এমন একটি পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলাম আমি ১৯৭২ সালে। হাঙ্গেরির সাংবাদিক জর্জ কলমার, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ তিনি ঢাকায় ছিলেন। তখন খবর বিশ্বে আদৃত হয়েছিল। তিনি এক রাতে আমাকে এক হোটেলে নিমন্ত্রণ করলেন। ঘণ্টা দুই তার সঙ্গে আলাপ হলো। আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান। সিরাজ থেকে শুরু করে মওলানা ভাসানী পর্যন্ত সকলের কথা শুনতে চাইলেন। তিনি মওলানা সাহেবের কিছু কথায় ক্ষুব্ধ। তিনি বললেন, মওলানা সাহেবের কথা নাকি চীন ও পাকিস্তানের পক্ষে যাচ্ছে। এক সময় বিতর্ক তুঙ্গে উঠেছে। আমি বললাম, তুমি যত কথাই বলো না কেন মওলানা ভাসানী একজন জাতীয় নেতা হিসেবে থাকবেন। অর্থাৎ মওলানা ভাসানী সম্পর্কে তোমার সাথে একমত হতে পারলাম না।
এবার তিনি একটি ভিন্ন প্রস্তাব করলেন। বললেন আইওজে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলন করতে চায়। সব খরচ তাদের। ঢাকার সাংবাদিক ইউনিয়নের শুধুমাত্র আয়োজনের দায়িত্ব নিতে হবে। আমি একমত হলাম না। আমি বললাম, কোনো আন্তর্জাতিক সংগঠনেরই অনুমোদিত সংগঠন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন নয়। আমরা তোমাদের অঙ্গ সংগঠন হলে এ দায়িত্ব নিতে পারতাম। কিন্তু আজকের পরিস্থিতিতে আমাদের পক্ষে এ দায়িত্ব নেয়া সম্ভব নয়।
জর্জ কলমার ক্ষুব্ধ হলেন। আমিও দুঃখ পেলাম। আমার সমস্যা হচ্ছে কারো সঙ্গে একমত হতে পারছি না। এমনিতে কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থক বা সদস্য না হওয়ায় মার্কিন দালাল বলে পরিচিত। এরপর সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে গিয়ে বিতর্ক করছি এবং তাদের কোনো প্রস্তাবে সায় দিতে পারছি না। ফলে এক সময় নীরবে জর্জ কলমার সাথে আলোচনা শেষ হলো। পরিস্থিতি তুঙ্গে উঠল পরের দিন বিকেলে। বুদাপেস্ট থেকে এক ঘণ্টার পথ। ব্যালটন থেকে আইওজের তাবু। ৮০ কিমি দীর্ঘ এই লেক। এককালে রবীন্দ্রনাথ এখানে বেড়াতে এসেছিলেন। তাঁর নামে একটি সড়কও আছে। আমার দোভাষী অ্যাগনিস একসময় একজন ড্রাইভারকে আমার কাছে হাজির করলেন। সে নাকি বিশ্বকবির গাড়ির ড্রাইভার ছিল। অথচ সে তখন বুঝতে পারেনি যে রবীন্দ্রনাথ একজন বিশ্ববিখ্যাত কবি।
এই ব্যালটন থেকেই শুরু হলো আইওজের অধিবেশন। বিকেলের দিকে আমার সামনে একটি যুক্ত ইশতেহার হাজির করা হয়। বলা হলো এ ইশতেহার স্বাক্ষর করো। আমি খানিকটা হতচকিয়ে গেলাম। আমি বললাম, আমার সাথে কথা ছিল যুক্ত ইশতেহারের একটি খসড়া হবে। সেই খসড়া নিয়ে আমি ঢাকায় যাব। ঢাকার বন্ধুরা সম্মত হলে যুক্ত ইশতেহার প্রকাশিত হবে-নইলে নয়। আমি দেখলাম আমার প্রস্তাব উল্টে দিয়ে তারা চূড়ান্ত ইশতেহারটি হাজির করেছে স্বাক্ষরের জন্যে। আমি স্বাক্ষর দিতে রাজি হলাম না। বললাম, তোমরা ভুল করেছ। আমি কিনবার মতো পণ্য নই। আমার প্রস্তাব রাখা না হলে আমি স্বাক্ষর করব না। খসড়া ইশতেহার হিসেবে তোমরা এ ইশতেহার আমাকে দিতে পার। আমি ঢাকায় গিয়ে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেব।
তারা রাজি হলেন না। দেখলাম তারাও অনড়। পরে জানতে পেরেছি। তারা আমার জন্যে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করে তাদের রাজি করিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন আমি তাদের কথা শুনব। কিন্তু তেমনটি ঘটল না। আমি স্বাক্ষর করলাম না। তার প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল রাতে। রাতে আমাকে জানানো হলো, পরদিন ভোরে আমাকে মস্কো যেতে হবে। আমার মস্কো যাবার টিকেট কনফার্ম হয়েছে। অর্থাৎ পূর্ব জার্মানির মতোই আমাকে হাঙ্গেরি থেকে বিদায় নিতে হলো। তারা আমাকে মস্কো পাঠালেন ভিসা না করেই।
হাঙ্গেরি থেকে দুঃখজনকভাবে বিদায় নিলাম। মস্কো বিমানবন্দরে পৌঁছে বুঝলাম–সত্যি সত্যি হাঙ্গেরির বন্ধুরা আমার আচরণে সন্তুষ্ট হননি। তাই ভিসা ছাড়াই আমাদের পাঠিয়ে দিয়েছেন মস্কোতে। মস্কো বিমানবন্দরে এসে বুঝলাম ভিসা না থাকায় কী বিপদ!
বিমানবন্দরে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান সাংবাদিকরা এসেছিলেন। আমাদের তিনজনের ভিসা না থাকায় তাঁরা বিচলিত হলেন। বললেন, ব্যাপারটা ঠিক হয়নি। তারপরও ভালো আচরণ করলেন তাঁরা। একটি ভিভিআইপি কক্ষে আমাদের নিয়ে গেলেন। বললেন, এ কক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহর লাল নেহেরু এবং রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণান বসেছেন। তোমরা এখানে অপেক্ষা করো। পাঁচ ঘণ্টা কেটে গেল। ভিসার কোনো পাত্তা নেই। এক সময় এক সাংবাদিক বন্ধু উষ্ণ কণ্ঠে বললেন, আমলাদের জন্যে কোনো কিছুই করা যাবে না। আমরা তোমাদের শহরে নিয়ে যাচ্ছি। মস্কো শহরে পিকিং হোটেলে তোমরা থাকবে। তবে কোথাও বের হবে না। কিছুক্ষণের মধ্যে আমরা তোমাদের ভিসা নিয়ে আসব। ভিসা পাবার পরেই তোমরা বের হতে পারবে। নইলে নয়। এ আলোচনার পরেই আমরা মস্কো বিমানবন্দর ত্যাগ করলাম। গেলাম হোটেলে। সেদিন রাতে তেমন আলাপ হলো না। আমাদের সফর শুরু পরের দিন ভোরবেলা। তবে সে সফরসূচিতে নতুনত্ব কিছুই ছিল না। পূর্ব জার্মান বা হাঙ্গেরির মতোই বিভিন্ন অফিসে যাওয়া, চা খাওয়া এবং আলোচনা করা। সে আলোচনা কখনো বিতর্কে পৌঁছত না। আমি একবার প্রস্তাব করলাম লেনিনগ্রাদ সফরের। আমার বড় ইচ্ছে ছিল–লেনিনের নামের সাথে জড়িত এই শহরটি দেখার। আমাকে জানানো হলো–তোমাদের সফরসূচিতে লেনিনগ্রাদ নেই। তোমরা শুধু মস্কো শহরই দেখতে পারবে। কথাগুলো আমার ভালো লাগল না। তবে বুঝলাম যে আমাদের সম্পর্কে সব কথাই ওদের জানা। আমাদের সব খবর ওরা রাখে। হাঙ্গেরি এবং পূর্ব জার্মানিতে আমাদের আলোচনার খবর ওদের কাছে পৌঁছেছে। ওরা জানতে পেরেছে যে তাদের অনেক প্রস্তাবেই আমরা রাজি হইনি।
