কিন্তু বিপদ দেখা দিলো সংগ্রাম শেষ হওয়ার পর। এটা ঐতিহাসিক সত্য যে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করা ও শেষ করা এক কথা নয়। এ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নতুন চেতনার জন্ম হয়েছে। নতুন আকাক্ষার সৃষ্টি হয়। তেমনি একটি চেতনা ও আকাক্ষার জন্ম হয়েছিল ১৯৭১ সালের সময়।
সেই সংগ্রামের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছিল একটি শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার স্বপ্ন। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে এই স্বপ্নকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই সংবিধানে সমাজতন্ত্র শব্দটি স্থান পেয়েছিল। স্বাধীন বাংলার সংবিধান দেখে মনে হতো সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের জন্যেই ৭১-এর সংগ্রাম করা হয়েছিল। কিন্তু এটা ছিল রাজনীতিক মিথ্যাচার। ভারতের সহযোগিতায় এবং ভারতের সাথে গোপন চুক্তি স্বাক্ষর করে আর যাই হোক সমাজতন্ত্র অভিমুখে সরকার বা সমাজ গঠন করা যায় না এবং এখান থেকেই শুরু হলো আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্কট। অর্থাৎ যা বিশ্বাস করি না তাকেই প্রতিপাদ্য হিসেবে ধরে সমাজ গঠনের চিন্তা আদৌ সম্ভব নয়। বলা হলো আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি আমরাই সমাজতন্ত্র করব। এই বক্তব্য থেকেই কর্মপন্থা প্রণীত হতে থাকল এবং বাস্তবের আঘাতে সব স্বপ্নই ভাঙতে থাকল বছর না ঘুরতেই।
মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি হলো, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে একটি মিলিশিয়া গঠন করা হোক। কর্নেল তাহের জনগণের সামরিক বাহিনী গঠনের সুপারিশ করলেন এবং তিনিও তাঁর কথায় আচরণে তাঁর তত্ত্ব প্রকাশের চেষ্টা করলেন। কিন্তু কেউই মনে রাখলেন না, আমাদের মূল সেনাবাহিনী ব্রিটেনের ঔপনিবেশিক কাঠামোতে তৈরি। এদের মধ্যে মনন স্বপ্নের শোষণমুক্ত সমাজের মতো নয়। তাই লক্ষ করা গেলো, সামরিক বাহিনী আর মুক্তিযোদ্ধারা এক হতে পারলেন না।
মিলিশিয়া গঠন করতে গিয়ে মারামারি হলো পিলখানায়। সেই সংঘর্ষ ঠেকাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে পিলখানা যেতে হয়েছিল। বাদ দিতে হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে মিলিশিয়া গঠনের কর্মসূচি। পরিবর্তে গঠিত হয়েছিল বিতর্কিত জাতীয় রক্ষীবাহিনী। আর এই রক্ষীবাহিনীভুক্ত ৮০ ভাগই ছিল মুজিববাহিনীভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা।
সম্প্রতি আমার এ বক্তব্যের সমর্থন মিলেছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতাদের কথায়। জাসদ নেতা হাসানুল হক ইনু লিখেছেন ৭ নভেম্বরের ঘটনা। তিনি লিখেছেন, জেনারেল জিয়া যতক্ষণ তাদের কজায় ছিল ততক্ষণ সাধারণ সৈনিকেরা বিপ্লবী সৈনিক সংস্থার সাথে সহযোগিতা করেছে। আর জিয়া হাতছাড়া হয়ে যাবার পর তারা দুর্বল হয়ে যেতে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানের নির্দেশেই তারা গ্রেফতার হয়। অর্থাৎ ৭ নভেম্বরের জাসদের ব্যর্থতা আরেকবার প্রমাণ করে ৭১-এর সংগ্রাম আদর্শের ভিত্তিতে কোনো শোষণমুক্তির সংগ্রাম ছিল না। আমাদের সেনাবাহিনীর সদস্যরা বাঙালি বলে বঞ্চিত হবার ক্ষোভে এবং দুঃখে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। এই ক্ষোভ ও বেদনা ছিল তাদের যুদ্ধে যোগদানের ভিত্তি। সমাজ পরিবর্তন বা সমাজতন্ত্রের কোনো কথাই তাদের মনে কখনো জাগেনি। তাই গণবিচ্ছিন্নভাবে তাদের দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রাম করতে যাওয়া হঠকারিতার সামিল এবং এই হঠকারিতার জন্ম হয়েছে ৭১-এর সগ্রামকে মুক্তিসংগ্রাম হিসেবে ব্যাখ্যা করার জন্যে। এ ব্যাখ্যা যেমন সেকালের সরকারকে বিপর্যস্ত করেছে তেমনি বিপর্যস্ত করেছে বিরোধী শিবিরের এক শ্রেণির বামপন্থীদের।
৭১-এর যুদ্ধ সম্পর্কে মূল্যায়ন কারো যে খুব স্পষ্ট ছিল না তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই মূল্যায়ন নিয়ে বিভ্রান্তির প্রথম শিকার হয়েছিল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সমাজতন্ত্র শব্দটি সংবিধানে বসানো হলো। তার কোনো প্রয়োগগত ব্যবস্থা থাকল না। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের বিধি বিধান লঙ্ঘন করা সম্পর্কে কারও কিছু বলার বা করার ঘোষণা ছিল না। সমাজতন্ত্র চাই। সমাজতন্ত্র পৌঁছবার জন্যে কী পথ অবলম্বন করতে হবে সে ব্যাপারে সংবিধানে কোনো নির্দেশনা থাকল না।
এই পটভূমিতে পাটকল, বস্ত্ৰকল, ব্যাংক, বীমা রাষ্ট্রায়ত্ত করা হলো। এক শ্রেণির লোকের ধারণা হলো এ পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে। অথচ এ কথা আদৌ সত্য ছিল না। তকালীন ক্ষমতাসীন সরকারকে বাধ্য হয়ে সে কালের পাটকল, বস্ত্রকল, ব্যাংক, বীমা রাষ্ট্রায়ত্ত করতে হয়। এর কারণ হিসেবে ছিল এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ মালিক পাকিস্তানের অধিবাসী। পাকিস্তানের সহযোগী দালাল। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান ছিল একান্তই রুগ্ন। এই মালিকানাবিহীন শিল্প কারখানা ও অন্যান্য সম্পত্তিগুলোকে পরিত্যক্ত সম্পত্তি বলা হতো। সেই অর্থেই এই সম্পত্তি সরকারের হাতে নিতে হয়। এর একটা ভিন্ন দিকও ছিল। একাত্তরের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু আওয়ামী লীগ-এর সাথে শিল্প কারখানার কোনো সম্পর্ক ছিল না। মুখ্যত খুব নগণ্য সংখ্যক শিল্প কারখানার মালিক ছিল আওয়ামী লীগ। উৎপাদনের সাথে ক্ষমতাসীন সরকার আওয়ামী লীগ-এর তেমন সম্পর্কও ছিল না। ফলে এ ধরনের সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আওয়ামী লীগ-এর আপত্তি ছিল না। এর পরেও অধিকাংশ আওয়ামী লীগ নেতাদেরই পরিত্যক্ত শিল্প কারখানা কিনবার মতো পুঁজিও ছিল না। আমার মতে, এটাই ছিল তকালে শিল্প কারখানা, ব্যাংক, বীমা জাতীয়করণের প্রধান কারণ। কিন্তু সাধারণ মানুষকে ধারণা দেয়া হলো, সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যে এই কাজগুলো করা হয়েছে। সমাজতন্ত্র বিরোধীদের অপপ্রচারে সুবিধা হলো।
