দুঃখজনক হলেও সত্য, এ পরিস্থিতি সঠিকভাবে কেউ অনুধাবন করার চেষ্টা করেনি। সকলেই পার্বত্য চট্টগ্রামের ষড়যন্ত্র জুজু দেখেছে। এক শ্রেণির সংবাদপত্রে উল্টাপাল্টা খবর ছাপা হয়েছে। মনে হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের সাথে আসছে না। আর এ সময় চট্টগ্রামের দৈনিক দেশবাংলার প্রথম পাতায় খবর হলো যে কোনো মুহূর্তে রাঙ্গামাটির পতন ঘটতে পারে। এ খবর প্রকাশের পর পত্রিকাটি নিষিদ্ধ হলো। বার্তা সম্পাদকসহ অসংখ্য সাংবাদিক কর্মচারি গ্রেফতার হয়ে গেল। আমরা অর্থাৎ সাংবাদিক ইউনিয়ন আরেক দফা বিপদে পড়ে গেলাম। অভিযোগ গুরুতর। এই সাংবাদিক কর্মচারীদের সহজে মুক্ত করা যাবে তা মনে হলো না। শুধুমাত্র ভরসা সেকালের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। আমার বিশ্বাস ছিল তাঁর কাছে কথা বললে হয়তো তাদের মুক্ত করা যাবে।
কিন্তু সহজে কাউকে মুক্ত করা গেল না। বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেয়া হলো। বন্দিদের মুক্তি দাবি করা হলো। কিছু কিছু সাংবাদিক কর্মচারীদের মুক্তি দেয়া হলেও বার্তা সম্পাদক মৃণাল চক্রবর্তীকে জেলেই থাকতে হলো। এ পরিস্থিতিতে আমি গিয়াস কামাল চৌধুরী পুরাতন গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গেলাম। তিনি আমাদের দেখে হেসে ফেললেন। বললেন, জানি আপনারা কেন এসেছেন। পৃথিবীর কোনো সরকার এ পরিস্থিতিতে কাউকে জামিনে মুক্তি দেয় না। আমি জামিনের ব্যবস্থা করব। তবে নির্মল সেনের ভাষার পরিবর্তন করতে হবে। তিনি সব ব্যাপারেই ডিমান্ড অর্থাৎ দাবি করেন। কোনো বিবৃতিতেই সরকারের কাছে আবেদন জানান না। এবার আবেদন অর্থাৎ আপিল করতে হবে। আপিল না করলে আমি মৃণালকে মুক্তি দেব না। আমি হেসে বললাম, শুধু একটি শব্দের জন্যে মৃণাল জেলে থাকবে? প্রধানমন্ত্রী বললেন, আমি প্রধানমন্ত্রী হলেও মানুষ। সেন্টিমেন্ট আছে। আপনাকে বিবৃতি দিতে হবে। বলতে হবে আমি প্রধানন্ত্রীর কাছে আবেদন করছি। তাহলেই সে মুক্তি পাবে। অন্যথায় নয়।
আমি বললাম, ঠিক আছে। আমি একটি সমঝোতার সূত্র দিচ্ছি। সূত্র হচ্ছে সাংবাদিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে একটি বিবৃতি বলা হবে–সাংবাদিক ইউনিয়ন চট্টগ্রামের দেশবাংলার বার্তা সম্পাদক মৃণাল চক্রবর্তীর মুক্তি দাবি করছে। মৃণাল চক্রবর্তীর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর মুক্তির জন্যে আবেদন জানানো হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী হেসে ফেললেন। তাঁর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদকে ডাকলেন। বললেন, চট্টগ্রামের ডিসিকে ফোন করে দাও, মৃণালকে যেন ছেড়ে দেয়। আর আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন মুক্তি পেয়ে মৃণালকে ঢাকায় আসতে বলবেন। সে যেন আমার সাথে দেখা করে।
মৃণাল চক্রবর্তী মুক্তি পান। তাঁকে নিয়ে পুরানো গণভবনে গেলাম। শেখ সাহেব মৃণাল চক্রবর্তীকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, জেলে বড্ড কষ্ট, আমি জানি। তোর বাবা মাকে বলবি আমার কোনো দোষ নেই। নির্মল সেন ডিমান্ড না করলে তুই অনেক আগেই মুক্তি পেতি। আমি জেলে ছিলাম। আমি জেলের কষ্ট বুঝি। তারপর তিনি তার অন্যতম সচিব মোহাম্মদ হানিফকে ডাকলেন। বললেন, মৃণাল চক্রবর্তীকে কিছু টাকা দিয়ে দিতে। আমি তখন দর্শক মাত্র।
কিন্তু সেকালে পত্রিকার সমস্যাই মুখ্য সমস্যা ছিল না। মূল সমস্যা ছিল রাজনীতির। এক অদ্ভুত অস্থিরতা বিরাজ করছিল। স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে এটাই ছিল স্বাভাবিক। তবু আমাকে বিব্রত করল সেকালের অনেক সমস্যা। অনেক সমস্যা আমার বোধগম্য হতো না। আমার কাছে প্রথম এবং প্রধান সমস্যা মনে হতো সাধারণ মানুষের ধ্যান-ধারণা নিয়ে। লক্ষ্য করেছি যে মানুষটি ১৯৭০ সালে আমার কাছে আসত, আমাকে তার বাসায় নিয়ে যেত। বলত–আমি ঢাকা শহরে একটি হোটেল দেবো। এই হোটেলের নাম হবে বাঙালি। ওই হোটলে বাঙালির ঐতিহ্যবাহী শত রকমের খাবার রান্না হবে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেখলাম মানুষটিকে সবাই রাজাকার বলছে। সেই মানুষটি কারাগারে যাচ্ছে। অপরাধ তিনি দুটি সাপ্তাহিক কাগজ প্রকাশ করেছিলেন। তাতে যাচ্ছেতাই আওয়ামী লীগ সরকারকে সমালোচনা করা হতো। আমারও মনে হতো এ ধরনের সমালোচনা সাংবাদিকতার নীতিমালা পরিপন্থী। অনেকদিন সে কথা কাউকে বলিনি। আজ তা বলছি। ভদ্রলোকের নাম ফয়জুর রহমান। যতটুকু মনে আছে তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ছাত্রজীবনে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সদস্য ছিলেন।
এ রাজনীতির একটি ভিন্ন ইতিহাস আছে। ১৯৫৩ সালে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ থেকে মুসলিম শব্দটি তুলে দেয়া হয়। ছাত্রলীগের একটি অংশ এর বিরোধিতা করে। তাদের মধ্যে ছিলেন আজকের আইনজীবীদের অন্যতম নেতা শামসুল হক চৌধুরী। এদের অফিস ছিল ৯০ মোগলটুলি আর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের অফিস ছিল ১৫৭ নবাবপুর রোড। এই ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন কামারুজ্জামান (শিক্ষক নেতা) আবদুল ওয়াদুদ পাটোয়ারী এবং পরবর্তীকালে আবদুল মোমিন তালুকদার, এমএ আউয়াল।
যারা শামসুল হক চৌধুরীর সাথে থেকে যান তাঁদের সাথে ছিলেন ফয়জুর রহমান সাহেব। যতদুর মনে আছে তিনি সরকারি চাকরি করতেন। যে কোনো উপায়েই হোক ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা প্রকল্প (ডিএনডি) এলাকায় কিছু জমি নিয়ে তিনি একটি বাড়ি নির্মাণ করেন। এ বাড়ির নাম ছিল খামারবাড়ি। সেকালে ডিএনডি এলাকায় বসতবাড়ি করার কোনো অনুমতি দেয়া হতো না। পরিকল্পনা ছিল এটা হবে ঢাকার পার্শ্ববর্তী সবুজ বলয়। এ সবুজ বলয় থেকে ঢাকা শহরে শাকসবজি আসবে। সে পরিকল্পনা কিভাবে যে ভেস্তে গেল তা আজো আমি জানি না। আজ এই এলাকায় জমির দাম আকাশ ছোঁয়া। এর প্রতিযোগিতা আকাশছোঁয়া।
