আমি কোনো কিছু ঘুণাক্ষরে জানতে পারিনি। আমার বলার কিছু ছিল না। আমার নির্বাক দুই বন্ধুকে নিয়ে আমি দৈনিক বাংলায় ফিরে এলাম। পরের দিন মিছিল হলো। দৈনিক বাংলার তিনশ কর্মচারী দৈনিক বাংলা থেকে হেঁটে মিছিল করে পুরনো গণভবনে গেল। সকলের পক্ষ থেকে অনেক আবেদন নিবেদন করা হলো। প্রধানমন্ত্রী কারো কথা শুনলেন না। পরে আমাকে ডেকে বললেন হাসান হাফিজুর রহমানকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেস মিনিস্টার করা হবে। আপনাদের মুখ চেয়ে তাঁকে যুগ সচিবের পদমর্যাদা দেয়া হবে। তোয়াবেরও একটা ব্যবস্থা করা হবে। আপনাকে অতো ভাবতে হবে না।
আমি তখন বিপর্যস্ত এবং বিধ্বস্ত। দীর্ঘদিন ট্রেড ইউনিয়ন করেছি। আইয়ুব আমলে মাসের পর মাস চটকল ধর্মঘট করেছি। কোনোদিন পরাজিত হইনি। এবার আমাকে পিছু হটতে হলো। পরবর্তীকালে শুনতে পেলাম সরকারও দুই সাংবাদিককে ওএসডি করে খুব নিরাপদ অবস্থানে ছিলেন না। কারণ আইনের দিক থেকে এ দুই সাংবাদিক আদৌ সরকারি কর্মচারি ছিলেন না। তাই তাদের সরকারি কর্মচারিদের হিসেবে ওএসডি করাও যায় না।
এর কদিন পরে দৈনিক সংবাদের সুর নরম হয়ে যাবার তাৎপর্য বুঝলাম। জানা গেল, ছাত্র ইউনিয়নের এই ভূমিকায় সোভিয়েত ইউনিয়ন খুশি নয়। এর পরবর্তীকালেই আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্কে আরো ঘনিষ্ঠ হয়ে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট (গজ) গঠন করে। একদিন দেখলাম প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে মতিউল-কাঁদেরের স্মৃতিসৌধ সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনের চত্বরে। সেখানে এরশাদের আমলে একটি ফোয়ারা স্থাপন করা হয়েছে। এ সকল ঘটনা ঘটেছিল পর্দার অন্তরালে। আমি বা আমরা অর্থাৎ সাংবাদিকরা এ ব্যাপারে কোনো কিছুই জানতে পারিনি।
দৈনিক বাংলায় ফিরে এলাম। নতুন সমস্যা দেখা দিল নতুন সম্পাদক নিয়ে। ইত্তেফাকের প্রবীণ সাংবাদিক নূরুল ইসলাম পাটোয়ারী আমাদের সকলের পরিচিত। আপনজন বললেও বেশি বলা হয় না। হাসান হাফিজুর রহমান ও তোয়াব খানের পরিবর্তে পাটোয়ারী সাহেব এলেন দৈনিক বাংলার সম্পাদক হিসেবে। হাসান হাফিজুর রহমান ছিলেন দৈনিক বাংলার সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি ও প্রশাসক। তোয়ব খান ছিলেন নির্বাহী সম্পাদক। এবার সম্পাদক ও প্রশাসকের পদ নিয়ে এলেন নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী। নির্বাহী সম্পাদকের পদ থাকল না।
পাটোয়ারী সাহেব আসায় আমাদের সকলেরই অসুবিধা হলো। আমরা হাসান হাফিজুর রহমান ও তোয়াব খানের পক্ষে আন্দোলন করেছি। আমাদের পক্ষে পাটোয়ারী সাহেবকে গ্রহণ করা খুবই মুশকিল। কিন্তু কোনো উপায়ও ছিল না।
এসময় আমার একটি ভিন্ন কথা মনে হতো। পাটোয়ারী সাহেবের তুলনায় আমরা ছিলাম সাংবাদিকতায় নতুন। এক সময় ভাবতাম সাংবাদিকদের তুলনা হয় না। এরা আদর্শ, এরা নমস্য। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে বিশ্বাসে চির ধরতে শুরু করে। লক্ষ করলাম আমরা একেবারেই সাধারণ মানুষ। আমাদের আদর্শবাদী ও সাহসী বলা হয়ে থাকলেও প্রায় কেউ আদর্শবাদ এবং সাহস দেখাতে পারলাম না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্য পেশায় মানুষের মতো আমরাও দৌড়-ঝাঁপ শুরু করলাম। আমরা ভালো চাকরি চাই। আমরা মন্ত্রী হতে চাই। সংসদ সদস্য হতে চাই। কেউ রাষ্ট্রদূত হতে চাই। সাংবাদিকতা পেশা আমাদের কাছে গৌণ হয়ে গেল।
এমন ধারণা আমার ছিল না। পাকিস্তান আমলে যারা সাংবাদিকতা করতেন তাদের একটা ভিন্ন পরিচয় ছিল। এককালে তাদের মধ্যে অনেক প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হয়েছেন। কিন্তু স্বকীয়তা হারায়নি। নিজের পেশাও ছাড়েননি। আমি একমাত্র ব্যতিক্রম দেখেছিলাম করাচির ডন পত্রিকার সম্পাদক মরহুম আলতাফ হোসেনের ক্ষেত্রে। তিনি আইয়ুব মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে দেখলাম তিনি খাঁটি আমলা হয়ে গেছেন। তাঁকে কেন্দ্র করে একটি ঘটনাও আজকে আমার মনে পড়ছে।
ষাটের দশকের কথা। তখন দৈনিক বাংলার নাম দৈনিক পাকিস্তান। আমি টেবিলে শিফট ইনচার্জ। বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হক কায়রোগামী বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। নতুন বার্তা সম্পাদক তোয়াব খান। প্রধান সহ সম্পাদক ফজলুল করিম। পাকিস্তান সরকার ইত্তেফাক নিষিদ্ধ করেছে। প্রতিবাদে ধর্মঘট ডেকেছিল পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন। পরের দিন রাতের পালায় আমি কাজ করছি। গভীর রাতে দৈনিক পাকিস্তানের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আহসান আহমদ ফোন করলেন। বললেন এপিপি (পরবর্তীতে বাসস) একটি খবর পাঠাবে হুবহু ছেপে দিতে হবে। কিছুক্ষণ পর খবর এল। সে খবরে বলা হয়েছে সাংবাদিক ইউনিয়নের ধর্মঘট আহ্বান সত্ত্বেও সেদিন পূর্ব পাকিস্তান পাঁচটি দৈনিক প্রকাশিত হয়েছিল। পড়ে দেখলাম, সেই খবরে দৈনিক পাকিস্তানের নাম নেই। তাই খবরটি অনুবাদ না করে আমি বসে থাকলাম। এবার ফোন করলেন আলতাফ হোসেন। জানতে চাইলেন ওই খবর এসেছে কিনা। আমি বললাম খবর এসেছে। কিন্তু ওই খবরে দৈনিক পাকিস্তানের নাম নেই। তিনি বললেন, আপনি দৈনিক পাকিস্তানের নাম লিখে দিন। আমি বললাম, সংবাদটি এপিপির; আমি সংশোধন করতে পারব না। তিনি বললেন, নতুন করে খবরটি যাচ্ছে। ওই খবরে দৈনিক পাকিস্তানের নাম থাকবে। খবরটি দৈনিক পাকিস্তানে ছাপাতেই হবে। এটা সরকারি নির্দেশ। তখন রাত ১২টা বেজে গেছে। শিফটের সকলে চলে গেছে। আমি একা। এবার নতুন করে খবরটি এল। ওই খবরে দৈনিক পাকিস্তানের নাম ছিল। আমি খবরটি অনুবাদ করলাম না। দৈনিক পাকিস্তানের খবরটি ছাপা হলো না। আমি বার্তা সম্পাদক বরাবরে একটি চিঠি লিখলাম। চিঠিতে লিখলাম এই খবরটি রাত বারোটার পর এসেছে। টেবিলে আমি ব্যতীত কোনো সহ সম্পাদক নেই। চাকরির শর্ত অনুযায়ী আমার অনুবাদ করার কথা নয়। তাই খবরটি আমি রেখে গেলাম। আমি জানি, এ খবরটি আদৌ সত্য নয়। তবুও এ খবরটি ছাপাবার জন্যে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল।
