সাংবাদিকতা পেশায় বারবারই একটি প্রশ্ন উঠছে। প্রশ্নটি হচ্ছে প্রুফ রিডাররা সাংবাদিক হলো কী করে। প্রথম বেতন বোর্ডের সংজ্ঞায় এরা তো সাংবাদিক হতে পারে না। এ প্রশ্নটি বিতর্কিত। পাকিস্তান আমলে এ প্রশ্নের সুরাহা হয়নি। সেকালের পূর্ব পাকিস্তানে এ প্রশ্নের একটি সমাধান হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে হয়নি।
ষাটের দশকে প্রথম দিকে আমি জেলে ছিলাম। ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক হিসেবে জেলে গিয়েছিলাম রাজনৈতিক কারণে। তখন ইউনিয়নের নেতা ছিলেন সালাউদ্দিন মোহাম্মদ। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন মোজাম্মেল হক। তাদের সময় প্রুফ রিডারদের সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য পদ দেয়া হয়। সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য হওয়ার সুবাদে প্রুফ রিডাররা সাংবাদিক হয়ে যায়। অনেকে বলেন, নির্বাচনে জিতবার জন্যে প্রুফ রিডারদের ইউনিয়নের সদস্যপদ দেয়া হয়েছিল। সে বিতর্কে আমি যাব না। কারণ সবকিছুর দায়-দায়িত্ব আমার পূর্বসূরিদের। তবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান এই সিদ্ধান্ত সহজে গ্রহণযোগ্য হলেও পশ্চিম পাকিস্তানে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা যায়নি। পশ্চিম পাকিস্তানে একটি ভিন্ন সমস্যা ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ সংবাদপত্রের ভাষা হচ্ছে উর্দু। উর্দু পত্রিকায় প্রুফ রিডার নেই। আছে ক্যালিওগ্রাফিস্ট। প্রুফ রিডার ও ক্যালিওগ্রাফিস্ট সমার্থক নয়। সুতরাং পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিক পূর্ব পাকিস্তানের এ প্রস্তাব মেনে নিলো না। একটি অসঙ্গতি থেকেই গেলো। অর্থাৎ পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নে দু’ধরনের সদস্য থেকে গেলো। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের অনুমোদিত শাখা হলেও দু’ইউনিয়নের সদস্য পদের বিভিন্নতা ছিল। অবিভক্ত পাকিস্তানের সাংবাদিক ইউনিয়নের শেষ সম্মেলনে এ ব্যাপারে আমি একটি প্রস্তাব তুলেছিলাম।
সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছিলো ১৯৮৮ সালে ইসলামাবাদে। আমি প্রস্তাব তুলেছিলাম–এ সম্মেলনে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রুফ রিডার ও ক্যালিওগ্রাফিস্টদের সদস্য পদ দেয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হোক। প্রস্তাব তুলবার সাথে সাথে পশ্চিম পাকিস্তানের সাংবাদিকরা তীব্র প্রতিবাদ জানায়। আমি জানালাম-আমার প্রস্তাবের সমর্থক খোন্দকার গোলাম মুস্তফা–অর্থাৎ কে জি মুস্তফা। তখন কেজি মুস্তফা ছিলেন সাংবাদিকদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। তিনি আমাকে সমর্থন করায় প্রস্তাব উত্থাপন করা গেলো। সিদ্ধান্ত হলো পরবর্তী সম্মেলনে এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। অর্থাৎ যা ছিল তা-ই থেকে গেল। পশ্চিম পাকিস্তানে এক ধরনের এবং পূর্ব পাকিস্তানে অন্য ধরনের সদস্যই থেকে গেল। এ পরিস্থিতিতেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। বাংলাদেশের জন্মের পূর্বে প্রুফ রিডার ও ক্যালিওগ্রাফিস্টরা সাংবাদিক হিসেবে পরিগণিত হয়। পূর্ব পাকিস্তানে দৈনিক পাসবান নামে একটি মাত্র উর্দু দৈনিক ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই দৈনিকটি বন্ধ হয়ে যায়। সেই দৈনিকের ভবনই পরে বাংলার বাণী ভবন নামে পরিচিত। আমার বক্তব্য হচ্ছে প্রুফ রিডারদের সাংবাদিক হিসেবে গ্রহণ করা উচিত কি অনুচিত সে বিতর্ক আমাদের ক্ষেত্রে পাকিস্তান আমলেই শেষ হয়ে গেছে। এ ব্যাপারে আমার কোনো দায়িত্ব ছিল না।
সাংবাদিক পেশায় দ্বিতীয় বিতর্ক হচ্ছে–সাংবাদিক বেতন বোর্ডের পরিবর্তে সংবাদপত্র কর্মচারীদের বেতন বোর্ড গঠন। এ ব্যাপারে আমার কোনো ভূমিকা ছিল না তা সত্য নয়। আমি যতদূর জানি অন্য কোনো দেশে এ ধরনের বেতন বোর্ড নেই। সংবাদপত্র কর্মচারীদের জন্য বেতনের ভিন্ন ভিন্ন। সুপারিশ আছে। কিন্তু সাংবাদিকদের সাথে মিলিয়ে মিশিয়ে নয়। প্রেস শ্রমিক ও সাধারণ কর্মচারীদের বেতন ভাতার প্রশ্ন এসেছে সাংবাদিকদের পরবর্তীতে। একটির সাথে অপরটির কোনো সম্পর্ক নেই। আজকের পাকিস্তানেও নেই। কিন্তু বাংলাদেশে এমন কেন হলো?
আমি আগেই বলেছি সাংবাদিকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করতে গিয়ে এক সময় আমাদের বিপাকে পড়তে হয়েছিল। প্রেস শ্রমিক এবং সাধারণ কর্মচারীরা আমাদের আন্দোলনে অসহযোগিতা করতে থাকে। এ পটভূমিতে আমাদের পূর্বসূরিরা কথা দিয়েছিল, প্রেস শ্রমিক ও সাধারণ কর্মচারীদের বেতন বোর্ড গঠনের আন্দোলন হলে আমরা সহযোগিতা করবে। এ প্রশ্নটি সামনে আসে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। আমি তখন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। তখন পরিস্থিতিও পরিবর্তিত। অধিকাংশ পত্রিকা সরকারি পরচালনায় এবং আমার মনে হচ্ছিল–এক সময় সব পত্রিকার মালিক সরকারই হবে। এ সময় প্রেস শ্রমিক ফেডারেশনের একটি সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে তারা প্রেস শ্রমিকদের জন্যে প্রথম বেতন বোর্ড গঠনের দাবি জানায়।
সাংবাদিকদের প্রথম বোর্ড গঠিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। সাংবাদিকদের আন্দোলন ছিল দ্বিতীয় বেতন বোর্ড গঠনের। প্রেস শ্রমিকদের সম্মেলনে আমি প্রধান অতিথি ছিলাম। আমি তাদের বললাম, বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন সফল হবে না। আপনারা আমাদের সাথেই থাকুন। পরবর্তীকালে সংবাদপত্রের সাধারণ কর্মচারীদের সাথেও আলাপ হলো। সাংবাদিক ইউনিয়নের বৈঠকে বিস্তারিত আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয়, সংবাদপত্রের সকল কর্মচারীর জন্য একটি বেতন বোর্ড গঠিত হবে। এই বেতন বোর্ডের সুপারিশ ভিন্ন ভিন্ন পূর্ব থাকবে এবং ভিন্নভাবে নির্ধারিত হবে সাংবাদিক প্রেস শ্রমিক ও সাধারণ কর্মচারীর বেতন ভাতা। তখন কোনো মহলেই এর প্রতিবাদ উত্থাপিত হয়নি। এই প্রস্তাব নিয়ে আমরা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মজিবুর রহমানের সাথে দেখা করলাম। তিনি একমত হলেন না। তিনি বললেন, অন্যান্য প্রেসের কর্মচারীদের সাথে সংবাদপত্রের প্রেসের কর্মচারীদের কোনো মৌলিক তফাৎ নেই। সাধারণ কর্মচারী অর্থাৎ ম্যানেজার কেরানি বা টাইপিস্টেরও তফাৎ নেই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীর সাথে। সুতরাং তারা সাংবাদিকদের বেতন বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত হবে কী করে। তিনি প্রস্তাব দিলেন সাংবাদিকদের সরকারি কর্মচারীদের জন্যে নির্ধারিত বেতন কাঠামো মেনে নিতে। তখন রব কমিশনের রিপোর্ট বের হয়েছে। রিপোর্টে সরকারি কর্মচারীদের জন্যে দশটি গ্রেড নির্ধারিত হয়েছে। শেখ সাহেব বললেন, সাংবাদিকরা এই দশ গ্রেডের সাথে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব অবস্থান নির্ণয় করে নিক। তাদের জন্য নতুন বেতন বোর্ড করার কোনো প্রয়োজন নেই।
