বার্লিন থেকে বুদাপেস্ট এলাম। পূর্ব জার্মানি থেকে হাঙ্গেরি। বুদাপেস্ট ফিটফাট ছিমছাপ সুন্দর শহর। রাতের বুদাপেস্ট লোভনীয়। বলা হয়, সৌন্দর্যের দিক থেকে প্যারিসের পরেই বুদাপেস্ট। বুদাপেস্ট-এ একটি সাংবাদিক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউট আছে। এই ইন্সটিটিউটি চালায় আন্তর্জাতিক Seating 31 (International Organization of Journalists) i face তখন মুখ্যত দুটি প্রধান সাংবাদিকদের সংগঠন। একটি আইওজে, অপরটি আন্তর্জাতিক জার্নালিস্ট ফেডারেশন। প্রথমটি কমিউনিস্ট প্রভাবিত। দ্বিতীয়টি তথাকথিত স্বাধীন বিশ্বের। প্রথমটির প্রধান দফতর প্রাগে। দ্বিতীয়টির প্রধান দফতর বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস শহরে।
বুদাপেস্টে বাংলাদেশের সতের জন সাংবাদিক প্রশিক্ষণ নিচ্ছিল। আমার বুদাপেস্ট যাওয়ার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তাদের সঙ্গে দেখা করা। বুদাপেস্টে পা দিয়েই মনে হয় এক সর্বনাশা দেশে এসেছি। এটা পূর্ব জার্মান বা বার্লিন নয়। পূর্ব জার্মানের সমাজে নিয়মানুবর্তিতা দেখার মতো, অনুকরণ করার মতো। কিন্তু বুদাপেস্টের পরিবেশ একেবারেই উল্টো। এখানে ছেলে মেয়েদের সম্পর্ক অনেক খোলামেলা, অনেক উদার। তাই আমি অনেকটা শঙ্কিত হলাম। তাই মনে হলো কী করে আমাদের সাংবাদিকরা এই পরিবেশের মোকাবেলা করবে।
সাংবাদিক প্রশিক্ষণ ইন্সটিটিউটের প্রধান হচ্ছেন মিস মাৰ্ধা। আমি তাকে প্রথমে প্রশ্ন করেছিলাম তোমাদের দেশে এসে ভয় হচ্ছে। তোমাদের দেশ থেকে বিদায় নেবার সময় আমাদের ছেলেরা কোনো আবেগের টান রেখে যাবে না তো। মার্থা হেসে ফেলল। ইংরেজিতে বলল, Mr. President, you are too much intelligent for this country. Nothing will happen to your boys.
এভাবেই আমার হাঙ্গেরি সফর শুরু হয়েছিল। কিন্তু এ সফরও আমার খুব সুখকর ছিল না। বার্লিনে আমি পূর্ব জার্মান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করতে রাজি হইনি। দেখলাম এ কথা সবাই জানে। লক্ষ্য করলাম ম্নি কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে আমাকে দলে টানবার জন্যে। অর্থাৎ তারা সবাই চাইছিল, বাংলাদেশ তাদের সংগঠন আইওজের অন্তর্ভুক্ত থোক।
কিন্তু এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। এছাড়া বাংলাদেশ নীতিগতভাবে নির্জোট আন্দোলনের সদস্য।
বাংলাদেশের জন্মলগ্নে সেকালের সরকারের সাথে আলোচনা না করে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ আমি আদৌ সমীচীন মনে করিনি। আমার এ সিদ্ধান্ত ছিল একক এবং এই একক সিদ্ধান্তের কারণেই প্রতি পদে পদে আমাকে
হোঁচট খেতে হয়েছে। হাঙ্গেরিতেও তার ব্যতিক্রম হলো না। হাঙ্গেরিতে তখন। আইওজে নির্বাহী কমিটির বৈঠক চলছিল। ওই বৈঠকে আমাকে ডাকা হলো আমন্ত্রিত সদস্য হিসেবে। বৈঠকে ঢুকে প্রথমে এক দফা বিতর্ক হয়ে গেল মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিনিধিদের সাথে। আমি বললাম, কোন যুক্তিতে তোমরা বাংলাদেশের সংগ্রামের বিরুদ্ধে গেলে? কেন পাকিস্তানের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলে ১৯৭১ সালে। তাদের বক্তব্য আমাকে চমকে দিল। তাদের জানা মতে, বাংলাদেশের শতকরা ৮০ জন অধিবাসী মুসলমান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল ভারতের চক্রান্ত। অনেক কষ্টে তাদের বোঝাতে সক্ষম হলাম, তাদের তথ্য ঠিক নয়। এ প্রশ্নে আমাকে সহযোগিতা করেছিলেন সুদান সাংবাদিক ইউনিয়নের একজন মহিলা। তিনি দক্ষিণ সুদানের অধিবাসী। দক্ষিণ সুদান স্বাধীনতা চাচ্ছে। সুতরাং তার পক্ষে আমাদের সমস্যাটি অনুধাবন করা সহজ ছিল। তবে এরপরও একটি মোক্ষম সমস্যা আমাদের মোকাবেলা করতে হয়েছিল। তাদের প্রশ্ন হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণের শতকরা ৮০ জন অধিবাসী মুসলিম হলে নির্মল সেন তোমাদের প্রেসিডেন্ট কেন? তিনি তো মুসলমান নন। আমার বন্ধুরা হেসে এ প্রশ্নের জবাব দিয়েছিল।
তবে আমার বিপদ হয়েছিল অন্যত্র। আইওজের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেয়া হলো একটি যুক্ত বিবৃতি দেবার। আমি বললাম, আইওজের সঙ্গে যুক্ত বিবৃতি দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার দেশে ফিরে বন্ধুদের সাথে আলাপ করে বিবৃতি দেয়া সম্ভব। আমি একক দায়িত্বে কোনো বিবৃতি দেব না। আমি প্রস্তাব করলাম একটি বিবৃতির খসড়া করা হোক। এই খসড়া বিবৃতি নিয়ে আমি ঢাকায় ফিরে যাব। ঢাকায় বন্ধুরা একমত হলে একই দিনে ঢাকা ও বুদাপেস্ট থেকে একটি যুক্ত ইশতেহারে প্রকাশিত হবে। আইওজের বন্ধুরা একমত হলেন। কিন্তু ঘটনা ঘটল ভিন্ন। ইতিমধ্যে হাঙ্গেরির বিভিন্ন এলাকায় সফর করেছি। আলাপ হয়েছে কমিউনিস্ট নেতাদের। হাঙ্গেরিতে দেখলাম নতুন হাওয়া। কমিউনিস্ট মহলে ভিন্ন চিন্তা শুরু হয়েছে। ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে যুদ্ধের স্মৃতিফলক হিসেবে নির্মিত সোভিয়েত ইউনিয়নের বিজয়ী সেনা এক মর্মর মূর্তি ভেঙে ফেলেছিল। লক্ষ্য করলাম তরুণরা নিদারুণভাবে সোভিয়েত বিরোধী। অর্থনীতিবিদদের সাথে কথা হলে তারা কিছু নতুন বই দিল। তাদের বইয়ের এক নতুন অর্থনীতির সুপারিশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে মুনাফার কথা। মোটামুটিভাবে ম্যানেজারিয়েল অর্থনীতির নামে একটি বাজার অর্থনীতি গড়ে উঠছে হাঙ্গরিতে। এই অর্থনীতির প্রবক্তা হচ্ছেন আন্দ্রেপভ। তিনি হাঙ্গেরিতে রাশিয়ান দূত। পরবর্তীকালে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতা হয়েছিলেন। আন্দ্রেপভের শিষ্য হিসেবে ক্ষমতায় এসেছিলেন গর্বাচেভ। সে অনেক পরের কথা। তখন আঁচ করতে পারিনি আদ্রেপভ ও গর্বাচেভ শেষ পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয় ডেকে আনবে। তবে হাঙ্গেরিতে গিয়ে মনে হয়েছিল কোথায় যেন বেসুরে বাজছে। সবাই এক সুরে কথা বলছেন। দ্বিতীয়বার হাঙ্গেরিতে গেলাম ১৯৭৪ সালে। এক সাংবাদিক বন্ধুর সাথে তার গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলাম। সড়কের পাশে এক রাশিয়ান ট্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে। এই সাংবাদিক চিৎকার করে উঠল। বলল, দেখেছ দূরে আমার পিতৃভূমির ট্যাঙ্ক দাঁড়িয়ে আছে। ওরা আমাদের রক্ষা করতে এসেছে। আমি অবাক হয়ে তরুণ সাংবাদিকের দিকে তাকালাম। বললাম, এসব তুমি কী বলছ। কিন্তু আমার কথায় তার মুখে কোনো ভাবান্তর হলো না। আগেই বলেছি এ দৃশ্য ১৯৭৪ সালের। ১৯৭২ সালে এমন প্রকাশ্যে কাউকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে বলতে শুনিনি। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে তখন একটি প্রবণতা ছিল বিদেশীদের বুঝিয়ে শুনিয়ে তাদের দলভুক্ত করা।
