তবে আমি আজো বলতে চাই, আমাদের একাত্তরের সংগ্রাম ছিল একেবারেই প্রস্তুতিহীন। চিন্তা ভাবনার স্বাধীনতার কথা থাকলেও মুহূর্তে সংগ্রাম শুরু হবে তা কেউই চিন্তা করেনি। ওই ধরনের চিন্তা-ভাবনা থাকলে প্রস্তুতি থাকত। আঘাত এলে প্রত্যাঘাতের ব্যবস্থা থাকতো। পলায়নই একমাত্র কাজ হতো না। অথচ একাত্তরে তাই ঘটল। সারা পৃথিবী জানল, সমঝোতার জন্যে আলোচনা হচ্ছে। আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা ভেঙে দেয়া হলো না। হামলা শুরু হলো। আন্দোলনের প্রথম নেতা তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত নিয়ে ধরা দিলেন। অন্যান্য নেতারা কেউ কোনো খবরই পেলেন না। নিজের উদ্যোগে পালাতে থাকলেন। আশ্রয় গ্রহণ করলেন পাকিস্তানের এক নম্বর বৈরী রাষ্ট্র ভারতে। সবাই ভারতে আশ্রয় নিলেন বা কোনো শর্তে ভারত আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল, সে প্রশ্নের জবাব আজো পরিষ্কার নয়। ১৯৭১ সালের মে মাসে আগরতলা গিয়েছিলাম। ত্রিপুরার এককালীন মুখ্যমন্ত্রী সুখময় সেনগুপ্তকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনারা আমাদের ঢুকতে দিলেন কেন? আমরা তো আপনাদের এক নম্বর শত্রু। এমন হতে পারে, পাকিস্তানে হিন্দুরা নিগৃহীত হচ্ছে এজন্যই হিন্দুদের ঢুকতে দিচ্ছেন। কিন্তু মুসলমানদের ঢুকতে দিচ্ছেন কেন! কেন ঢুকতে দিচ্ছেন রাজনীতিকদের। এটা কি মানবতা, না অন্য কিছু? সুখময় বাবু বলেছিলেন–আমাকে নয়, নয়াদিল্লিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি গান্ধীকে জিজ্ঞেস করুন। প্রশ্ন উঠতে পারে এতদিন পরে এ কথাগুলো লিখছি কেন? আমার লেখার লক্ষ্য হচ্ছে বাংলাদেশের জন্মের সময়কার নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তুলে ধরা। আমি বলতে চাচ্ছি কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়া, জাতীয় ভিত্তিতে কোনো ঐকমত্য ছাড়া এবং আদৌ কোনো প্রস্তুতি ছাড়া একটি যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ। সে যুদ্ধে আমরা যেমনভাবে পেরেছি–তেমনভাবে ব্যক্তিগত এবং সমষ্টিগতভাবে অংশগ্রহণ করেছি। সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনামাফিক এ যুদ্ধে কেউ যায়নি। সাধারণ মানুষের কাছে একটি কথাই ছিল মুখ্য। সে কথাটি হচ্ছে–যুদ্ধে জয়লাভ করতে না পারলে বাড়ি ফেরা যাবে না। মা-বোনের ইজ্জত থাকবে না। বাঁচানো যাবে না স্বজনকে। আমি বলতে চাচ্ছি যুদ্ধের হাল এমন হলে বিদেশিরা সাহায্য করতে আসবে কোন ভিত্তিতে। এ যুদ্ধের কোনো নেতা নেই, এ যুদ্ধ পরিচালনার কোনো ব্যবস্থা নেই। এ যুদ্ধে কোনো কিছুই সংগঠিত নেই। পরিস্থিতি এমন না হলে কোনো দেশ কি সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসে? এ যুদ্ধের একটি মাত্র ইতিবাচক দিক ছিল বাঙালিয়ানা। পূর্ব দিকে ত্রিপুরার বাঙালি, পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি। বাঙালিয়ানার জন্যেই প্রাথমিকভাবে তারা আমাদের কোলে টেনে নিয়েছিল। মনে হয় আমাদের গবেষকরা এখনো ভাবতে পারেনি, আমাদের পাশে বিহার কিংবা পাঞ্জাব থাকলে আমাদের সংগ্রামের রূপ কী হতো!
এ পরিস্থিতিতে আমাদের যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারতের অকুণ্ঠ সহযোগিতায় বিশ্ব জনমতের চাপে আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম। অনেকে বলতে পারেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকাই ছিল নিয়ামক শক্তি। আমরা এই যুদ্ধের নেতা। একথা সর্বৈব সত্য। কিন্তু তার চেয়ে বড় সত্য হচ্ছে–আমাদের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। শেষ দিন পর্যন্ত নেতৃত্বের জন্যে আমরা কোন্দল করেছি। কেউ কেউ ষড়যন্ত্র করেছি পাকিস্তানে ফিরে যেতে। মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে দলবাজি হয়েছে। মুজিববাহিনী হয়েছে বামপন্থীদের শেষ করার জন্যে। স্বাধীন বাংলাদেশে তাজউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্ব নিরাপদ নয়। অথচ আমরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। আমরা সোনার বাংলা গঠনের জন্য যুদ্ধ করেছি। কিন্তু সোনার পাথরবাটি হয় না। তাই সোনার বাংলাও হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি ছিল প্রতিদিনের ঘটনা। এই ঘটনা সঠিকভাবে অনুধাবন করিনি। কখনো মনে হয়নি যে, বাংলাদেশ গঠিত হয়েছে কতগুলো শকুনী ও গৃধিণীর জন্যে। সবাই সবকিছু পেতে চায়। সবাই বাড়ি, গাড়ি, নারী দখল করতে চায়। এ পরিস্থিতি বুঝতে পারলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারতাম যে, বেতন বোর্ড আন্দোলনে জিতেছি। সংবাদপত্রের কর্মচারীদের জন্যে বেতন বোর্ড গঠিত হয়েছে। সংবাদপত্রের কর্মচারীরা এবার সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারবে। কিন্তু তা হয়নি। দেশের রাজনীতি তখন ভিন্ন মোড় নিয়েছে।
সংবাদপত্র কর্মচারীদের বেতন বোর্ড গঠনের আগেই আমাদের দল-শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল নিয়ে একটি ঘটনা ঘটে যায়। আমাদের এক বন্ধুর বাড়িতে পুলিশ হানা দেয়। যে বাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতার হয়ে যায় আমাদের বন্ধুর পত্নী। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয় আমার বন্ধুর পরিবারের বিরুদ্ধে। কিছুদিন পর ওই পরিবারের সাথে সংশ্লিষ্ট আমাদের আরেক বন্ধু গ্রেফতার হয়ে যায়। তিনি আমাদের দলে শ্রমিক ফ্রন্টের সাথে জড়িত ছিলেন।
আমি এ খবরে শঙ্কিত হয়ে যাই। তখন রক্ষীবাহিনীর নির্যাতন চলছে সারাদেশে। রক্ষীবাহিনীর কবলে পড়লে অনেকেই ফিরে আসে না। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। ভাবলাম আমার বন্ধুর মধ্যে কেউ গ্রেফতার হলে হয়তো তারা ফিরে আসবে না। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করার সিদ্ধান্ত নিলাম। এই দেখা করা নিয়েও আমার মনে দ্বন্দ্ব ছিল। আমি তখন বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। আমি দৈনিক বাংলায় অনিকেত নামে সরকার বিরোধী কড়া কড়া উপসম্পাদকীয় লিখছি। আমি যদি অস্ত্র মামলার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে যাই তাহলে আমার সমালোচনা হবেই। এর পরেও আমি গোপালগঞ্জের লোক। টুঙ্গীপাড়া স্কুলের ছাত্র। আমাদের পরিবারের সাথে প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের দীর্ঘদিন সম্পর্কের কথা সকলের জানা। এ পরিস্থিতিতে আমার সমালোচনা হবেই। অন্তত সাংবাদিক বন্ধুরা বলবে, সাংবাদিকদের দাবি-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে আমি নিজের দলীয় স্বার্থে সরকারের সাথে আপোষ করেছি।
৯. ক্লান্ত প্রাণ এক
আমার দ্বিতীয় অসুবিধা আমার ওই বন্ধুর পরিবারটি নিয়ে। ১৯৭১ সালে ওই পরিবারটি বারবার আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল। ৯ মার্চ থেকে ঢাকা ছিলাম না। ঢাকায় ফিরেছিলাম মে মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ। তখন সবাই ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে। আর আমি কোটালীপাড়া থেকে নৌকায়, লঞ্চে এবং হেঁটে ঢাকা পৌঁছলাম সকলের অজান্তে। এপ্রিলে বরিশাল গিয়েছিলাম। বন্ধুদের সাথে আলোচনা হয়েছিল। বলেছিলাম–এ যুদ্ধ দীর্ঘদিন চলবে। অস্ত্র সংগ্রহ করে রাখতে হবে। প্রশিক্ষণ নিতে হবে। বরিশাল থেকে ফিরে গেলাম টুঙ্গীপাড়ায়। ফিরলাম বাড়িতে। তারপর ঢাকা। আশ্রয় মিলল ওই বন্ধুর বাড়িতে।
