আমি রাজি হলাম না। আমাদের যুক্তি সাংবাদিকতা ও সরকারি কর্মচারীদের পেশা এক নয়। তারা একই ধরনের কাজ করে না। তাদের সামাজিক অবস্থানও এক নয়। এই যুক্তির ভিত্তিতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের জন্যে ভিন্ন বেতন বোর্ড গঠিত হয়। পাকিস্তানেও তাই ছিল। বাংলাদেশেও তাই হবে। এ ব্যাপারে আমাদের নতুন কিছু বলার নেই। শেখ সাহেব রাজি হলেন। আমি জানতাম তাঁকে রাজি হতে হবে। সাংবাদিকদের ব্যাপারে তিনি কোনোদিনই খুব কঠোর ছিলেন না। আর বেশিক্ষণ আমাদের সাথে বিতর্কেও যেতেন না। সুতরাং ১৯৭৪ সালে সংবাদপত্র কর্মচারীদের জন্যে বেতন বোর্ড গঠিত হলো। শেখ সাহেব বলেছিলেন, এ বেতন বোর্ড কার্যকর হতে বিলম্ব হবে। আপনারা কিন্তু ঠকবেন। আজ আমার মনে হচ্ছে শেখ সাহেবের কথা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারিনি। তখনো বুঝতে পারিনি, একদিন দেশের সমস্ত পত্রিকা বন্ধ করে মাত্র চারটি পত্রিকা রাখা হবে। দেশের সব দল ভেঙে দিয়ে একটি মাত্র রাজনৈতিক দল থাকবে। সব পত্রিকায়ই হবে সরকারি পত্রিকা এবং সরকারের মুখপাত্র। সাংবাদিকরা হবে সরকারি কর্মচারী এবং সে ঘটনা ঘটল সংবাদপত্র কর্মচারীদের জন্য বেতন বোর্ড গঠনের এক বছরের মধ্যেই।
জাতীয় সংসদে সংবাদপত্র কর্মচারী বেতন বোর্ড উপস্থাপিত হলো এবং গৃহীত হলো। তখন আমি কোনো সাংবাদিককে অখুশি হতে দেখিনি। কেউ টু শব্দটি করেননি। কেউ কোনো প্রশ্নও তোলেননি। সকলেই খুশি হয়েছিলেন। সকলের কাছে মনে হয়েছিল একটা বিজয়।
প্রশ্ন উঠেছিল বেতন বোর্ডের চেয়ারম্যান কে হবেন? পাকিস্তান আমলে চেয়ারম্যান ছিলেন একজন বিচারপতি। তাই একজন বিচারপতির অনুসন্ধান করা হলো। তখন বিচারপতি আব্দুস সাত্তার পাকিস্তান থেকে ফিরেছেন। তিনি পাকিস্তান আমলের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। একাত্তরের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকা পড়ে যান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আফগানিস্তান হয়ে দেশে ফিরে আসেন। তখন তথ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তাহের উদ্দিন ঠাকুর। তিনি প্রস্তাব দিলেন সাত্তার সাহেবকে চেয়ারম্যান করা হোক। এ ব্যাপারে আলোচনা হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে। তিনি অনুমোদন করলেন। কিন্তু আবদুস সাত্তার সাহেব চেয়ারম্যান হলেও সেই বেতন বোর্ড কাজে আসেনি। তখন বুঝতে পারেনি, আওয়ামী লীগ সরকার আদৌ ওই বেতন বোর্ড কার্যকর করবে না। তাদের লক্ষ্য ছিল একদলীয় শাসন চালু করা। একদলীয় সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদের সরকারি কর্মচারীতে পরিণত করা। এ পরিস্থিতি বুঝতে আমার দীর্ঘদিন লেগেছিল।
আজ অকপটে বলতে পারি, সেকালের রাজনীতি আমার কাছে পরিষ্কার ছিল না। পরিষ্কার ছিল না একটি প্রস্তুতিহীন যুদ্ধে কীভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। ভারত সহযোগিতা করলেও পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রই প্রথমদিকে আমাদের সহযোগিতা করেনি। পাশের দেশ নেপাল শেষ দিন পর্যন্ত আমাদের বিরোধিতা করেছে। পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো আমাদের সহযোগিতা করলেও সোভিয়েত ইউনিয়নকে পুরোপুরি আমাদের সমর্থনে আনতে দীর্ঘদিন চেষ্টা করতে হয়েছে। কারো কাছে স্পষ্ট ছিল না বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির চরিত্র কী হবে। কে তার নেতৃত্ব করবে। কোন শ্রেণি ক্ষমতায় আসবে। বাংলাদেশের দিকে তাকালে তখন এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া ছিল কষ্টকর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। কিন্তু আওয়ামী লীগ কোনোদিনই প্রকাশ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা দাবি করে দলীয়ভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগের ছ’দফায় প্রচ্ছন্নভাবে স্বাধীনতা ইঙ্গিত থাকলেও স্বাধীনতার সুস্পষ্ট দাবি ছিল না। শুধুমাত্র সম্বল ছিল শেখ সাহেবের ৭ মার্চের জনসভার ঘোষণা। আমি যতদূর জানি শেখ সাহেবের ৬ দফা ঘোষণার পূর্বে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটিতে পেশ করা হয়নি এবং পাস করাও হয়নি। এ ব্যাপারে ব্যক্তিগতভাবে আমার সাথে শেখ সাহেবের আলোচনা হয়েছে ছ’দফা ঘোষণার পর। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এ ঘোষণা সঠিক হলো কি? কেউ জানল না অথচ আপনি ঘোষণা দিয়ে ফেললেন? শেখ সাহেব হাসলেন। আঁটি গোপালগঞ্জের ভাষায় বললেন, সময় সময় এমন করতে হয়। দেখেন না কী হয়। আমি তো বল ছুঁড়ে দিয়েছি। আমার কিন্তু তখনও মনে হয়নি, তিনি নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আওয়ামী লীগ ব্যতীত কোনো দলেরই এ ধরনের মানসিক প্রস্তুতিও তখন ছিল না। সদ্যগঠিত সর্বহারা পার্টি পূর্ববাংলা স্বাধীন করার স্লোগান দিচ্ছিল। আরো লক্ষণীয়, আওয়ামী লীগ ব্যতীত কোনো দলেরই এ ধরনের মানসিক প্রস্তুতিও তখন ছিল না। কিন্তু তারাও প্রকাশ্যে আসছিল না। আর আমি যতদূর জানি বাংলাদেশের মানচিত্র সম্বলিত জাতীয় পতাকাটি সর্বহারা পার্টিরই সৃষ্টি। ঝালকাঠির কোনো একটি এলাকায় ১৯৭০ সালে ১ জানুয়ারি উত্তোলন করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে কেউ ভিন্ন তথ্য দিতে পারলে আমি মেনে নিতে রাজি আছি।
এ পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ আসে। ৩ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করেন। সেকালের পূর্ব পাকিস্তান। অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশ অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে, রাতারাতি প্রায় সকল রাজনৈতিক দল পূর্ব পাকিস্তান শব্দটি কেটে বাংলাদেশ শব্দটি জুড়ে দিতে থাকে এবং সকলেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা দাবি জানাতে থাকে। আমার কাছে কোনোদিনই এ পরিস্থিতি স্বাভাবিক মনে হয়নি। রাতারাতি দলের নাম পাল্টালেই জনগণের মন-মানসিকতা উত্তরাধিকার ও ঐতিহ্যের সূত্রে পাওয়া। ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন হয় তা আমি বিশ্বাস করি না। আমি তাই আমার সেদিনের বন্ধুদের কাছে বলেছিলাম, এভাবে একটি দেশ স্বাধীন হয় না। খুব বেশি হলে স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করা যায়। আমি বলেছি, ভারত আমাদের যুদ্ধে সহযোগিতা বা সাহায্য করবে এ ধারণা আমি করিনি। আমি সমাজতন্ত্রের রাজনীতি করি। এ রাজনীতি সম্পর্কে যতদূর লেখাপড়া করেছি তাতে আমাদের ধারণা এ ধরনের ঘটনা ঘটার কথা নয়। আমার কাছেও মনে হয় আমার ধারণা একান্তই সঠিক। এ মুহূর্তে সে বিতর্কে আমি যাব না।
