আমার দ্বিতীয় বক্তব্য ছিল–যুবলীগ নেতা মরহুম শেখ ফজলুল হক মনির একটি নির্দেশ নিয়ে। তখন ছাত্রলীগ ভাগ হয়ে গেছে। একদিকে নূরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল কুদুস মাখন। অপরদিকে আসম আব্দুর রব ও শাহজাহান সিরাজ। এ ব্যাপারে মনি ফোন করেছিলেন দৈনিক বাংলায়। তিনি অনুরোধ জানিয়েছিলেন রব-সিরাজের খবর না দেয়ার জন্যে। সে প্রসঙ্গ টেনে আমি বললাম-পরিস্থিতি পাল্টে গেলে কেমন হবে? যদি রব-সিরাজ ক্ষমতায় যায় এবং বলে যে নূরে আলম সিদ্দিকী ও আব্দুল কুদুস মাখনের সংবাদ যাবে না, তখন দৈনিক বাংলার সাংবাদিকরা কী করবে? সুতরাং এ ধরনের নির্দেশ দেয়া বাঞ্ছনীয় নয়। আমার বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী শেখ আজিজ উত্তপ্ত হলেন। উত্তেজিত হয়ে সভা ছেড়ে যেতে চাইলেন। আমাকে থামতে হলো। পরে তিনি মাইকে এলেন এবং পুরো বক্তৃতাটাই দিলেন আমার বিরুদ্ধে। অপরদিকে সরকার প্রেম আইন বাতিল করলেও নতুন নামে আরেক কালাকানুন জারি করল।
কিন্তু বিপদ কাটল না। গণকণ্ঠর পর সমস্যা দেখা দিলো চট্টগ্রামের দৈনিক দেশবাংলা নিয়ে। একদিন দেশবাংলায় প্রথম পাতায় বড় হরফে লেখা হলো, যে কোনো মুহূর্তে রাঙামাটির পতন ঘটতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামে তখন অশান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। তিনি এক সময় তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। পাকিস্তানের মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী হন। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের একাত্তরের সংগ্রামের ভূমিকা নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
সমস্যাটি ভিন্নরূপ নেয় কিছুদিন পর। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কিছুদিন পরে একটি নতুন স্লোগান শোনা যেতে থাকে। এই শ্লোগানটি হচ্ছে মুসলিম বাংলা গঠনের। মাঝে মাঝে খবর আসত পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার থেকে। একটি ধারণা জন্মেছিল সত্যি সত্যি কে বা কারা মুসলিম বাংলা গঠনের চেষ্টা করছে। এ নিয়ে তখন খুব লেখালেখি হচ্ছিল। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল আমরা যখন তখন সরকারের বিরুদ্ধে লিখতাম। সরকারের একটি মহল তাদেরও মুসিলম বাংলা সমর্থক বলে অভিহিত করত।
এ ব্যাপারে আমার কাছে কিছু কিছু চিঠিপত্র আসত। চিঠিতে কোনো নাম, ঠিকানা থাকত না। চিঠি হুমকির ভাষায় লেখা হতো। একখানি চিঠি এসেছিল ঢাকায় নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর জন্মবার্ষিকী পালন নিয়ে। চিঠিতে বলা হয়েছিলে দেশে জাকজমক করে দুর্গা পূজা, সরস্বতী পূজা হচ্ছে। এবার হলো নেতাজী দিবস। দেশটাকে তো ভারতই বানিয়ে ফেলবৈন। চিঠির নিচে লেখা থাকত, ইতি পলাতক রাজাকার ও আলবদর।
এ ধরনের চিঠি পেতে পেতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমার তেমন কিছু মনে হতো না। অনেক সময় পলাতক আলবদররা তাদের দুঃখের কথা লিখত। অনেকে লিখতেন তাদের নাকি বিনা দোষে হয়রানি করা হচ্ছে। এসময় কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকের কাছ থেকেও চিঠি পেতাম। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে লিখছি বলে তারা অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করতেন। তাঁরা নাম ঠিকানা দিতেন। কিন্তু সেই ঠিকানায় তাদের কোনোদিন পাওয়া যেত না। আমার বরাবরের অভ্যাস ছিল ঠিকানা থাকলে পত্র লেখকদের চিঠি জবাব দেওয়ার। ঠিকানা না থাকলে বা আমার লেখা ফেরত এলে আমি পত্রিকার পাতায় সে চিঠির জবাব দেওয়ার চেষ্টা করতাম। তারপরও আমাকে কম গালি শুনতে হতো না।
এই পরিবেশে মুসলিম বাংলার শ্লোগান শুনেছি। অনেকই দায়ী করেছেন, কে বা কারা নাকি মুসলিম বাংলার সদস্যদের কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্যে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। কেউ কেউ মুসলিম বাংলার পোস্টারের কথাও বলেছেন। কিন্তু আমার চোখে তেমন কোনো পোস্টার পড়েনি। আমার কাছে সব পরিস্থিতিটাই গোলামাল মনে হয়েছে। যারা পাকিস্তান চাননি তারা ষড়যন্ত্র করছে ঠিকই। কিন্তু সে ষড়যন্ত্র আমার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার সেই আবেগময় মুহূর্তে কোনো মহল ষড়যন্ত্র করে সফল হবে আমি তা কখনও ভাবিনি। বিদেশি রাষ্ট্রের সক্রিয় সাহায্য ছাড়া ওই ধরনের ষড়যন্ত্র আদৌ সফল হবে বলে আমার কখনোও মনে হয়নি।
কক্সবাজার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ষড়যন্ত্র হচ্ছে বা সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে এই সংবাদের প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি ভিন্ন অবস্থা ছিল। প্রশ্নটি বাংলাদেশের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। মুখ্য প্রশ্ন হচ্ছে বাংলা ভাষাভাষীদের স্বাধীনতা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানের ঐক্য সূত্র কোথায়? যে ভাষাগত আবেগের ভিত্তিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের সে ধরনের আবেগ থাকাই স্বাভাবিক নয় কি? পাকিস্তান আমলে তাদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা শহর রাঙ্গামাটিকে ডুবিয়ে দিয়ে লেক সৃষ্টি করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন। পাকিস্তান সরকারের সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোটি কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে রাঙ্গামাটিকে। নগরের সাথে এলাকার মানুষের শত শত বছরের ঐতিহ্য ডুবিয়ে দেয়া হয়েছে। ছিন্ন হয়েছে অতীতের সাথে ঐতিহ্যের যোগসূত্র। সেই আবেগ মথিত এলাকায় কোনো সমস্যার সমাধান হয়নি পাকিস্তান আমলে। কেউই বুঝতে চায়নি যে একটি ঐতিহাসিক শহরকে ডুবিয়ে দিয়ে তাদের উদ্বাস্তু অধিবাসীদের অন্যত্র পুনর্বাসিত করলেও আবেগের স্থানটি শূন্যই থেকে যায়। সেই শূন্যস্থান পূরণ সময়সাপেক্ষ। এছাড়া পাকিস্তান সরকার এই অসহায় মানুষগুলোকে পুনর্বাসিত করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রামের হাজার হাজার অধিবাসী সে সময় পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয় অনেক চোখের জলে। তাদের সেই চোখের জলের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ করেনি কোনো বাঙালি। তাদের বাস্তুচ্যুত করে বাঙালিরা একটি লেক পেয়েছে। ওই লেকের জলে কাপ্তাইতে বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে। কাপ্তাই এর বিদ্যুৎ বাংলাদেশকে আলোকিত করছে। কিন্তু আলোকিত করতে পারেনি পার্বত্য এলাকার মানুষকে। এই অনুভূতি ও ক্ষত বড় বাস্তব। এই ক্ষত না শুকাতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। যে স্বাধীনতা নিয়ে বিভ্রান্তি ছিল সকল মহলে। এক শ্রেণির সরকারি মহল বাহাত্তর সাল থেকেই সন্দেহ করতে শুরু করেছিল যে পাহাড়িদের সাথে মিলছে না। মিলবে না। এখানে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।
