এই রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তি চালাবার দায়িত্ব দেয়া হলো একেবারেই অনভিজ্ঞ আত্মীয়-স্বজন এবং দলীয় কর্মীদের। এদের প্রথম এবং শেষ দায়িত্ব হলো লুটেপুটে খাওয়া। এদের সহযোগী হয়েছিলেন সর্বকালের আমলা সম্প্রদায়। একটি হিসেব নিলে দেখা যাবে এই সকল সম্পত্তির যারা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন তাদের মধ্যে অধিকাংশেরই এখন ঢাকায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ আছে। এর সুযোগ নিয়েছে এবং আরো সুযোগ নিচ্ছে সমাজতন্ত্রী বিরোধী মহল। তারা এখনো লিখছে বাংলাদেশের সকল সর্বনাশের কারণ সেকালের সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করা। তাদের ভাষায় শ্রমিকরাই নাকি সবকিছু লুটপাট করেছে। ওই শিল্পগুলো ব্যক্তি মালিকানায় দিয়ে দেয়া হলে নাকি এমন হতো না।
এ পরিস্থিতিতে পরিষ্কার যে রাষ্ট্রায়ত্ত করার নামে তখন শিল্প এলাকায় এক ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। উৎপাদন বন্ধ হয়। একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশে এটা অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। সড়ক সেতু কল-কারখানা না থাকলে উৎপাদন বন্ধ হয়েছে। এই বাস্তবতা মেনে নেয়া হলে সেকালে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বা পণ্যের অভাবের একটি সহজ যুক্তি পাওয়া যেত। কিন্তু ঘটনা ঘটলো ভিন্নরকম। অথচ পাকিস্তান আমলে আমাদের টাকার মূল্য বেশি ছিল। অপরদিকে বিনা বাধায় ভারতীয় পণ্য আমাদের শূন্য বাজার দখল করে নিল এবং স্বাভাবিকভাবেই একটি ভারত বিরোধী মনোভাবের জন্ম নিল। কেউ বুঝতে চাইল না, সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হয়েছিল। আমাদের ভারত বিরোধিতার উত্তরাধিকার একাত্তর এর বিশেষ পরিস্থিতিতে থেমেছিল। কিন্তু ন’মাসের সংগ্রামে সমাজের শত শত বছরের কালিমা মুক্ত হতে পারে না। এছাড়া আমাদের প্রতিপক্ষ বসে ছিল না। একাত্তরে আমরা সকলে স্বাধীনতা চাইনি। একটি বিরাট অংশ পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। সুতরাং সুযোগ পেলেই যে তারা মাথাচাড়া দেবে এ কথা কারো না বুঝবার কথা ছিল না। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ছিল নির্বিকার। স্বাধীনতার পক্ষে বলে পরিচিত একশ্রেণির বুদ্ধিজীবী মুর্ধের মতো ভাবতে শুরু করলেন, দেশ পাকিস্তান মুক্ত হয়েছে। শুধু বাকি শোষণমুক্ত সমাজ গঠন। আমার নিজের ধারণা একাত্তরের সংগ্রামের চরিত্রের সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে শুধুমাত্র আমাদের দল শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল সংবিধান প্রণয়নকালে সংসদের সামনে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যাবার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আমাদের মিছিলের খবর পেয়ে সংসদ মুলতুবি হয়ে যায়।
সংবিধান প্রণয়নের পর ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন দখল করেছিল। সে নির্বাচন কেমন হয়েছিল তার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আমার আছে। আমাদের দলের প্রার্থী কাজী হাতেম আলী নরসিংদী থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। টেলিভিশনে প্রথম দিকে কাজী হাতেম আলী এগিয়ে আছেন বলে বারবার ঘোষণা দেয়া হলো। তারপর এই ঘোষণা বন্ধ হয়ে যায়। পরের দিন ভোরে আমি গণভবনে যাই। প্রধানমন্ত্রীর অন্যতম একান্ত সচিব নূরুল ইসলামের সাথে আমার দেখা হয়। তিনি আমাকে জানান, আপনাদের এই বাচ্চা প্রার্থী কাজী হাতেম আলী সারারাত আমাদের জ্বালিয়েছে। শেষ পর্যন্ত আমাদের প্রার্থী অর্থাৎ আওয়ামী লীগের মোসলে উদ্দিন ভূঁইয়াই জয়লাভ করেছে। আর একথা সকলেরই জানা, ওই নির্বাচনে আমাদের প্রার্থী কাজী হাতেম আলী তেতাল্লিশ হাজার ভোট পেয়েছিল। আওয়ামী লীগ প্রার্থী পেয়েছিল ছত্রিশ হাজার। আর নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় বলা হয়েছিল আওয়ামী লীগ প্রার্থী তেতাল্লিশ হাজার ভোট পেয়েছে। কাজী হাতেম আলী পরাজিত হয়েছে সাত হাজার ভোটে। নরসিংদীতে যারা এই কাজটি করেছেন তারা আমাদের চেনা। পরবর্তীকালে এক সময় আমাদের সাথে তারা শ্রমিক রাজনীতি করত। শুনেছি এখন তারা জাতীয় পার্টিতে আছে। শুধু কাজী হাতেম আলী নয়, সেকালের জাসদ সভাপতি মেজর জলিলকে এমনিভাবে পরাজিত করা হয়েছিল বরিশালের উজিরপুর আসনে। জাসদের রশিদ ইঞ্জিনিয়ারকে হারিয়ে দাউদকান্দির আসনে খন্দকার মোশতাক আহমেদকে বিজয়ী করা হয়েছিল। এটাই ছিল সেকালের আওয়ামী লীগের অধীনে নির্বাচনের চিত্র। তখন বিরোধীদল সংগঠিত ছিল না। ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি তখন সরকারের কাছাকাছি। বাদবাকি যারা আন্দোলন করার চেষ্টা করেছিল তারাও আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিরোধীদলকে ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টা যে হয়নি তা নয়। কিন্তু বিরোধীদল বলতে তখন শুধুমাত্র কিছু বামপন্থী দল। মুসলিম লীগ থেকে জামায়াতে ইসলাম পর্যন্ত সকল মৌলবাদ দল নিষিদ্ধ। বামপন্থী দলের মধ্যে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি ও মোজাফফর ন্যাপ মোটামুটিভাবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সমর্থক। বাদ বাকি আমাদের শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল, ভাসানী ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি নামে পরিচিত আরো দু’একটি দল এবং অলি আহাদের জাতীয় লীগ। সবাইকে জড়ো করলেও তাদের শক্তি খুব বেশি নয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে তখন মওলানা ভাসানীর নেতৃত্ব। এ সময় তিনি রহস্যজনক ভূমিকা পালন করেন।
উপরিউক্ত দলগুলোকে নিয়ে ১৯৭৩ সালে নির্বাচনের পূর্বে একটি জোট গঠনের চেষ্টা করা হয়। স্থির হয় ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচন করা হবে। এ সময় মওলানা সাহেব অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যান। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান হাসপাতালে মওলানা সাহেবের সাথে সাক্ষাত করেন। মওলানা সাহেবের সাথে কী আলোচনা হয়েছিল তা আজো জানা যায়নি। তবে লক্ষণীয় যে মওলানা সাহেব আরোগ্য লাভ করলেন। হাসপাতাল ত্যাগ করলেন। নির্বাচন নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ঢালাও কারচুপির অভিযোগ করলেন। কিন্তু তিনি বিরোধীদলের কারো পক্ষে নির্বাচনের প্রচারে গেলেন না। প্রকৃতপক্ষে নির্বাচনে বিরোধীদলের পক্ষে তেমন জোর হাওয়াও ছিল না।
