পরের দিন আমার চাকরিতে তেমন কোনো অসুবিধা হয়নি। তখন ইউনিয়ন ছিল শক্তিশালী। মালিক বা সরকার ইচ্ছে করলেই যা কিছু করতে পারত না। আমার কথা হচ্ছে আমি সেদিন হাড়ে হাড়ে একজন আমলা মন্ত্রীকে চিনেছিলাম। যিনি এককালে সাংবাদিক ছিলেন। এদেশের ইতিহাসে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর খ্যাতিও ছিল। এছাড়া কোনো সাংবাদিকের আমলা হওয়া বা কোনো সাংবাদিককে উচ্চপদের পেছনে ছুটতে আমি দেখিনি। দু’একজন যারা ভিন্ন পেশায় চলে গেছেন, তাদের মধ্যেই অনেকেই মৌলিক চরিত্র হারায়নি। নিজের পত্রিকায় পদোন্নতির প্রতিযোগিতা দেখেছি। কিন্তু পেশার বাইরে চাকরির জন্যে তেমন দৌড়-ঝাঁপ করতে দেখিনি। তাই আমার ধারণা ছিল হাসান হাফিজুর রহমান কিংবা তোয়াব খানের শূন্যপদে কোনো সাংবাদিক যোগ দিতে রাজি হবেন না। হলে আমরাই জিতে যাবো।
এ প্রশ্নটি আমি ভিন্নভাবেও দেখেছিলাম। তখন স্বাধীনতার পক্ষে ও বিপক্ষে প্রশ্নটি খুবই সামনে এসেছিল। এই বিতর্কে অনেককে চাকরি হারাতে হয়েছে। সে বিতর্কেও আমাদের জিতবার কথা ছিল। কারণ হাসান হাফিজুর রহমান ও তোয়াব খান স্বাধীনতার পক্ষের লোক ছিলেন। তোয়ব খান স্বাধীন বাংলা বেতারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তাই ভেবেছিলাম এদের শূন্যপদে স্বাধীনতার পক্ষের কেউ আসবে না। কিন্তু আমার ভাবনা সত্যি হয়নি। আমাদের সাথে কোনো কথা না বলেই নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী দৈনিক বাংলার সম্পাদকের পদ গ্রহণ করলেন। তখন তথ্যমন্ত্রী ছিলেন
মিজানুর রহমান চৌধুরী। শুনেছি পাটোয়ারী সাহেব তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তবুও একজন সাংবাদিক হিসেবে আমি বিশ্বাস করতে চাইনি, শুধুমাত্র আত্মীয়তার সুবাদে কেউ এ ধরনের চাকরি গ্রহণ করতে পারে। অনেকে বলেন, পদটিও কম বড় কথা নয়। পাটোয়ারী সাহেব ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের সহকারী বার্তা সম্পাদক। সেই চাকরির পরে একটি পত্রিকার সম্পাদক হওয়া কম কথা নয়। হয়তো সেই বিচারেই তিনি পদটি গ্রহণ করেছিলেন। হয়তো তিনি আমার মতো ভাবেননি। আমি ভেবেছিলাম হাসান হাফিজুর রহমান ও তোয়ব খানের পরিবর্তে কাউকে পাওয়া যাবে না। সুতরাং তারাই থেকে যাচ্ছেন।
তবে আরো চমক ভাঙল আর একটি সংবাদে। এ সময় পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের একটি জনসভা হয়। এই জনসভায় দৈনিক বাংলার ঘটনার উল্লেখ করা হয়। সভায় যুবলীগ নেতা ফজলুল হক, শফি মান্নান বলেন, দৈনিক বাংলা থেকে দুজন স্বাধীনতা বিরোধীকে অপসারণ করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে। এ বক্তব্য আমাকে চমকে দিল। তাহলে স্বাধীনতার পক্ষের লোক কে? স্বাধীনতা সংগ্রামের নতুন সংজ্ঞা দেয়া হচ্ছে কি? এরা একেবারেই শুধুমাত্র নিজেদের স্বাধীনতা সংগ্রামী বলে দাবি করতে চায়। তাহলে অন্যদের অবস্থান কী? একথা সত্য, হাসান হাফিজুর রহমান ও তোয়াব খান আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন না। আওয়ামী লীগের সদস্য ছিলেন না বলেই কি তারা স্বাধীনতা বিরোধী? এ পরিস্থিতিতে পাটোয়ারী সাহেব এলেন দৈনিক বাংলায়। এরপর একটি ঘটনা ঘটল। আমি বিকেল বেলা গণভবনে গেলাম। প্রধানমন্ত্রীর সাথে কথা হচ্ছিল একটি সমস্যা নিয়ে। সেদিন দুপুরে এক ব্যক্তিকে রাজাকার বলে ধাওয়া করে পিটিয়ে হত্যা করা হয় মতিঝিলে। শুনে আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম এটা কোন পক্ষের ষড়যন্ত্র?
গণভবনে আমার অবারিত দ্বার। আমি সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে চলে গেলাম। ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রীকে বললাম। তিনি খাঁটি গোপালগঞ্জের ভাষায় কথা বললেন, আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি। রাজাকার, আলবদর, আল শামসদের যেখানে পাবি মেরে ফেলবি। এদের ক্ষমা নেই।
আমি প্রথম চুপ হয়ে গেলাম। বললাম, আমি একটু কথা ঘুরিয়ে বলি। ধরুন, কামাল ও জামাল মতিঝিল দিয়ে যাচ্ছে। কেউ পেছন থেকে চিৎকার করছে, ওরা রাজাকার ওদের ধর এবং মার। অবস্থা এমন হলে আমিওতো রাজপথে বের হয়ে বাঁচাবো না।
প্রধানমন্ত্রী স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তার বাঁ হাত দিয়ে কপালের একটি পাশ চেপে ধরলেন। ফোন তুললেন, এই দেখিস, রাজাকার-ফাজাকার বলে কেউ যেন রাস্তায় কাউকে পিটিয়ে না মারে। আমি অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি বারবার এই মানুষটির কাছে গিয়ে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়েছি। এত সহজে কথা বলে কোনোকালে কোনো দেশে কেউ একজন প্রধানমন্ত্রীকে কথা শোনাতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই। তিনি ফোন করেছিলেন হুইপ প্রধানকে।
ব্যক্তিগতভাবে আমার অবস্থান তখন চরমভাবে বিতর্কিত। সকলেই জানে আমি রাজনীতি করি। শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। রাজনীতিতে এ দলটির অবস্থান বিরোধী শিবিরে। অবস্থান এমন যে সরকারি সন্ত্রাসীরা আমাদের দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য কমরেড সিদ্দিকুর রহমানকে তার বাড়িতে হামলা চালিয়ে গুলিবিদ্ধ করেছে। পল্টন ময়দানে আমাদের জনসভা ভেঙে দিয়েছে। দেশের শিল্প এলাকায় চটকলগুলোয় আমাদের শ্রমিক ইউনিয়নগুলো শ্রমিক লীগ একের পর এক হাইজ্যাক করছে। আমাদের কেন্দ্রীয় অফিস তখন ১৬/ক বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে। হঠাৎ একদিন আর সবাইকে বাদ দিয়ে আমাদের এক মাসের মধ্যে বাড়ি ছাড়বার নোটিশ দেয়া হয়েছে। আমাদের শ্রমিক সংগঠন সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতিকে দিনেদুপুরে হাইজ্যাক করে শ্রমিক লীগের সভাপতি করা হয়েছে। তখন আমি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি এবং জড়িয়ে পড়লাম দৈনিক বাংলা নিয়ে সরকারের সাথে সংঘর্ষে।
