এ পটভূমিতে সোভিয়েত ইউনিয়নকে আমার মনে হয়েছিল অনেক ধীর এবং গম্ভীর। সকলে বড় চুপচাপ। যেন মেনে মেনে কথা বলে। ফলে সোভিয়েত ইউনিয়নে পৌঁছে প্রথমেই মনটা কেমন হয়ে গেল। এক দুঃখজনক বিতর্ক হয়ে গেলো দ্বিতীয় দিন সংবর্ধনা সভায়।
সোভিয়েত ইউনিয়নের সাংবাদিক ইউনিয়ন এক হোটেলে আমাদের সংবর্ধনার আয়োজন করেছিল। পরিবেশন করেছিল ভদকাসহ অন্যান্য পানীয়। আমি বললাম, আমি ভদকা খাব না। অন্য কোনো পানীয় দাও। মস্কোর বন্ধুরা যেন কিছুটা ক্ষুণ্ণ হলেন। বললেন, তুমি আমাদের অপমান করছ। ভদকা আমাদের জাতীয় পানীয়। সব অনুষ্ঠানে আমরা পরিবেশন করে থাকি। তোমার ভদকা না খাওয়াটা হবে আমাদের অপমানের সামিল। আমি বললাম, আমি কিন্তু একই অভিযোগ করতে পারি তোমাদের বিরুদ্ধে। তুমি নিশ্চয়ই জান আমাদের দেশে সরকারিভাবে কোনো অনুষ্ঠানে এ জাতীয় পানীয় পরিবেশন নিষিদ্ধ। আমার মতে, বিদেশে গিয়েও আমাদের পক্ষে এই নিষিদ্ধ পানীয় গ্রহণ করা সঠিক নয়। তুমি আমাকে কোমল পানীয় দাও। আমি আপত্তি করব না। কিন্তু ভদকা আমি খাব না। আমার কথায় যেন তারা একটু অপ্রস্তুত হলো। বলল, দুঃখিত মনে কিছু করো না। তোমাকে কোমল পানীয় দেয়া হচ্ছে। তবে এর আগে তোমাদের দেশের অনেক প্রতিনিধি দল এদেশে এসেছে। কিন্তু কেউই এ ধরনের কথা তোলেননি।
আমাদের আগে যারা এসেছে তাদের কথা উল্লেখ করেই একদিন চরম বিতর্ক হলো প্রাভদা অফিসে। প্রাভদা সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র। একদিন সন্ধ্যাবেলা আমাদের খবর দেয়া হলো আমাদের প্রাভদার সম্পাদক কমরেড জিমিনিনের সাথে আলাপ করতে হবে। আমাদের বলা হলো তোমরা খুবই ভাগ্যবান। তোমাদের সাথে কথা বলবেন সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সদস্য যিনি প্রাভদার সম্পাদক। সন্ধ্যার পর আমরা প্রাভদা অফিসে গেলাম। আলোচনা শুরু হলো সম্পাদকের কক্ষে। জানানো হলো আমাদের সাথে আলোচনাকালে উপস্থিত আছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের পররাষ্ট্র দফতরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। তবে আলোচনা শুরু হবার প্রাক্কালেই সব কিছু যেন গোলমেলে হয়ে গেল। আমার সফরসঙ্গী আলোকচিত্র শিল্পী মোজাম্মেল ও সাংবাদিক শামসুল হক, আলী নূর। শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর প্রথম প্রশ্ন করল আলী নূর। আলী নূরের প্রশ্ন হচ্ছে–বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের জন্যে সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনো সাহায্য দিতে পারবে কিনা। মনে হলো প্রাভদা সম্পাদক এই প্রশ্নটিকে ভিন্নভাবে নিলেন। তিনি যেন একটু রুক্ষ হলেন। বললেন, তোমাদের দেশ থেকে যারা আসছে সকলেই সাহায্যের কথা বলছে। আমাদের দেশের সাধারণ কৃষক শ্রমিক শুধুমাত্র তোমাদের সাহায্য করার জন্যে তো আর কাজ করছে না। প্রাভদার সম্পাদকের উত্তর আমার কাছে অপমানকর মনে হলো। আমি বললাম, দেখুন, আমরা গরিব হতে পারি, আমরা কিন্তু ভিখারী নই। এর আগে কারা আপনাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছে জানি না। আমরাই আমাদের দেশকে গড়ে তুলতে পারব। মনে হলো আমার জবাবে প্রাভদা সম্পাদক ক্ষেপে গেলেন। তিনি বললেন–তুমি কি জান, কী করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে মোকাবেলা করতে হয়। আমি বললাম–এ শিক্ষা আপনার কাছে থেকে নেব না। আমরা ন’মাস যুদ্ধ করে স্বাধীন হয়েছি। যুদ্ধের শেষের দিকে আপনারা আমাদের সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন এ জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। কিন্তু কারো সহযোগিতা ছাড়াই আমরা জিততে পারতাম। সারা বিশ্ব আমাদের সমর্থন কত। এবার প্রাভদা সম্পাদক একটু ভিন্ন সুরে কথা বললেন। তিনি বললেন, তুমি কি আন্তর্জাতিকতাবাদ বোঝ এবং জান যে আমাদের বন্ধুরা ভিয়েতনাম এবং হাভানায় যুদ্ধ করছে? তোমাদের কি এ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে? আমি বললাম, অভিজ্ঞতা ছিল বলেই তোমাদের সাহায্য-সহযোগিতা পাওয়ার আগে ২৩ বছর আমরাই মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছি। আর আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আমার একটি ভিন্ন ধারণা আছে। আমাদের আন্তর্জাতিকতাবাদ ঢাকা থেকে শুরু হয়ে হাভানা যায়। ভিয়েতনাম যায়। ভিয়েতনাম থেকে শুরু হয়ে ঢাকা আসে না। সেদিক থেকেই তুমি বলতে পার এ ব্যাপারে আমি একবারেই গেঁয়ো। আমি জাতীয়তাবাদী বলেই আন্তর্জাতিকতাবাদী। আমার কথার মধ্যে পররাষ্ট্র বিভাগের এক কর্মকর্তা বাধা দিলেন। বললেন, আপনি বড্ড সেন্টিমেটাল। আমি বললাম, সেন্টিমেটাল বলেই আমরা এত বড় শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পেরেছি। আমাদের প্রচণ্ড আবেগ আমাদের সাহসী করেছে। আমি আবারও বলতে চাই, আমি জাতীয়তাবাদী বলেই আন্তর্জাতিকতাবাদী আর আমি যতদূর জানি এটাই লেনিনের কথা।
এবার মুখ খুললেন প্রাভদার সম্পাদক। বললেন, শুনেছি, তুমি সর্বত্রই লেনিন নিয়ে কথা বলেছ। কারো সাথে তোমার ঐকমত্য হয়নি। আমি বললাম, দেখো লেনিন মারা গেছে। তার সম্পর্কে তোমাদের এবং আমার ব্যাখ্যা এক হচ্ছে না। তাই সর্বত্রই আমি বলেছি লেনিন নিয়ে বিতর্ক করে লাভ নেই। কারণ কেউই চূড়ান্ত কথা বলতে পারবে না।
কমরেড জিমেনিন এবার ভিন্ন কথা তুললেন। বললেন, তোমাদের ইউনিয়ন কি আমাদের ইউনিয়নের সাথে কোনো চুক্তি করতে রাজি। আগামী সপ্তাহে ভারতের সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতারা আসবেন। তারাও চুক্তি করবেন। তোমরা এলে আপত্তি কি? আমি বললাম, আমি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। বাংলাদেশে জাতীয় সাংবাদিক ইউনিয়ন গঠিত হয়নি। তাই আমার পক্ষে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করা সম্ভব নয়। এ কথা আমি প্রথম থেকেই বলেছি।
