সময় সরকারি বাহিনী সন্ত্রাস শুরু করলে নিজেদের বাঁচার জন্যে অস্ত্র রাখতে হয়েছে। কারণ শান্তি প্রতিষ্ঠার উপযোগী কোনো ব্যবস্থা তখন ছিল না। সর্বত্রই একটা সন্দেহ, বিভ্রান্তি, আশঙ্কা। কে মুক্তিযোদ্ধা, কে রাজকার। মা মুক্তিযোদ্ধা, বাবা শান্তি কমিটির লোক। ভাই আলবদর, অপর ভাই মুক্তিযোদ্ধা।
অপরদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ছিল চরম মতবিবাদ। কেউ এফএফ (ফ্রিডম ফাইটার্স) গ্রুপ, কেউ মুজিববাহিনী (বিএলএফ)-বেঙ্গল লিবারেল গ্রুপ, কেউ মামা গ্রুপ, কেউ কাদের সিদ্দিকী গ্রুপ-এ নিয়ে বিতর্ক এবং হানাহানির শেষ ছিল না। প্রতিহীন অপরিকল্পিত অস্ত্র যুদ্ধের অনিবার্য পরিণত মোকাবেলা করতে হলো দেশবাসীকে। তাই অস্ত্র কে কোথায় কেন রেখেছে তার হদিস বোধ হয় আরো মিলবে না। এ পরিস্থিতিতে খবর এল বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার। অঙ্গুলি নির্দেশ করা হতে থাকল আমাদের দলের দিকে।
শেষ পর্যন্ত আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গেলাম। তাকে ঘটনাটি বললাম। তিনি ঘটনা শুনে গম্ভীর হয়ে গেলেন। দু’দিন পরে আমাকে আসতে বললেন। আমি এই সময় বিভিন্ন মহলে খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করলাম। বুঝতে পারলাম ওই মামলা থেকে রেহাই পাওয়া খুব কঠিন হবে। কারণ অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে তখন সকলেই সোচ্চার। অপরদিকে রক্ষীবাহিনীর ভয়ে সকলেই তটস্থ। তাই প্রথমে আমি ঠিক করে নিয়েছিলাম প্রধানমন্ত্রীকে একটি অনুরোধ জানাব। অনুরোধ হচ্ছে–তদন্ত সাপেক্ষে আমাদের দলের কর্মী ও নেতাদের গ্রেফতার বন্ধ রাখার জন্যে। আমার চিন্তা হচ্ছিল আমাদের অন্যতম নেতা কমরেড রুহুল আমিন কায়সার সম্পর্কে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি টিবিতে ভুগছেন। একটি ফুসফুস নেই। অপরটিরও তিনভাগের এক ভাগ গিয়েছে। রায়েরবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। অসাধারণ মনোবলের অধিকারী। শেখ সাহেবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। পঞ্চাশের দশকে এক সাথে ছাত্র আন্দোলন করেছেন। আমার ভয় ছিল, তিনি রক্ষীবাহিনীর হাতে পড়লে আর বাঁচবেন না। তাই রুহুল আমিন কায়সারের নাম করে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ জানিয়েছিলাম আমার বন্ধুদের হয়রানি না করার জন্যে। প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং আমাকে বলেছিলেন দু’দিন পরে আসতে।
