এর মধ্যে আর একটি ঘটনা ঘটে। ১৯৭২ সালের অক্টোবরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ গঠিত হয়। জাসদ গঠনের ইতিহাস আজো আমার কাছে রহস্যাবৃত। এ নিয়ে আমি ইতিপূর্বে দীর্ঘ আলোচনা করেছি। যারা জাসদ গঠন করলেন তারা তৎকালীন ছাত্রলীগের সবচাইতে পোড় খাওয়া কর্মী। তাঁদের সাহস অতুলণীয়। হঠাৎ তাঁরা একদিন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের শ্লোগান দিলেন এবং একটি দল গঠন করলেন; যে দল নিয়ে আদৌ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্ভব নয়। সমাজতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল একটি বিশেষ শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব করে। এ সংগঠনের বহুদলীয় রাজনীতির কোনো সুযোগ নেই। এ দলের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ব্যক্তিত্বেরই থাকার কথা। কিন্তু দেখা গেলো বহুদলীয় দলের ধাচে মেজর জলিলকে সভাপতি করে এ দলটি গঠিত হলো। মোটামুটিভাবে এদের সকলেই আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ থেকে এসেছে। এদের আচরণে একই ছাপ আছে। শুধু মুখে আছে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা এবং এখানটাই তাদের আওয়ামী লীগের সাথে একমাত্র পার্থক্য। তবুও এ দলটি তাদের কর্মীদের সংগ্রামী ঐতিহ্যের জন্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কাপন সৃষ্টি করেছিল। এদের রাজনীতির একটি বিশিষ্ট ধরন ছিল। এরা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সরকারের প্রতি চরমপত্র দিত। মিছিল-সমাবেশ করত। ভাঙচুর হতো। এক ভাঙচুরের পরিবেশে আরেক প্রতিবাদ দিবসের ডাক দেয়া হতো। স্বাভাবিকভাবেই তারা রাজনীতির অঙ্গনে একটি বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবার পরিবেশ সৃষ্টি করল।
কিন্তু লক্ষ করা গেলো–নির্বাচনের প্রশ্নে তারা আমাদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হতে রাজি হলো না। তারা ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেয়ার চেষ্টা করল। তাদের সেকালের কথাবার্তা শুনে আমার মনে হতো নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করার জন্যেই তারা মাঠে নেমেছে। কারণ তখন নির্বাচনবিরোধী একটি মনোভাবের জন্ম হচ্ছিল। সকলের কাছেই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছিল যে অবাধ নির্বাচন হবে না। সুতরাং এ নির্বাচন করে কোনো লাভ নেই। কিন্তু মুস্কিল হলো জাসদ নির্বাচনের মাঠে থাকলে নির্বাচন বর্জনের অবকাশ কোথায়? অপরদিকে তখন আওয়ামী লীগের মূল সংঘর্ষ হচ্ছিল জাসদের সাথে। জাসদের প্রার্থী হাইজ্যাক হচ্ছিল। আর জাসদ নেতৃবৃন্দ প্রতিদিনই হুমকি দিচ্ছিলেন, এ ধরনের আর একটি ঘটনা ঘটলে তারা হয়তো নির্বাচন করবে না। এ ধরনের বিবৃতি দিয়ে তারা নির্বাচনের পর্ব পার করে দিল। অন্য কেউই নির্বাচন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। এ সময় রাজনীতির অঙ্গনে সর্বহারা পার্টির নাম ডাক ছিল। একজন রহস্যময় রাজনৈতিক নেতা হিসেবে সিরাজ সিকদারের নামও সামনে আসছিল। সিরাজ সিকদারের সর্বহারা পার্টি ১৯৭১-এর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। তবে সেই অংশগ্রহণেরও ভিন্ন ব্যাখ্যা আছে। তখন পশ্চিমবঙ্গে চারু মজুমদার, জঙ্গল সাঁওতাল ও কানু সান্যালের নেতৃত্বে নকশালবাড়ি আন্দোলন শুরু হয়েছিল। তার ছাপ পড়েছিল আমাদের দেশের অনেক বামপন্থী দলের ওপর। তার মধ্যে সর্বহারা পার্টি একটি। এক সময় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতাদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। সে মতানৈক্যের ছাপ বাংলাদেশেও পড়ে। সেকালে নকশালবাড়ি আন্দোলনের নেতাদের চীনপন্থী বলে পরিচিত ছিল এবং সেই সুবাদে আমাদের দেশে চীনপন্থী রাজনীতিকদের বিভিন্ন অংশ নিজেদের চেয়ে নকশালবাড়ি আন্দোলনের অনুরূপ আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করে। ফলে ৭১-এর সংগ্রামে তাদের মধ্যে কারো কারো বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকলেও নকশালবাড়ি আন্দোলনকে অনুকরণ করতে গিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে তাদের ভূমিকা কখনোই সংশয় বিভ্রান্তিহীন সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। এই পটভূমিতে দেশ স্বাধীন হবার পর সর্বহারা পার্টি আত্মগোপন করেই রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে থাকে। তারা শ্রেণিশত্রু খতমের শ্লোগান দিতে থাকে। অথচ সে শ্লোগান তখন বিতর্কিত হয়ে গেছে খোদ পশ্চিমবঙ্গে। তবুও শ্রেণিশত্রু খতমের রাজনীতি বেশ কিছু দিন হলেও তীব্র প্রভাব ফেলেছিল জনমনে।
মোটামুটিভাবে এটাই ছিল তৎকালীন স্বীকৃত বিরোধীদলগুলোর আন্দোলনের চিত্র। সব দল মিলিয়ে মওলানা ভাসানী ছিলেন বিরোধী আন্দোলনের নেতা। কিন্তু শেখ সাহেবের আমলে কোনোদিনই তার ভূমিকা খুব স্পষ্ট ছিল না। তবুও বিরোধীদলগুলো তাঁর দিকেই চেয়ে থাকত। এই পরিবেশে মওলানা ভাসানী ১৯৭৩ সালের মে মাসে আমরণ অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। তিনি তখন ভাসানী ন্যাপের মতিঝিল অফিসে অবস্থান করছিলেন। ভাসানী অনশন শুরু করলেও সরকারের পক্ষ থেকে প্রথম কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করা হলো না। একদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ন্যাপ অফিসে গেলেন। মওলানা সাহেবকে অনুরোধ করলেন অনশন ভাঙতে। শেষ পর্যন্ত অনুরোধ করলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাবার জন্যে। কিন্তু মওলানা সাহেব রাজি হলেন না। তখন আমি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। গিয়াস কামাল চৌধুরী সাধারণ সম্পাদক। আমরা কয়েকজন সাংবাদিক সঙ্গে নিয়ে মওলানা সাহেবের কাছে গেলাম। বললাম, আপনাকে হাসপাতালে যেতে হবে। মওলানা সাহেব বললেন, আমি সাংবাদিকদের কথায় কোনোদিন দ্বিমত করিনি। আমি অনশন ভাঙব না, হাসপাতালে যাব। মওলানা সাহেব হাসপাতালে চলে গেলেন।
