সাংবাদিকতার জগতে তখন পরিবর্তন এসেছে। ৭১ সালের সংগ্রামের সময় আগুনে পুড়ে যাওয়া ইত্তেফাক সরকারি সাহায্য পেয়ে দাঁড়ার চেষ্টা করছে। পাসবান অফিস থেকে সরকারি সহযোগিতায় শেখ ফজলুল হক মনি বের করছে বাংলার বাণী। ট্রাস্ট সম্পর্কে তখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তথ্য মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দৈনিক বাংলা, মর্নিং নিউজ ও বিচিত্রা প্রকাশিত হচ্ছে। বাংলাদেশ অবজারভার, পূর্বদেশ এবং চিত্রালী প্রকাশিত হচ্ছে সরকারি তত্ত্বাবধানে। রাজনীতির ক্ষেত্রে তখন কিছুটা সক্রিয় সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি। কখনো রাজনৈতিক খুন, আবার কখনো থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি দখলের অভিযোগ আসছে এই দলের বিরুদ্ধে। রাজনীতিতে মওলানা ভাসানীর ভূমিকাও বিতর্কিত হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে এল ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি।
ঘটনাটি ছিল অপ্রত্যাশিত। আমরা অনেকেই প্রেস ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পরে লক্ষ্য করলাম ছাত্র ইউনিয়নের একটি মিছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে প্রেস ক্লাবের দিকে আসছে। হঠাৎ শুনলাম গুলির শব্দ। মিছিলকারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল। এদিক-ওদিক ছুটে পালাল। একদল মিছিলকারী প্রেস ক্লাবের ভেতরে ঢুকে গেল। পুলিশ প্রেস ক্লাব তাক করেও গুলি ছুঁড়ল। প্রেস ক্লাবের জানালার কাঁচ ভেঙে একটি গুলি বাংলার বাণীর আলোকচিত্রী রফিকুর রহমানকে আঘাত করল। আমরা হতভম্ব হয়ে গেলাম। আমাদের চোখের সামনে ছাত্র ইউনিয়নের মতিউল-কাদের মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ল। আমরা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ সভা করলাম এবং মিছিল নিয়ে সচিবালয়ে দিকে গেলাম। আব্দুল গনি রোড হয়ে আমরা সচিবালয়ে ঢুকতে চেষ্টা করলাম। এসময় গেটে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমদ এসে উপস্থিত হলেন। তিনি বললেন, আপনি নির্মল সেন এবং গিয়াস কামাল চৌধুরীকে প্রধানমন্ত্রী ডেকেছেন। আপনারা দুজন আমার সাথে চলুন। আপনাদের স্লোগান বন্ধ করতে হবে। আমরা রাজি হলাম না। বললাম, আমরা সকলেই যাব এবং শ্লোগান দিতে দিতেই যাব। তোফায়েল সাহেব আমাদের কথার জবাব দিলেন না। আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে পৌঁছে। দিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে তখন অনেক মানুষ। আমরা কেউই জানতাম না, তখন মন্ত্রিসভার বৈঠক চলছে। আমি ছিলাম অসম্ভব ক্ষুব্ধ। কোনো দিক না তাকিয়েই প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম–আপনার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নান সাহেব কোথায়। আমরা মান্নান সাহেবকে চাই। পাকিস্তানের রাজত্বে তেইশ বছর ছিলাম। ১৯৭১ সালের মার্চের পূর্বে পাকিস্তানিরা প্রেস ক্লাবে গুলি করতে সাহস পায়নি। প্রধানমন্ত্রী, আপনি দেশে ফিরেছেন ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি। আজ ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি। এক বছর না যেতেই আপনারা প্রেস ক্লাবে গুলি চালিয়েছেন। তাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নান সাহেবকে আমরা দেখতে চাই। প্রধানমন্ত্রী বললেন, ওই তো মান্নান বসে আছে। আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। সত্যি সত্যি তো ভাবিনি যে মান্নান ভাই ওখানে থাকবেন। এবার প্রধানমন্ত্রী বললেন, কী ঘটনা ঘটেছে আমি জানি। এবার আপনারা কী চান তা বলুন। গিয়াস কামাল বললেন, নির্মল দা-ই সব বলবেন। আমি বললাম, আপনাকে ক্ষমা চাইতে হবে। গুলিবর্ষণের তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করতে হবে। এসপিকে সাসপেন্ড করতে হবে। তদন্তের পর দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দিতে হবে। নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
এবার প্রধানমন্ত্রী অদ্ভুত ভঙ্গি করলেন। তিনি হেসে হাতজোড় করে বললেন, এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়া কি মানায়? আমি কথা দিচ্ছি। প্রেসনোট দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করা হবে। এছাড়া আপনাদের বাদ বাকি সব দাবিই মেনে নেয়া হবে। তাহলে আপনারা খুশি তো, কী বলেন?
প্রকৃতপক্ষে তখন আমাদের বলার কিছু ছিল না। আমরা প্রেস ক্লাবে ফিরলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম ছাত্রলীগের একটি মিছিল। মিছিল থেকে শ্লোগান উঠছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মান্নানের পদত্যাগ চাই। প্রথমে আমার ব্যাপারটি বোধগম্য হলো না। পরে বুঝলাম–আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ এবারে রাজপথে ঘটতে শুরু করল। ১ জানুয়ারির এ ঘটনা নিয়ে বিকেলে দৈনিক বাংলা ও দৈনিক সংবাদের পক্ষ থেকে দুটি টেলিগ্রাম বের করা হলো। দৈনিক সংবাদের সাংবাদিকদের ভূমিকা বড় করে তুলে ধরা হলো। পরের দিন দৈনিক সংবাদে সে খবর ছিল অনেক নরম। আর টেলিগ্রাম ছাপাতে গিয়ে বিপদে পড়ল দৈনিক বাংলা এবং দৈনিক বাংলার প্রখ্যাত দুই সাংবাদিক তোয়াব খান ও হাসান হাফিজুর রহমান।
১৯৭৩ সাল। ১ জানুয়ারি প্রেসক্লাবের সামনে গুলি হলো। ছাত্র ইউনিয়নের সদস্যরা ভিয়েতনামের স্বপক্ষে মার্কিন বিরোধী মিছিল করতে এসেছিল। কোনো সতর্কবাণী ছাড়াই পুলিশ সে মিছিলে গুলি করে। মতিউল ও কাদের নামে দু’জন ছাত্র নিহত হয়। আগের দিনের টেলিগ্রামের মতো সংবাদের সুর তেমন কঠিন নয়। অনেকটা আপোষের সুর।
দেশবাসীর কাছে দৈনিক সংবাদের একটি পরিচয় ছিল। সংবাদের মালিক ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি অর্থাৎ ন্যাপের সদস্য। ন্যাপের সাথে কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। সংবাদের অধিকাংশ সাংবাদিক ও কর্মচারী কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের সদস্য, সমর্থক অথবা শুভানুধ্যায়ী। তাই একটা সাধারণ ধারণা ছিল সংবাদ ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি ঘেঁষা এবং মোটামুটিভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থক। তাই সংবাদ পড়ে আঁচ করা যেত ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির বক্তব্য ও নীতি। একথা জানা থাকলেও ২ জানুয়ারির সংবাদ পড়ে আমার তেমন কোনো ধারণা হয়নি।
