২ জানুয়ারি হরতাল। প্রেস ক্লাবে এসে দেখলাম প্রেস ক্লাবের সামনে সাবেক ইউএসআইএস-এর সামনে অঙ্গনে মতিউল ও কাঁদেরের নামে একটি স্মৃতিসৌধ হচ্ছে। একদল সাংবাদিক আমাকে ওখানে নিয়ে গেল। ওই স্মৃতিসৌধে আমি মালা দিলাম। প্রেস ক্লাবে গিয়ে তুমুল বিতর্কের সামনে পড়ে গেলাম। সবার অভিযোগ হচ্ছে–আপনি মস্কোপন্থীদের ফাঁদে পড়েছেন। যদিও তাতে আমার কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি হলো না। কারণ সর্বকালেই আমি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতেই অভ্যস্ত।
সন্ধ্যার দিকে দৈনিক বাংলা অফিসে গেলাম। সিঁড়িতে উঠতে একজন সহ-সম্পাদককে দেখলাম। সে প্রেসে যাচ্ছে। সে বলল–কিছু কিছু খবর দ্ধ করার জন্য প্রেসে যাচ্ছি। ওই দিন বিকালে পল্টন ময়দানে ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিবাদ সভা ছিল। তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ অর্থাৎ ডাকসুর ভিপি ছিলেন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। সভায় তিনি নাকি ঘোষণা করেছেন, শেখ সাহেবের ‘বঙ্গবন্ধু’ খেতাবটি প্রত্যাহার করা হয়েছে। ডাকসুর তরফ থেকে ১৯৬৯ সালে শেখ সাহেবকে বঙ্গবন্ধু খেতাব দেয়া হয়েছিল। সেই সুবাদেই ডাকসু’র পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু খেতাব প্রত্যাহার করা হলো। আমার দৈনিক বাংলার সাংবাদিক বন্ধু একটি ছবির ক্যাপশন থেকে বঙ্গবন্ধু শব্দটি তুলে দেয়ার জন্যে প্রেসে যাচ্ছিল। আমি তার কাছেই এ কথা শুনলাম। কিন্তু তখনও গভীরভাবে তলিয়ে দেখিনি এর প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে। আমরা দৈনিক বাংলায় কাজ করি। বরাবরই একটি ট্রাস্ট কিংবা সরকারি মালিকানায় থাকলেও দৈনিক বাংলার সাংবাদিকদের এক ধরনের স্বাধীনতা সর্বকালেই ছিল। যেমন ১৯৭১ সালে কর্তৃপক্ষের সমস্ত চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে দৈনিক বাংলা শেখ সাহেবের ৭ মার্চের ভাষণ দাড়ি, কমা, সেমিকোলনসহ ছেপে দিয়েছিল। আমার ধারণা ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ ধরনের স্বাধীনতা আরো পাওয়া যাবে। সুতরাং আমি নতুন করে কিছুই ভাবতে চেষ্টা করিনি।
কিন্তু প্রতিক্রিয়া হলো সরকারি মহলে। শেখ সাহেব তখন ঢাকায় ছিলেন না। আমাদের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি হাসান হাফিজুর রহমান, নির্বাহী সম্পাদক তোয়াব খানকে ডেকে পাঠানো হলো। তাদের অভিযুক্ত করা হলো টেলিগ্রাম বের করার জন্যে।
আমি খবর পেলাম সবচেয়ে শেষে। ইতিমধ্যেই সরকার আর একটি পদক্ষেপ নিয়েছে। হাসান হাফিজুর রহমান ও তোয়াব খানকে তথ্য মন্ত্রণালয়ের অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি অর্থাৎ ওএসডি করা হয়েছে। নতুন সম্পাদক হয়ে আসছেন ইত্তেফাকের প্রবীণ সাংবাদিক নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী। আমি খবর শুনে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। দৈনিক বাংলায় তোয়ব খানের সাথে দেখা হলো। একটি মহল থেকে বলা হলো এ সিদ্ধান্ত নেবার আগে শেখ সাহেব নাকি কথা বলেছেন খন্দকার গোলাম মুস্তফার সাথে। যিনি কে জি মুস্তফা নামে পরিচিত। পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন এবং মোটামুটিভাবে তৎকালীন বাংলাদেশেও সাংবাদিকদের স্বীকৃত নেতা। আমি তাঁকে ফোন করলাম। তিনি বললেন প্রধানমন্ত্রী আমাকে ফোন করে তাঁর সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন মাত্র। সিদ্ধান্ত নেবার আগে আমার মতামত নেননি। এ পরিস্থিতিতে আমাকে বিপদে ঠেলে দিল। কারণ আমি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। আবার দৈনিক বাংলায় চাকরি করি। আমার পক্ষে পিছু হটবার কোনো পথ ছিল না।
আমি দৈনিক বাংলার প্রেস, শ্রমিক ইউনিয়ন ও কর্মচারী ইউনিয়নের দুই নেতাকে নিয়ে পুরনো গণভবনে গেলাম। দুপুরের দিকে প্রধানমন্ত্রী ওখানে বিশ্রাম নিতেন। গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সচিব রফিকুল্লাহ চৌধুরীর সাথে দেখা হলো। তিনি বললেন, প্রধানমন্ত্রী বিশ্রাম নিচ্ছেন। আমি বললাম, আমার জরুরি কথা আছে। রফিকুল্লাহ চৌধুরীর সাথে দীর্ঘদিন আমার ছাত্রলীগের সম্পর্ক ছিল। আইয়ুব আমলে জেলে যাবার আগে বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে একই হোটেলে থাকতাম। রফিকুল্লাহ চৌধুরীকে বললাম আমার প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে হবেই। তাঁর সাথে আমি একা পুরনো গণভবনের সিঁড়ি দিয়ে উঠে দোতলার বামপাশে একটি কক্ষে গেলাম। আমি দূরে দাঁড়িয়ে দেখলাম তিনি খাটে শুয়ে আছেন। মাথার কাছে গাজী গোলাম মুস্তাফা। প্রধানমন্ত্রীর গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, পরনে লুঙ্গি। আমাকে দেখেই তিনি একটি হাওয়াই শার্ট গায়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলেন।
আমি সেদিন অবাক হয়ে একজন ভিন্ন মানুষের দিকে তাকাচ্ছিলাম। তিনি আমার হাত ধরে বললেন, আপনি আমার ভাই, একটা ভুল হয়ে গেছে। সাংবাদিকদের অসাংবাদিক করা ঠিক নয়। হাসান হাফিজুর রহমান ও তোয়ব খানকে ওএসডি করা ঠিক হয়নি। এ ঘটনায় আমি দুঃখিত। এখন আমার করার কিছু নেই। এ ব্যাপারে আপনাকে একটু ভিন্নভাবে ভাবতে হবে। আমি বারবার বলছি, আমি নিরুপায়। আপনি আমার ভাই। আপনাকে ক্ষমা করতে হবে।
কিন্তু আমারও করার কিছু ছিল না। প্রধানমন্ত্রী আমার হাত ছেড়ে দিলেন। আমি বললাম, আমি গোপালগঞ্জের নির্মল সেন নই। আমি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। আমারো করার কিছু নেই। আমি চাই তাদের দৈনিক বাংলায় ফিরিয়ে দেয়া হোক। এ প্রশ্নে আমার আপোষ করার কোনো পথ নেই। এবার দেখলাম-প্রধানমন্ত্রীর মুখমণ্ডল পাল্টে যাচ্ছে। বললেন, চলুন, আপনার সাথে যারা এসেছে তাদের সঙ্গে কথা বলব। এবার ভিন্ন কক্ষে গেলাম। শেখ সাহেব তার কথা বললেন। তাকিয়ে দেখলাম আমার অপর দুই বন্ধু একেবারে নীরব। তারা কেউ টু-শব্দটি করছে না। দেরিতে হলেও আমি বুঝতে পারলাম–আমি ব্যতীত সকলের সাথেই প্রধানমন্ত্রী আগে আলাপ করেছেন এবং তারা সম্মতি দিয়েছেন।
