এ হচ্ছে ১৯৭৩ সালের প্রথমদিকের কথা। মনে হচ্ছিল পরিবেশ যেন রুদ্ধ হয়ে আসছে। দেশে হয়তো বা একটা অঘটন ঘটে যাবে। এমন সময় আমরা সাংবাদিক ইউনিয়নের জাতীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করি। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানের একটি জাতীয় সাংবাদিক ইউনিয়ন ছিল। সে ইউনিয়নের নাম ছিল পাকিস্তান ফেডারেল ইউনিয়ন অব জার্নালিস্ট।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রশ্ন দেখা দিলো নতুন করে জাতীয় ভিত্তিতে সাংবাদিক ইউনিয়ন গঠন করা হবে কিনা। পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন কে জি মোস্তফা। সদস্য ছিলেন–পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষ থেকে শহিদুল হক, ফজলুর রহমান ও তোয়াব খান। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম–জাতীয় ভিত্তিতে বাংলাদেশ সাংবাদিক ইউনিয়ন গঠন করতে হবে। এ জন্য একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হলো। নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম হলো বাংলাদেশ সাংবাদিক ফেডারেশন। সাংগঠনিক কমিটির সভাপতি হলেন কে জি মোস্তফা। সদস্য হলেন–তোয়াব খান, ফজলুর রহমান আতাউস সামাদ, গিয়াস কামাল চৌধুরী এবং আমি। কমিটির আহ্বায়ক হলেন–আতাউস সামাদ। শহীদুল হক তখন পাকিস্তানের থাকায় তাকে সদস্য করা গেলো না। ফজলুর রহমান সম্পর্কে আপত্তি এল। তিনি পাকিস্তান টাইমস-এর চট্টগ্রামের সংবাদদদাতা ছিলেন। ৭১-এ যুদ্ধের সময় তার ভূমিকা স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে ছিল না। তাই তাকে বাদ দিতে হলো। তোয়াব খান চাকরি হারালেন দৈনিক বাংলার। প্রধানমন্ত্রী প্রেস সেক্রেটারি হয়ে গেলেন। তার সদস্যপদ থাকল না। আতাউস সামাদ বিএসএস-এর প্রতিনিধি হয়ে নয়াদিল্লি গেলেন। তিনিও সদস্য থাকলেন না। এবার আমি সংগঠনের আহ্বায়ক হলাম। অবস্থা এমন দাঁড়াল যে সভা ডাকলে কেউ উপস্থিত হয় না। কোনো কোনো দিন আমি আর গিয়াস কামাল দু’জনে সভা করেছি। পরবর্তীকালে সকলের স্বাক্ষর নিয়েছি। আমাদের কোনো গণতন্ত্র ছিল না। আমরা পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের গঠনতন্ত্রই অনুসরণ করতাম। এ পরিস্থিতিতে কে জি মোস্তফা জানালেন–তিনি পেশা পরিবর্তন করতে চান এবং তিনি লেবাননের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সাংবাদিক ফেডারেশনের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনের প্রথম বৈঠক কে জি মোস্তফার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন আব্দুর রাজ্জাক চৌধুরী। এই অনুষ্ঠানে ইউনিয়নের নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) রাখার সিদ্ধান্ত হয়। প্রবীণ সাংবাদিক সন্তোষ গুপ্তকে গঠনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। আমি বিএফইউজের সভাপতি নির্বাচিত হলাম। গিয়াস কামাল সেক্রেটারি জেনারেল সৈয়দ জাফর সহসাধারণ সম্পাদক। আব্দুর রাজ্জাক চৌধুরী কোষাধ্যক্ষ। বিএফইউজে গঠনের পর প্রথম অধিবেশন হয় চট্টগ্রামে। সেই অধিবেশনে খসড়া গঠনতন্ত্র গৃহীত হয়। যদিও পরবর্তীকালে অভিজ্ঞতার আলোকে একেবারে বেআইনিভাবে ওই গঠনতন্ত্র আমি বারবার সংশোধন করেছি এবং ওই গঠনতন্ত্র ছাপাতে শেষ পর্যন্ত পাঁচ বছর লেগেছে।
বিএফইউজে’র প্রথম অধিবেশনেই সরকারের প্রতি একটি চরমপত্র দেয়া হয়। তখন সংবাদপত্রের জগতে পাকিস্তান আমলের কালাকানুন বহাল ছিল। বিএফইউজের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় যে ৩১ আগস্টের মধ্যে এই কালাকানুন বাতিল করা না হলে ১ সেপ্টেম্বর থেকে কোনো কাগজ বের হবে না। তখন সরকারের বিশ্বাস ছিল যে এ আইন বাতিল হবেই। কারণ পাকিস্তান আমলে এ আইনের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন হয়েছে। সে আন্দোলন সমর্থন করেছে আওয়ামী লীগ। সুতরাং ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এই আইন বাতিল করবেই। এই আইন বাতিল নিয়ে তখন একটি ঘটনা ঘটে। ২৮ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তল্কালীন সাংবাদিকতা বিভাগের নবীনবরণ উৎসব ছিল। এ অনুষ্ঠানের আমি ছিলাম বিশেষ অতিথি। প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন তথ্য ও বেতার মন্ত্রী শেখ আব্দুল আজিজ। টিএসসিতে অনুষ্ঠান হচ্ছিল। তথ্যমন্ত্রী আমার পরে কক্ষে ঢুকলেন। তিনি আমাকে দেখেই বললেন, নির্মল বাবু, আপনি আমাকে গালি দিতে পারবেন না। আমি কালাকানুন বাতিল করে এসেছি। আমাকে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, কালাকানুন বাতিল না করে আজকের সভায় গেলে নির্মল সেন তোমাকে ধোলাই করবে। আগে কালাকানুন বাতিল করো, তারপরে অনুষ্ঠানে যাও। মন্ত্রীর কথা আমার ভালো লাগল। ভাবলাম ইউনিয়নের প্রথম বিজয় হলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেষ রক্ষা হলো না। সকল মহলের দাবি ছিল সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সম্পর্কে আমাকে কথা বলতে হবে। আর বক্তৃতা দিতে গিয়ে প্রসঙ্গত একটি ঘটনার কথা আমি উল্লেখ করলাম। উল্লেখিত ঘটনাটি হচ্ছে মাত্র একদিন আগে সরকারি এক প্রেসনোটে বলা হয়েছে–লৌহজং শান্ত। ভালো কথা। কিন্তু অশান্ত থাকার খবরটি আপনারা আমাদের ছাপাতে দেননি। আবার লৌহজং শান্ত থাকার খবর দিয়ে মানুষের মধ্যে কৌতূহল সৃষ্টি করা হয়েছে লৌহজংয়ের ঘটনা সম্পর্কে। অথচ এ ব্যাপারে আমাদের হাত-পা বাঁধা আমরা কিন্তু লিখতে পারছি না লৌহজং-এ
কী ঘটেছিল। আমার যতদূর মনে আছে–লৌহজংয়ের খবরটি ছিল আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নিয়ে কোন্দল তুঙ্গে ওঠায় সে খবর আসতে দেয়া হয়নি পত্রিকায়।
