এ সময় চা এল। পরিস্থিতি অনেক শান্ত হলো। প্রাভদা সম্পাদক জানালেন, আমার সাথে তোমার আলোচনার খবর কাল প্রাভদার প্রথম পৃষ্ঠায় যাবে। আর তোমার কাছে আমার একটি অনুরোধ তুমি ভাসা ভাসা জ্ঞান নিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন সম্পর্কে কিছু লিখো না। আমি বললাম, এ অভ্যাস আমার নেই। বুঝলাম আমাদের সম্পর্ক জোড়া লাগল না। প্রাভদার সম্পাদকের কক্ষ থেকে বের হতেই আমার দোভাষী বলল, তোমার জন্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের দরজা চিরতরে বন্ধ। তুমি এত তর্ক করবে না। সত্যি সত্যি দোভাষী এ কথা অনুধাবন করেছিলেন ১৯৭৪ সালে। সেবার পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি এবং চেকোশ্লোভাকিয়া গিয়েছিলাম। কিন্তু চেষ্টা করেও সোভিয়েত ইউনিয়নে যেতে পারিনি। আমার লেনিনগ্রাদ দেখা হয়নি। আর সে লেনিনগ্রাদ এখন আবার পিটার্সবার্গ।
সমাজতান্ত্রিক শিবির সফর করে এসে এক নতুন বিতর্কে পড়লাম। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে প্রকৃত পক্ষে এক বছরও হয়নি। সংঘবদ্ধ কোনো বিরোধিতাও নেই। সারা দেশে সন্ত্রাস। অপরদিকে সকলেই মুক্তিযোদ্ধা। একটি মুক্তিযোদ্ধা বাহিনীর নাম হয়েছে মোলই ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যারা সুযোগ বুঝে মুক্তিবাহিনী সেজেছিল তাদেরই এ নাম দেয়া হয়েছিল। অনেকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হচ্ছে এই মোড়শ ডিভিশনের অধিকাংশ লোক এককালে রাজাকার, আলবদর ও আল শামস বাহিনীর সদস্য ছিল। এরা ৯ মাস সশন্ত্র ছিল। নির্বিচারে হত্যা, ধর্ষণ ও লুটপাট করেছে। ১৬ ডিসেম্বর তারা ভোল পাল্টেছে। মনে হচ্ছিলো তারাই সবচেয়ে বড় মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধার লেবাস লাগিয়ে তারা আরো ভয়ানক হয়ে উঠেছিল।
অপরদিকে রাজনৈতিক নেতৃত্বও কোনো উন্নতমানের ভূমিকা পালন করেনি। সকলেই যেন কোনো কিছু দখল করতে ব্যস্ত। ইতিমধ্যে অনেকেই বাড়ি গাড়ি এবং দোকান দখল করেছে। একের পর এক সাইনবোর্ড পাল্টাচ্ছে বিভিন্ন দোকান। বায়তুল মোকাররমে গিয়ে দেখি এককালের অবাঙালিদের দোকানে যারা কর্মচারি ছিল তারাই মালিক সেজে বসেছে। সে এক অদ্ভুত লুটপাটের জগৎ। এ পরিবেশ থেকে আমরাও মুক্ত থাকতে পারিনি। আমরাও অবাঙালিদের ফেলে যাওয়া পরিত্যক্ত ভবন দখল করে দলের অফিস বানিয়েছি। আমাদের কারো কোনো বৈধ কাগজপত্র ছিল না। কিন্তু সকলেই গায়ের জোরে পরিত্যক্ত সম্পত্তির মালিক হয়ে বসেছি। খোঁজ নিয়ে দেখা যাবে সেকালের জোর করে দখল করা অনেক ভবনে এখনোও অনেক রাজনৈতিক দলের অফিস বিরাজ করছে। পরবর্তীকালে এ দখল নিশ্চয়ই বৈধ করা হয়েছে। কিন্তু ৭২-এ যে মানসিকতা নিয়ে আমরা অন্যের বাড়ি দখল করে দলের অফিস বানিয়েছিলাম সে মানসিকতা কোনোক্রমেই সঠিক ছিল না।
এ পরিবেশে শাসক শ্রেণির বিভিন্ন সংগঠন নতুন নতুন বাহিনী গঠন করা শুরু করে। সরকারি শ্রমিক লীগের নেতৃত্বে লালবাহিনী গঠন করা হয়। বলা হয়েছিল এ লালবাহিনী শিল্প এলাকার শান্তি রক্ষা করবে। উৎপাদন ব্যবস্থা দেখাশোনা করবে। পরবর্তীকালে শুনেছি, বিপ্লব উত্তর রাশিয়ার রেডগার্ডের আদলে নাকি বাংলাদেশে লালবাহিনী গঠিত হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের লালবাহিনীর মতো পুনর্গঠন নয়, বাংলাদেশের ঢংয়েই তারা শিল্প এলাকায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করেছিল।
তখন শিল্প এলাকায় আমাদের সংগঠন সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের প্রায় একাধিপত্য ছিল। আমাদের এ আধিপত্য সরকার বরদাস্ত করেনি। রাতারাতি একের পর এক ইউনিয়ন তারা জোর করে দখল করে নেয়। এম দফতরের সহযোগিতায় আমাদের ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে দেয়। নতুন ইউনিয়ন গঠন করতে থাকে। অর্থাৎ সর্বত্রই তখন নৈরাজ্য। একদিন লক্ষ্য করলাম রাজপথে নীল পোশাক পরিহিত একদল শ্রমিক ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছে। শুনলাম এরা নাকি নীল বাহিনী। এরা তাঁতি লীগের লোক। এরা নীল বাহিনী গঠন করে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিয়েছে। কে তাদের এ দায়িত্ব দিয়েছে তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। এখন সকলেই সার্বভৌম।
এক সময় দেখা গেল-পত্রিকার পাতায় রাজাকাররা একের পর এক শহীদ হয়ে যাচ্ছে। নিখোঁজ রাজাকারদের ছবি ছাপা হচ্ছে নিখোঁজ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে। প্রথমে আমরা কেউই বুঝতে পারিনি। নিখোঁজ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে যাদের আমরা ছবি ছাপাচ্ছি তাদের অধিকাংশই নিখোঁজ রাজাকার, আল বদর, আল শামস। তাদের আত্মীয়-স্বজনরা সাংবাদিকদের এ অজ্ঞতার সুযোগ নিয়েছে। ছবি ছাপাবার পেছনের এ তথ্যটি জানতে দীর্ঘদিন কেটে গেছে। এ পরিস্থিতিতে আমি ‘অনিকেত’ নামে দৈনিক বাংলায় উপসম্পাদকীয় লিখতে শুরু করি। এ ধরনের প্রতিটি ঘটনার বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে আমি অসম্ভব বিতর্কিত হয়ে পড়ি। এ পরিবেশে সমাজতান্ত্রিক দেশ থেকে ফিরে এসে আমি যুদ্ধাপরাধীদের শ্রেণি বিভাগের দাবি তুলি। বলতে চেষ্টা করি, সব অপরাধ এক কাতারে নয়। হাজার হাজার মানুষকে রাজাকার আখ্যা দিয়ে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে বিচার করা সঠিক হবে না। জার্মানির উদাহরণ তুলে ধরে বলার চেষ্টা করি, সাধারণ অপরাধে অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমতা করা হোক। দেশে ফিরে এ কথা লিখে আমি যেন তোপের মুখে পড়ে গেলাম। সে পরিস্থিতিতে আমাকে বাঁচিয়েছে শুধু আমার কলম নয়, আমার রাজনৈতিক দল নয়, আমার পেশা সাংবাদিকতাও।
