আমাদের সম্পর্কে তারা যে কত জানে তার প্রমাণ পেয়েছিলাম পরবর্তী সফরে ১৯৭৪ সালে। ১৯৭৪ সালে আমি ও কামাল লোহানী পূর্ব জার্মানি, হাঙ্গেরি ও চেকোস্লোভাকিয়ায় গিয়েছিলাম। আমাদের সম্পর্কে বিস্তারিত খবর পেলাম রাজধানী প্ৰাগে। সেকালের সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে চেকোশ্লোভাকিয়ার রাজধানী প্ৰাগ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রাগে যেমন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সাংবাদিক ইউনিয়ন আইওজের সদর দফতর ছিল তেমনিভাবে অসংখ্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সদর দফতর ছিল প্রাগে। আন্তর্জাতিক পরিবহন শ্রমিকদের ইউনিয়নের প্রধান দফতর ছিল প্রাগে। এই ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ভারতের দেবু গাঙ্গুলী। এককালে দেবু গাঙ্গুলীর বাড়ি ছিল বাংলাদেশের বরিশালে। তিনি ভারতের সিপিআই-এর সদস্য। দীর্ঘদিন প্রাগে আছেন। ১৯৭৪ সালে প্রাগে গিয়ে প্রথমে তার বাসায় উঠেছিলাম। কথায় কথায় তিনি বললেন, সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আমাকে নাকি চেনে। দেবু বাবু বললেন, আপনি নির্মল সেন বরিশাল বিএম কলেজে পড়তেন। আরএসপি করতেন। বিড়ি সিগারেট খান না। আপনার কোনো নেশা নেই। একথা আমরা সকলেই জানি। আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছেন সব দেশেই আপনাকে বিশেষ ধরনের দোভাষী দেয়া হয়েছে। এরা কখনোই আপনার সাথে খেতে বসে তেমন কোনো নেশা করেননি। সুতরাং আপনার ভয় পাবার কারণ নেই।
তবে এই চেকোশ্লোভাকিয়ায় সফরকালেই একটা ভিন্ন ঘটনা ঘটেছিল। চেকোশ্লোভাকিয়ায় গিয়ে আমার মনে হয়েছিল কোথায় যেন একটা ভয় ভয় আছে। মাত্র কয়েক বছর আগে চেকোস্লোভাকিয়ায় প্রতিবিপ্লবের চেষ্টা হয়েছিল। সেই প্রতিবিপ্লব ঠেকাতে ট্যাঙ্ক এসেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে। হয়তো একথা স্মরণ করেই চেকোস্লোভাকিয়াকে একটু বিশিষ্ট বলে আমার মনে হতো। আর এ জন্যে আমি প্রাগের বিমানবন্দরে নেমে বন্ধুদের বলেছিলাম, আমি ব্রাতিস্লাভা যাব। সকলেই হয়তো জানেন যে চেক ও ব্রাতিশ্লাভা এই দুই রাজ্য মিলেই চেকোশ্লোভাকিয়া। সমাজতান্ত্রিক
আমার জবানবন্দি-৩৩
চেকোস্লোভাকিয়ার পতনের পর চেকোশ্লোভাকিয়া চেক ও স্লোভাকিয়া নামে এখন দুটি রাষ্ট্র হয়ে গেছে। চেকোস্লোভাকিয়া সফরে যাবার আগেই আমি জানতাম যে সেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গোলমাল চলছে। এই গোলমালের কেন্দ্র ব্রাতিশ্লাভা। তাই আমার ব্রাতিস্লাভা যাবার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু বন্ধুরা রাজি হলো না। তারা জানাল–তোমার সফরসূচিতে ব্রাতিস্লাভা নেই। আমি দশদিন চেকোস্লোভাকিয়ায় ছিলাম কিন্তু ব্রাতিস্লাভায় যেতে পারিনি। তবুও আলোচনা বিতর্ক হয়েছে অনেক।
চেকোশ্লোভাকিয়ায় বন্ধুরা কথায় কথায় বলতেন তোমরা যে কোনো প্রশ্ন করো, আমরা জবাব দেব। আমরা বলতাম, সব প্রশ্নের জবাব তোমরা দিতে পারবে না। একদিন এক প্রশ্ন নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়। আমি বললাম, এবার আমি তোমাদের একটি প্রশ্ন করব। চেসকালিপার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা বলল, সব প্রশ্নের জবাব তুমি পাবে। আমি বললাম, ঠিক আছে। আমাদের চেকোস্লোভাকিয়া সফরকালে ওয়ারশ প্যাকট ও ন্যাটোর সাথে কথা হচ্ছিল। পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশ সমাজতান্ত্রিক শিবিরের যৌথ সামরিক বাহিনীর সদর দফতর। উষ্ণ আটলান্টিক চুক্তি সংস্থা অর্থাৎ ন্যাটোর সদর দফতর ব্রাসেলস। কিছুকাল ধরে এ দুই বাহিনীর মধ্যে আলোচনা হচ্ছিলো সৈন্য সংখ্যা কমাবার। এমনোও কথা হচ্ছিলো যে ন্যাটো বাহিনী ভেঙে দেয়া হলে ওয়ারশ বাহিনীও ভেঙে দেয়া হবে। উল্লেখ্য, ওয়ারশ চুক্তি অনুযায়ী সমাজতান্ত্রিক শিবিরের প্রতিটি দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ফৌজের সদস্যরা অবস্থান করছে।
এ পটভূমিতে আমি প্রশ্ন করেছিলাম, কয়েক বছর আগে চেকোস্লোভাকিয়ায় প্রতিবিপ্লবের চেষ্টা হয়েছিল। এই প্রতিবিপ্লব দমনের জন্যে এখনো ওয়ারশ বাহিনী চেকোশ্লোভাকিয়ায় অবস্থান করছে। ন্যাটোর সাথে চুক্তি করে ওয়ারশ বাহিনী ভেঙে দেয়া হলে বাইরের সৈন্য তো চেকোশ্লোভাকিয়ায় থাকবে না। এ পরিস্থিতিতে প্রতিবিপ্লব কি ঠেকানো যাবে?
আমার প্রশ্নে কমিউনিষ্ট বন্ধুরা চুপ করে গেলেন। বললেন, এ প্রশ্ন রাষ্ট্রীয় নীতির সাথে জড়িত। শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় নেতারাই এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন। তুমি আগে গিয়ে প্রশ্ন করে দেখতে পার। জবাব পাবে। যদিও তেমন ইচ্ছে আমার ছিল না। আমি জানতাম এ প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে নেই। বারবার আমার এ অভিজ্ঞতা হয়েছে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সফরকালে।
তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছিল ভিন্ন রকম। দুটি দেশ সফর করে সোভিয়েত ইউনিয়নে এসেছি। দেশ দুটি হচ্ছে পূর্ব জার্মান ও হাঙ্গেরি। পূর্ব জার্মানের সর্বত্রই একটা কঠোর নিয়ন্ত্রণ। নিয়মের বাইরে কেউ যায় না। কেউ পছন্দ না করলেও এ চিত্রটি আমার ভালো লেগেছে। পূর্ব জার্মানিতে তেমন প্রাণ খোলা উচ্ছ্বাস কিংবা উল্লাস দেখিনি, আর হাঙ্গেরিতে কিছুটা বিপরীত। সেখানে সবকিছু খোলামেলা। পূর্ব জার্মান ও হাঙ্গেরির পার্থক্যটা বড় স্পষ্ট। হাঙ্গেরির সাংবাদিক জর্জ কমার একটি ঘটনা দিয়ে আমাকে তা বুঝিয়েছিলেন। ঘটনাটি হচ্ছে–সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী ক্রুশ্চেভের পদত্যাগ নিয়ে। কুশ্চেভ পদত্যাগ করলে পরের দিন হাঙ্গেরির সকল কাগজে সে খবর ছাপা হলো। কিন্তু পূর্ব জার্মানির কাগজে ছাপা হলো না। জর্জ কলমার বলেছিলেন, মস্কো থেকে এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশ না আসায় পূর্ব জার্মানির কাগজে এ খবর ছাপা হলো একদিন পর।
