মওলানা সাহেব হাসপাতালে গেলেন। মওলানা সাহেবের সমর্থনে হরতালের ডাক দেয়া হলো। হরতালের দিন ছিল শঙ্কা ও ভয়ের এক পরিবেশ। আজকের হাইকোর্টের সামনে শিক্ষাভবনের কাছ থেকে বাংলাদেশ বিমানের কর্মচারী নূর হোসেনকে অপহরণ করা হলো। নূর হোসেন আর ফিরে আসেনি। এ খবর শুনে আমি দৈনিক বাংলায় গেলাম। দেখলাম ইতিমধ্যে সরকার থেকে একটি নির্দেশ এসেছে। নির্দেশে বলা হয়েছে, হরতাল সম্পর্কিত কোনো খবর যাবে না। তখন আজকের মতো পরিবেশ ছিল না। আজকের সরকারের আদেশ অমান্য করে কোনো কোনো খবর ছাপা যায়। কিন্তু সে সুবিধা তখন ছিল না। তখনো পাকিস্তান আমলের সংবাদপত্র সম্পর্কিত কালাকানুন বহাল আছে। তখন দেশের সকল বিজ্ঞাপনের মালিক সরকার। আর এছাড়া আছে সশস্ত্র ক্যাডার। অধিকাংশ পত্রিকা সরকারের ব্যবস্থাপনায় চলছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও সাহস করে লেখা লোকের খুবই অভাব ছিল। আমাকে দৈনিক বাংলার সাংবাদিকরা ঘিরে ধরল। তারা বলল, একটা কিছু করতে হবে। আমি ভাবলাম আমার করার কী আছে। জরুরি ভিত্তিতে সে মুহূর্তে ইউনিয়নের সভা ডাকাও সম্ভব নয়। কোনো প্রস্তাব নিয়ে কার্যকর করাও কঠিন। আমি বন্ধুদের কথা দিলাম। ব্যক্তিগতভাবে হলেও আমি কিছু করব। ঝুঁকিটা আমিই নেব।
আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমার কলামে আমি হরতাল নিয়ে লিখব। সেদিনই আমি লিখেছিলাম আমার বহু আলোচিত উপসম্পাদকীয়। যার শিরোনাম ছিল–হরতাল হয়েছে–হরতাল হয়নি। আমি চেষ্টা করেছি আমার লেখার মধ্য দিয়ে সরকারের নির্দেশ অমান্য করতে। আমি আমার লেখার মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে চেষ্টা করেছি হরতাল হয়েছে। যতটুকু হরতাল হয়েছে ততটুকু খবর দেয়ার অধিকার আমার আছে। আমি লিখতে পারব না যে আদৌ হরতাল হয়নি। সেদিন আমি লিখেছিলাম–রাজধানী ঢাকা শহরে বড় বড় সড়কে কোনো গাড়ি ছিল না। হরতাল হয়েছে। হরতাল হয়নি। আমি লিখেছিলাম সরকারি ও বেসরকারি দফতরে অসংখ্য কর্মচারী উপস্থিত হয়নি। আবার কেউ কেউ হাজির হয়েছে। হরতাল হয়েছে। হরতাল হয়নি। এ ছিল আমার এক ধরনের প্রতিবাদ। সরকারি নির্দেশের ফলে আমি যা দেখেছি তা লিখতে পারছিলাম না। এই মর্মান্তিক জ্বালার কথা আমি কোনোকালেও কাউকে বোঝাতে পারিনি। আজও পারছি না। আমি সাংবাদিক হিসেবে রাজপথে দেখে এলাম পুলিশের গুলিতে মানুষ মারা গেল। অফিসে এসে দেখলাম পত্রিকায় ছাপানো যাবে না যে কেউ পুলিশের গুলিতে মারা গেছে। এ ঘটনার বিবরণ ছাপা যাচ্ছে না, তাও পত্রিকায় উল্লেখ করা যাবে না। অর্থাৎ সরকার বোঝাতে চাচ্ছে-এই মিথ্যা সংবাদ পরিবেশনের জন্যে সাংবাদিকরাই দায়ী। তাদের কোনো দায়িত্ব নেই।
এ এক মর্মান্তিক জ্বালা। কখনো সরকারি নির্দেশ, কখনো মালিকের নির্দেশ, কখনো সন্ত্রাসীর বা কখনো ঋণখেলাপীর হুমকিতে সাংবাদিকদের যে লেখার কথা তা লিখতে পারে না। বলতেও পারে না যে পত্রিকায় এই লেখালেখির ব্যাপারে তাদের ভূমিকা গৌণ। প্রকৃতপক্ষে তারা দায়ী নয়। কিন্তু কে শুনবে এ কথা।
এ পরিস্থিতিতেই আমাকে সেদিন এ উপসম্পাদকীয় লিখতে হয়েছিল। আজো সে কথা শুনতে হয়। অনেকে পরিহাস করেন। কিন্তু অনুধাবন করতে চেষ্টা করেন না আমার সেকালের অবস্থা। আমি নিজে জানি যে নূর হোসেন অপহৃত হয়েছে। সে আর ফিরে আসছে না। আমি জানি অনশনরত ভাসানীর জন্য হরতাল হয়েছে। কিন্তু সে কথা আমি লিখতে পারব না। আমি যে সরকারি নির্দেশে সেকথা লিখতে পারছি না–সে কথাও উল্লেখ করতে পারব না। তাহলে আমার কী করার ছিল?
তবে মওলানা ভাসানীর অনশন নিয়ে ঘটনার এখানেই শেষ নয়। তকালীন বিরোধীদলগুলো মওলানা সাহেবের অনশনকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। এ দলগুলোর মধ্যে ছিল জাসদ, ভাসানী ন্যাপ, শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল, লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টি। সবার সিদ্ধান্ত হয়েছিল ২২ মে বিকেলে এক সর্বদলীয় জনসভা ডাকা হবে। ২৯ মে থেকে আইন অমান্য আন্দোলন শুরু হবে। কিন্তু পরবর্তীকালে আন্দোলনের কর্মসূচির প্রশ্নে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ায়। শুধুমাত্র একটি বিবৃতি দিতে সক্ষম হয়। তখন পল্টন ময়দানের জনসভা ডেকেছিল ভাসানী ন্যাপ। সেই জনসভাকেই সর্বদলীয় সভায় রূপান্তরিত করা হয়েছিল। কিন্তু সে জনসভা অনুষ্ঠিত হতে পারেনি। আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা সে জনসভা পণ্ড করে দেয়। পরবর্তীকালে আমাদের অর্থাৎ শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের পক্ষ থেকে একটি জনসভা আহ্বান করা হয়। সেকালে ঢাকার প্রায় সব হোটেল শ্রমিক ইউনিয়নগুলো আমাদের সাথে ছিল। প্রতিদিন এদের নিয়ে গণ্ডগোল হতো। মিছিল হতো। এ সমস্যা নিয়েই আমরা পল্টনে জনসভা করতে চেয়েছিলাম। আওয়ামী লীগের সদস্যরা এই জনসভা ভেঙে দেয়।
প্রকৃতপক্ষে এটাই ছিল সেকালের ছবি। কোথাও ১৪৪ ধারা জারি নেই। কিন্তু সভা-সমাবেশ করার কোনো উপায় ছিল না। পত্র-পত্রিকা সরকারি দখলে ছিল। বেতার টেলিভিশনও একই অবস্থা। গণতন্ত্র ছিল সরকারি নেতাদের প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ। এই পরিবেশে মওলানা সাহেবের অনশনের সময় বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে বিবৃতি দেয়া হয়েছিল। সিদ্ধান্ত হয়েছিল জনসভার পরে মওলানা সাহেবের কাছে যাওয়া হবে এবং তাকে অনশন ভাঙবার অনুরোধ জানানো হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কারোরই হাসপাতালে মওলানা সাহেবের সাথে দেখা করতে যাওয়া হয়নি। মওলানা সাহেব নিজ সিদ্ধান্তেই অনশন ভাঙেন।
