তখন পূর্ব জার্মানিতে ক্ষমতায় ছিল পাঁচটি দল। এ পাঁচটি দল হচ্ছে পূর্ব জার্মান কমিউনিস্ট পার্টি ও এককালের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি মিলে সোস্যালিস্ট ইউনিটি পার্টি। এই সোস্যালিস্ট ইউনিটি পার্টি মুখ্যত কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে পরিচিত। এছাড়া ছিল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি, ডেমোক্র্যাটিক ফার্মার পার্টি এবং ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এই পাঁচটি দলের সমন্বয়ে পূর্ব জার্মান সরকার গঠিত। প্রতিটি দলেই নাকি ঐক্যবদ্ধভাবে শান্তি গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের আদর্শে অনুপ্রাণিত। এ দলগুলোর নিজস্ব মুখপাত্র এবং দৈনিক পত্রিকা আছে। পত্রিকার মূল আদর্শ শান্তি, গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র।
লাইপজিগে সোশ্যালিস্ট ইউনিটি পার্টির দৈনিক মুখপাত্রের নাম পিপলস ডেইলি। এই পত্রিকার অফিসেই একদিন সম্পাদকের সাথে আমার বিতর্ক শুরু হলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম–আপনাদের পাঁচটি পার্টির সরকার এবং পাঁচটি পত্রিকা আছে। এই পাঁচটি পত্রিকাই কি সমাজবাদে বিশ্বাসী? তাদের সবাই কি দেশপ্রেমিক। এদের মধ্যে কেউ কি জনতার শত্রু নয়।
সম্পাদক আমার প্রতিটি প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর দিলেন। আমার শেষ প্রশ্ন ছিল আপনাদের পত্রিকাগুলো কি অন্যদলের খবর ছাপিয়ে থাকে।
তিনি বললেন, না। আমি বললাম, কেন এমন হবে? সব দলই যদি সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হয় এবং দেশপ্রেমিক হয় তাহলে তাদের খবর ছাপাতে বাধা কোথায়। আমার প্রশ্ন হচ্ছে এই ঐকফ্রন্টের আদর্শগত বিশ্বাস এক হলে আর এক দল অন্যদলের খবর না ছাপালে সংশয় সৃষ্টি হবে না কি। পিপলস ডেইলির সম্পাদক আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না।
তিনি বললেন, আমরা অন্যদলের খবর ছাপাই না সেটাই হচ্ছে আমাদের শেষ কথা।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। বার্লিনে ফিরলাম। আবার দেখা হলো সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতাদের সাথে। আমি বললাম, তোমাদের দেশে তো পাঁচ পার্টির সরকার। মার্কসবাদ লেনিনবাদ আমরা যতদূর পড়েছি তাতে তো আমাদের ধারণা যে শ্রেণি ভিন্ন দল হয় না। প্রতিটি দলই এক একটি শ্রেণির প্রতিনিধি। সে অর্থে কি তোমাদের দেশের পাঁচটি দল বিভিন্ন শ্রেণির প্রতিনিধি না! এবং তাহলে কি তোমাদের সরকার বিভিন্ন শ্রেণির সরকার নয়? তোমাদের সরকার কি বহুদলীয় সরকার নয়? সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ আমার কথার জবাব দিলেন না। শুধু বললেন, এ প্রশ্ন আমাদের দেশে উঠেছে এবং আলোচনা হচ্ছে। একই আলোচনা আবার উঠেছিল। হাঙ্গেরির অর্থনীতিতে তখন নতুন হাওয়া লেগেছে। হাঙ্গেরিতে তখন ম্যানেজারিয়াল অর্থনীতি চালু হচ্ছে। কথা উঠেছে প্রোটি মোটিভের। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তোমাদের এই অর্থনীতি কি একটি নতুন শ্রেণির জন্ম দিচ্ছে না। তোমাদের একটি ম্যানেজারিয়াল শ্রেণির জন্ম দিচ্ছে। ফলে একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামো গড়ে উঠবে নাকি? আমার কথায় তারা একমত হলেন না। তাঁরা বললেন, লাল ফিতার দৌরাত্ম থাকবে।
এ মুহূর্তে এ দৌরাত্ম আমরা এড়াতে পারব না। তবে একথা ঠিক যে ভুল আমরা প্রথমে করেছিলাম। ১৯৪৫ সালে ফ্যাসিস্টদের পরাজয়ের পর আমরা ক্ষমতায় আসি। আমরা চেষ্টা করেছিলাম সোভিয়েত ইউনিয়নকে হুবহু নকল করতে। তার প্রতিক্রিয়া হয়েছে ১৯৫৬ সালের প্রতিবিপ্লবে। আমি বললাম–ব্যাপারটা অন্যভাবেও ব্যাখ্যা করা যায়। আমি যতটুকু লেনিন পড়েছি তাতে আমার মনে হয় তোমরা আরেক ভুলের দিকে এগোচ্ছ। তোমরা এবার শ্রেণি সমন্বয়ের পথ বেছে নিয়েছ। তোমাদের ম্যানেজারিয়াল অর্থনীতি কেন্দ্র করে নতুন শ্রেণি বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে প্রশাসনে। তাতে শ্রেণিহীন সমাজ গঠনের পথে বাধা আসবে নাকি। হাঙ্গেরির বন্ধু হাসলেন। বললেন, তোমাদের ভুলটা কি জান, তোমরা পূর্বাপর সম্পর্ক না রেখে লেনিনের উদ্ধৃতি দাও। আমি বললাম–এ অভিযোগ তোমাদের বিরুদ্ধেও আছে। তোমরা সত্যিকার প্রেক্ষিতে লেনিনের উদ্ধৃতি দাও আর আমরা দিই না, এ বিচার করল কে? এবার তিনি আরো স্পষ্ট হলেন। বললেন–লেনিন জীবিত থাকলে তোমার কথাই মানতেন তার নিশ্চয়তা কোথায়? আমি বললাম-ভোমার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
সেদিন কথা তেমন জমেনি। লেনিন নিয়ে এ ধরনের কথা পরবর্তীকালেও হয়েছে। বিতর্ক হয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাজধানী মস্কোতে। সে বিতর্কের পর আমার দোভাষী বলেছিলেন–তোমার জন্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। সে অনেক পরের কথা।
পূর্ব জার্মানিতে আমার সর্বশেষ আলোচনা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের নিয়ে। আমি সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি। আমাদের দেশে তখন হাজার হাজার রাজাকার ও আলবদর কারাগারে। তিরানব্বই হাজার পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দি ভারতে অবস্থান করছে। এদের ভবিষ্যৎ নিয়ে লেখালেখি এবং জল্পনা কল্পনার শেষ নেই। তাই আমার কৌতূহল হয়েছিল জার্মানের বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু জানবার। ১৯৪৫ সালে ফ্যাসিবাদী জার্মানি পরাজিত হয়। পূর্ব জার্মানিতে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসে। তাদের সামনে সমস্যা ছিল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের। তাই আমার ইচ্ছা ছিল কীভাবে যুদ্ধাপরাধীদের সমস্যা মোকাবেলা করেছে তা জানবার।
যুদ্ধ বন্দিদের সম্পর্কে একটি পরিষ্কার চিত্র তুলে ধরেছিল জার্মানের বন্ধুরা। তাদের মুখ্য বক্তব্য হচ্ছে–যুদ্ধবন্দি হিসেবে সকলকে এক কাতারে ফেলা যাবে না। সকলে এক প্রকার অপরাধ করেনি। তাই সকলের শাস্তিও একরকম হবে না। মনে রাখতে হবে কোনো দেশের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ অপরাধী হতে পারে না। তারা পরিবেশের শিকার। প্রথমে হয়তো তারা তোমাদের পক্ষেই ছিল। পরবর্তীকালে নানা কারণে হয়তো তারা বিপক্ষে যোগ দিয়েছিল। এই আম-জনতাকে রেহাই দেয়াই বাঞ্ছনীয়। ধরতে হবে পালের গোদাকে। যারা এই অপরাধী দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন তাদের আদৌ ক্ষমা নেই। তাদের চরম শাস্তি দিতে হবে। জার্মান বন্ধুদের পরামর্শ ছিল–যুদ্ধাপরাধীদের সম্পর্কে তড়িঘড়ি করে নয়, ধীরে-সুস্থে ব্যবস্থা নিতে হবে। সবাইকে একই দণ্ড দেয়া যাবে না। তাদের কথায় আমি যুক্তি খুঁজে পেয়েছিলাম। ঢাকায় ফিরে পূর্ব জার্মানের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে আমি দৈনিক বাংলায় উপসম্পাদকীয় লিখলাম। হয়তো আমিই প্রথম স্বাধীন বাংলায় যুদ্ধাপরাধীদের শ্রেণি বিভাগের কথা বলেছিলাম। বলেছিলাম–আম-জনতাকে ক্ষমতা করে দেয়া হোক। বড় বড় নেতাদের ফায়ারিং স্কোয়াডে নেয়া হোক। কোনো বিচার না করে বছরের পর বছর কাউকে জেলে ফেলে রাখা ঠিক হবে না। ৭১ সালে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিঘরেই যুদ্ধ নিয়ে মতানৈক্য ছিল। সে মতানৈক্যের পটভূমি বুঝতে হবে। লঘু অপরাধে গুরু দণ্ড দিয়ে একটি বিরাট জনগোষ্ঠীকে স্বাধীনতা বিরোধীদের শিবিরে ঠেলে দেয়া যাবে না। সুতরাং সবাইকে শাস্তি দেয়া নয়। নেতাদের পৃথক করে শাস্তি দেয়া হোক। সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হোক। আমার এ লেখা কোনো মহলকেই খুশি করতে পারল না। একটি মহল ক্ষুব্ধ হলো। কেউ বিস্মিত হলো। কেউ তীব্র প্রতিবাদ জানাল। তাদের বক্তব্য হচ্ছে–আমি রাজাকারদের ক্ষমা করার কথা বলে অন্যায় করেছি। দৈনিক বাংলার বাণীতে আমার বিরুদ্ধে উপসম্পাদকীয় লেখা হলো। লেখা হলো–সরকারি পত্রিকায় চাকরি করে এই ঔদ্ধত্য দেখাবার সাহস কোথা থেকে আসে? আজও আমার সেই লেখা উল্লেখ করে একটি মহল থেকে বলা হয়–আমি নাকি রাজাকারদের ক্ষমা করার কথা বলেছিলাম। আমার ধারণা, আমার এ সমালোচক বন্ধুরা কখনো পুরোপুরি আমার লেখাটি পড়ে দেখেনি। বুঝতে চেষ্টা করেনি–আমার লেখার তাৎপর্য ও পটভূমি। আমি আজো মনে করি–আমি সেদিন সাহস সরে সঠিক কথা লিখেছিলাম। সেদিন আমার কথা মেনে নিয়ে ক্ষমা করা হলে তাদের অনুশোচনা থাকত। কিন্তু ১৯৭৪ সালে ক্ষমা পেয়ে তারা ভাবল, স্বাভাবিক নিয়মেই তারা ক্ষমা পেয়েছে। তারা ক্ষমা পেয়েছে–সিমলা স্বাক্ষরিত ভারত-পাকিস্তান চুক্তির শর্তানুসারে। এতে বাংলাদেশ সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই। সেকালের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ক্ষমা ঘোষণা করলেও সকলেই জানত যে এই ক্ষমা ঘোষণার পেছনের দু’জন ব্যক্তি হচ্ছেন–ভারতের শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী এবং পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টো। অর্থাৎ আমাদের নামেই ক্ষমা ঘোষণা করা হলো, কিন্তু সেই ক্ষমা ঘোষণা আমাদের জাতীয় জীবনে কোনো সুফল বয়ে আনল না। আমার আজকের সমালোচক বন্ধুরা একটু সমস্যার গভীরে গেলে আমার সমালোচনায় নামতেন না।
