ফয়জুর রহমান সাহেব কী করে ওখানে সেকালে জমি পেয়েছিলেন আমার কাছে আদৌ স্পষ্ট নয়। তার এই খামারবাড়িতে আমাকে তিনি একদিন আমন্ত্রণ জানালেন। সাথে আর এক ভভদ্রলোক ছিলেন। তিনিও এখন লোকান্তরিত। ফয়জুর রহমান প্রস্তাব দিলেন-বাংলাদেশ স্বাধীন করতে হবে–তিনি সেই লক্ষ্যে সরকারি চাকরি ছেড়ে দেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন জোরদার করতে যাচ্ছেন। তখন একাধিক ব্যক্তি এবং গ্রুপ আমাদের কাছে আসত। যখন আমরা ছিলাম চটকল শিল্প এলাকায় একচ্ছত্র নেতা তখন শিল্পের অর্থই ছিল মূলত চটকল। তবুও আমি অবাক হলাম এর কথায়। ভাবলাম আমাদের পরীক্ষা করছে না তো? জানতে চাচ্ছে না তো আমাদের মনোভাব। আমরা বললাম–আমরা বাংলাদেশ স্বাধীন করতে রাজি। কিন্তু আগে বলতে হবে-এটা কোন বাংলাদেশ হবে। আর একটি পাকিস্তান হবে না তো? সবকিছুই একই থাকবে–আর পূর্ব পাকিস্তানের পরিবর্তে বাংলাদেশ নাম হবে–এ ধরনের সংগ্রামের জন্য জান দিতে রাজি নই। ফলে আমাদের সমালোচনা জমল না। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে তার সাথে কোনোদিন আমার আর দেখা হয়নি। শুধু মনে গেঁথে গিয়েছিল, তার ওই প্রস্তাব। প্রস্তাব হচ্ছে একটি খাঁটি বাঙালি হোটেল খোলার প্রস্তাব। দেশ স্বাধীন হলো। তিনি হোটেল খুললেন না। মুখপাত্র এবং স্পেকসম্যান নামে দুটি সাপ্তাহিক পত্রিকা বের করলেন। পত্রিকা দুটি বাজারে কাটছে। একদিন তার পত্রিকায় শিরোনাম হলো–আমি যদি গ্রেফতার হয়ে যাই।’ শিরোনাম পড়ে অবাক হলাম। একদিকে গণকণ্ঠ। মওলানা ভাসানীর হক কথায় যেমন খুশি তেমন লিখছেন। অপরদিকে এ ধরনের পত্রিকার অজুহাত দিয়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা যে ক্ষুণ্ণ করার অপচেষ্টায় আমরা চিড়েচ্যাপ্টা। বুঝতে পারছি না মওলানা সাহেবই বা কী চাচ্ছেন এবং করছেন–তিনি শেখ সাহেবের বিরুদ্ধে কোনো চূড়ান্ত আন্দোলনে যাবেন না। তা খুবই স্পষ্ট। অপরদিকে সর্বহারা পার্টির হরতাল সমর্থন করছেন। এ পরিস্থিতিতে সত্যি সত্যি কেনো রাজনীতিই বোধগম্য হচ্ছিল না। সরকার সবকিছুর মধ্যে ষড়যন্ত্র দেখছেন। আর অন্য সকলে ভাবছে বাংলাদেশ ভারতের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
বিতর্ক তুঙ্গে উঠল সচিবালয়ে। প্রধান বিবেচ্য ১৯৭১ সালে সরকারি কর্মচারিদের ভূমিকা। আমি দৈনিক বাংলায় লিখলাম আর ওপার-এপার সেপার তিন মিলে এই স্পর্শ। বিতর্ক হচ্ছে ১৯৭১ সালে কারা সংগ্রামে ছিল। কোলকাতায় মুজিবনগর সরকারের যারা কর্মচারী ছিলেন তারা দেশে ফিরে যেন কেউকেটা হয়ে গেলেন। তারা চেষ্টা করলেন ভালো ভালো পদ দখল করতে। যারা দেশে ছিলেন তারা বলেন, আমরা কম কিসে? আমরা বন্দুকের সামনে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেছি। আমাদের জীবন ছিল প্রতিমুহূর্তে হাতের মুঠোয়। সেপার অর্থাৎ যারা পাকিস্তান ছিলেন–তাঁদের কথা হচ্ছে। আমরা আসতে পারিনি–এ জন্য আমরা দায়ী হবো কেন। আমরা পাকিস্তানে বদ্ধ জীবনযাপন করেছি। আমরা কম ভুগিনি। তাই আমাদের দোষী করা হবে কেন?
আমার মনে হয় সরকারি কর্মচারিদের সে বিতর্ক আজো শেষ হয়নি। এখন সংগ্রাম চলছে পদোন্নতি নিয়ে। সচিবালয়ে কোনো কাজ হোক বা না হোক, এ বিতর্কের শেষ নেই।
আর এ পরিস্থিতিতে সবচে’ বিপদে পড়ল সাংবাদিকরা। এ বিপদ সাংবাদিকদের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। সকলেরই ধারণা ছিল সব ব্যাপারেই সাংবাদিকরা কথা বলবে। এ ঘটনার শুরু পাকিস্তান আমলে। পাকিস্তান আমলে রাজনৈতিক শূন্যতার জন্যে সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের অনেক সময় রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে হয়েছে। মানুষ তাকিয়ে থেকেছে সংবাদপত্র এবং সাংবাদিকদের দিকে। আর সে যুগে রাজনীতিতে এটি সাধারণ ঐকমত্য ছিল। সে ঐকমত্যের ভিত্তি ছিল বাঙালির স্বার্থের প্রশ্নে। এ স্বার্থের প্রশ্নে পত্রিকাগুলোর এবং সাংবাদিকদের মোটামুটি এক সূর ছিল। মানুষ তকালীন সংবাদপত্রে একটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইঙ্গিত পেতো। দেশ স্বাধীন হবার পর পত্রিকার সে ভূমিকা থাকার কথা নয়, তা বলাই বাহুল্য। অপরদিকে অধিকাংশ পত্রিকার মালিকই তখন সরকার। তাই আমাদের করার তেমন কিছু ছিল না। কিন্তু সাংবাদিকদের এ সমস্যা কাকে বোঝানো যাবে। তাই সকল ব্যাপারেই আমাদের জড়িয়ে পড়তে হতো। আর অপরদিকে সাংবাদিকরা এখন নিজেদের সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। মনে হতো দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধের নামে সকলেই স্বাধীন। বাড়ি দখল, গাড়ি দখলের মতো অনেক সংবাদপত্র দখল করলেন। কেউ আবার এসএলআর কাঁধে ঝুলিয়ে সংবাদপত্র অফিসে এসে নির্দেশ দিত। সে নির্দেশ পালন করা না হলে জীবন বাঁচা মুশকিল। ফলে পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল, দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আছে। সে স্বাধীনতা ভোগ করার সুযোগ নেই। একথা বলার অবকাশ নেই।
এ সময়ে সাংবাদিকদের একটি নিজস্ব আন্দোলনে জড়িয়ে পড়তে হয়। এই আন্দোলন ছিল তাদের বেতন ভাতা নির্ধারণের। পাকিস্তান আমলে সাংবাদিকদের বেতন ভাতা নির্ধারণের। পাকিস্তান আমলে সাংবাদিকদের বেতন ভাতা নির্ধারিত হয়েছিল ১৯৬০ সালে। বেতন ভাতা নির্ধারণ করেছিল সাংবাদিক বেতন বোর্ড। বলা হয়েছিল ১৯৬৫ সালে ষাট বছর কেটে গেলে সাংবাদিকদের জন্যে দ্বিতীয় বেতন বোর্ড গঠন করতে হবে। নতুন করে বেতন ভাতা নির্ধারণ করতে হবে। পাকিস্তান আমলে বেতন বোর্ড গঠনের জন্যে আন্দোলন হয়। পাকিস্তান সরকার দ্বিতীয় বেতন বোর্ড গঠন করেছিল। কিন্তু বেতন বোর্ড রোয়েদাদ ঘোষণা করার পূর্বেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়। ফলে নতুন করে বেতন বোর্ড গঠনের প্রশ্ন দেখা দেয় এবং দাবিতে আন্দোলন গড়ে ওঠে।
