আমার বিরুদ্ধে প্রচার হচ্ছে আমার বাড়ি গোপালগঞ্জ। কৈশোরে টুঙ্গিপাড়া স্কুলের ছাত্র। আমাদের পরিবারের দীর্ঘদিন ধরেই টুঙ্গিপাড়ার শেখ পরিবারের সাথে সম্পর্ক আছে। এছাড়া ব্যক্তিগত জীবনে নির্মল সেন হিন্দু হওয়ায় তার তো ভারতীয় এজেন্ট হওয়ার কথা। আওয়ামী লীগ ভারতীয় এজেন্ট সুতরাং নির্মল সেন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কেন যাবে?
অপরদিকে সংবাদপত্র জগতেও আমাকে নিয়ে মতানৈক্য আছে। আমি ছাড়া আমার দলের একজন সদস্য তখন সংবাদপত্র জগতে নেই। অথচ পাকিস্তান আমল থেকেই প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনে আমি কোনোদিন পরাজিত হইনি। প্রেস ক্লাবের নির্বাচনে একাধিকবার বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছি। সাংবাদিক ইউনিয়নের তখন নেতৃত্বে ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। প্রকৃতপক্ষে কমিউনিস্ট পার্টি যাদের মনোনয়ন দিত তারাই সেকালের সাংবাদিক ইউনিয়ন ও প্রেসক্লাবে নির্বাচিত হতো। ভিন্নমতের রাজনীতিক হিসেবে আমিই একমাত্র একক দাঁড়িয়ে নির্বাচিত হতাম। এছাড়াও আরো দু’একজন নির্বাচিত হতেন, তবে তাঁদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় ছিল না। ষাটের দশকের মাঝামাঝি কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয় রুশ ও চীনপন্থী হিসেবে। এ সময় থেকে প্রেস ক্লাব ও সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে শুরু করে। এ সময়েও আমি এককভাবে দাঁড়াবার চেষ্টা করেছি। আমার নাম কোনো প্যানেলেই থাকত না। তবে এক সময় রুশপন্থীরা আমাকে অপছন্দ করতে শুরু করে। কারণ আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে আমার মতে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভুল পথ অনুসরণ করছে লেনিনের মৃত্যুর পর থেকে। আমরা বলতাম, স্টালিন সঠিক নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভুল করছে। ভিন্নভাবে হলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের মত ও পথ নিয়ে কমিউনিস্ট বিশ্বের নতুন মতানৈক্য শুরু হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির ২০ কংগ্রেসের পথ থেকে স্বাভাবিকভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমালোচনাকারীদের সাথে আমাদের মতের নৈকট্য সৃষ্টি হয়। কিন্তু সেখানেও বিভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। দেখা গেল–যারা স্ট্যালিনের সমালোচনায় নেমেছেন, তারা স্ট্যালিনের চেয়েও অনেক সংশোধনবাদী। ফলে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি হলো। আমাদের মনে হলো অন্তত কিছু কিছু প্রশ্নে চীন কমিউনিস্ট পার্টির অনেক সমালোচনা সঠিক। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও মতানৈক্য সৃষ্টি হলো মাও সেতুং-এর শত ফুল ফুটতে দাও, উৎপাদন উল্লম্ফন এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কর্মসূচি নিয়ে। অর্থাৎ রুশ বা চীন কোনো পন্থীদের সাথে কৌশলগত ব্যাপারেও আমি একমত হতে পারছি না। এ ঘটনা বিশেষভাবে ঘটেছে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর। ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে সংবাদপত্রের জগতে। আমি সেই সংবাদপত্র শিল্পের একজন সদস্য।
সেকালের রাজনীতি আজকের মন নিয়ে তেমন করে বোঝা যায় না। আমার রাজনীতির একাকীত্বের একটি কারণ ছিল। কিন্তু ১৯৭২ ও ৭৩ সালে দেশের রাজনীতির আদৌ কোনো রূপরেখা কারো কাছে স্পষ্ট ছিল না। একটি কথা কোনো মহলই স্বীকার করতে চাইত না, আমাদের স্বাধীনতা স্বাভাবিকভাবে আসেনি। যারা নেতৃত্বের দাবিদার তারাও জানতেন না যে কী হতে যাচ্ছে বা হবে। এমনকি তাজউদ্দিনও জানতেন না শেখ সাহেবের সর্বশেষ কথা। অথচ এ নিয়ে কোনো দিন কোনো মহলে আলাপ করেনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোন গ্রুপ ক্ষমতায় যাবে এটাই ছিল লক্ষ্য। তাই ঐক্যবদ্ধভাবে সমস্যা মোকাবেলা না করে প্রথম থেকেই কোন্দল শুরু হলো আওয়ামী লীগে।
মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে সরানো হলো লজ্জাজনকভাবে। তার কোনো ব্যাখ্যা আজো দেয়া হয়নি। সবচেয়ে বেশি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের ব্যাখ্যা নিয়ে। এটা কি আদৌ মুক্তিযুদ্ধ ছিল? মুক্তিযুদ্ধ কীভাবে হয়? কারা করে? এ মুক্তিযুদ্ধ কি শুধুমাত্র পাকিস্তান থেকে মুক্তি পাওয়া, না শোষণ বঞ্চনা থেকে মুক্তি পাওয়ার যুদ্ধ। এ প্রশ্নে কেউ আলোচনা করলেন না। কেউ সঠিক ব্যাখ্যা দিলেন না। সকলে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে ৭১-এর যুদ্ধকে মুক্তিযুদ্ধ বলে ধরে নিয়ে নিজের ছক সাজাতে শুরু করলেন। কিন্তু ইতিহাস তো কারো নির্দেশে চলে। কেউ নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে ব্যাখ্যা দিলেই আমাদের যুদ্ধ মুক্তিযুদ্ধ হয়ে যায় না।
একথা সকলের জানা, শোষণমুক্তির আন্দোলন করতে হলে যারা শোষণ মুক্তির আদর্শে বিশ্বাস করে তারা নেতৃত্বে থাকে। তাদের দলীয় আদর্শ, ঘোষণাপত্র একটি শোষণমুক্ত সমাজের কথাই বলে। বলে সমাজ পরিবর্তনের কথা। কিন্তু ৭১-এর সংগ্রামের প্রধান দল আওয়ামী লীগ এমন কথা কখনো বলেনি। তাদের ঘোষণার সুর ছিল অবাঙালির প্রভুত্ব মানব না। বাঙালি বাঙালিকেই শাসন করবে। কীভাবে শাসন করবে সেটা পরের কথা অর্থাৎ সমাজ যেমন ছিল তেমন রেখেই বাংলার স্বাধীনতার কথা আওয়ামী লীগ বলেছিল। সেখানে শোষণমুক্তির কোনো কথা ছিল না এবং এ ধরনের যুদ্ধকে নির্দ্বিধায় পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সংগ্রামকে অভিহিত করা যায়। এককালে যে ধরনের সংগ্রাম চলছিল ভারতের পাঞ্জাব থেকে শুরু করে নাগাল্যান্ড পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্যে। নাগাল্যান্ডের সংগ্রাম কোনো অর্থেই শোষণমুক্তির সংগ্রাম নয়। ১৯৭১ সালে আমাদের সংগ্রামও তেমন সগ্রাম ছিল।
