এ নিয়ে আমার নতুন কিছু বলার অবকাশ ছিল না। এ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল এবং প্রথমবারের জন্যে ভালো লেগেছিল। পূর্ব জার্মানিতে যে কোনো আলোচনা প্রথমবারের জন্যেই একটি প্রশ্নে তাদের সাথে একমত হতে পেরেছিলাম।
তবে অন্যান্য কোনো ব্যাপারেই তাদের বক্তব্যের মিল হচ্ছিল না। তাই আমার সফর সংক্ষিপ্ত হয়ে গেল। হঠাৎ একদিন জানানো হলো আমার হাঙ্গেরি যাবার টিকেট হয়ে গেছে। আমাকে দু’দিন পরেই বার্লিন ছেড়ে বুদাপেস্ট যেতে হবে। তবে এর একটি পটভূমি আছে।
আমি আগেই বলেছি পূর্ব জার্মানি তখনও জাতিসংঘের সদস্য হতে পারেনি। তাই তাদের একটি ইচ্ছে হচ্ছে জাতিসংঘের সদস্য একটি রাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর। বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য এবং সে সাথে নতুন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাই পূর্ব জার্মানির সাংবাদিক ইউনিয়নের একটি সিদ্ধান্ত এবং ইচ্ছা ছিল আমাদের সাংবাদিক ইউনিয়নের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করা এবং সে জন্য লিন্ডের পরিবর্তে বারবারা পাফকে আমাদের দোভাষী নিযুক্ত করা হয়েছিল। পূর্ব জার্মানির সাংবাদিক ইউনিয়নের এ প্রস্তাব প্রথমেই আমাকে দিয়েছিল। বারবারাও বলেছিল, তোমরা এ চুক্তি স্বাক্ষর করলে আমার সুনাম হবে। আমি বলেছিলাম, বাংলাদেশে তখন জাতীয় সাংবাদিক ইউনিয়ন গঠিত হয়নি। আমি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। আমার পক্ষে কোনো ভিন্ন দেশের ইউনিয়নের সাথে চুক্তি করা সম্ভব নয়। এ ধরনের চুক্তি করতে হলে আমাকে বাংলাদেশে ফিরে যেতে হবে। ঢাকার সাংবাদিক ইউনিয়নের সাথে কথা বলতে হবে। সরকারের সাথেও কথা বলতে হবে। মনে হলো আমার এ কথায় জার্মানের বন্ধুরা খুশি হয়নি। জার্মান প্রবাসী বাঙালিরাও আমার যুক্তি ভালোভাবে গ্রহণ করল না। আমার সফরসঙ্গী দুই বন্ধুও আমার বক্তব্য সহজভাবে নিলেন না। তবু আজও আমি মনে করি, সেদিন আমার বক্তব্য সঠিক ছিল। আমার ধারণা আমি চুক্তি স্বাক্ষর করতে রাজি না হওয়ায় আমার সফরসূচি সংক্ষিপ্ত করা হয়। আমাকে হাঙ্গেরি পাঠিয়ে দেয়া হয় এবং হাঙ্গেরিতে এই নাটকের শেষ দৃশ্যের অবতারণা করা হয়। তবে এর পরেও আর একটি ব্যাপারে নিয়ে দুঃখজনক বিতর্ক হয়েছে বার্লিনে। অর্থাৎ সেবারের সফরে আমি কাউকে খুশি করতে পারিনি।
বার্লিনে আমার সর্বশেষ বিতর্ক হলো নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে। আমি জার্মান সাংবাদিক বন্ধুদের জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমরা কি নেতাজী সুভাষ বসুকে চেন? প্রথমে কেউ তাকে চিনতেই পারলো না। আমি বললাম, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় যে ভারতীয় নেতা এখানে এসেছিলেন। তাকে কি কেউই তোমরা চেন না। তিনি জার্মান থেকে জাপান গিয়েছিলেন এবং ভারতের স্বাধীনতার জন্যে আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেছিলেন। এবার তাদের মধ্যে একজন চিৎকার করে উঠল। বলল সেই ফ্যাসিস্ট, যে যুদ্ধের সময় ভারত থেকে জার্মানিতে এসেছিল?
তার কথায় আমি খানিকটা উষ্ণ হলাম। বললাম, তোমরা শেখ মুজিবুর রহমানকে চেন। এবার তারা সবাই মিলে চিৎকার করে উঠল। বলল, শেখ মুজিবুর রহমান তোমাদের মহান নেতা। তাকে চিনব না এটা কি হতে পারে। আমি বললাম, তোমরা কি জান যে শেখ মুজিবুর রহমান নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নেতা বলে মানতেন। আমার কথা শুনে তারা অবাক বিস্ময়ে আমার দিকে তাকাল। এক সময় মলিন হয়ে চুপ হয়ে গেল। আমি বললাম কিছু মনে করবেন না। ভিন দেশের কোনো নেতা সম্পর্কে কিছু বলতে হলে ভেবেচিন্তে বলা উচিত। তোমরাই একমাত্র সঠিক, এ ধরনের চিন্তাধারা ইতিহাস সম্মত নয়। তোমরা বুঝতে চাও না যে তোমাদের এ ধরনের মন্তব্য অন্যকে আঘাত করতে পারে।
এই ঘটনার পরের দিন আমাকে পূর্ব জার্মান ছাড়তে হয়। তবে তাদের আত্মীয়তা বন্ধুত্ব আদৌ ভুলবার নয়। আমরা বাংলাদেশের প্রথম সাংবাদিক প্রতিনিধি দল। আমাদের আগে অনেকে পূর্ব জার্মানিতে গিয়েছে। কেউ সফরে গিয়েছে, কেউ চিকিৎসার জন্যে গিয়েছে, কেউ পড়াশুনো করতে গিয়েছে। আমাদের মতো খুঁটে খুঁটে জিজ্ঞেস করতে কেউ হয়তো যায়নি। আমরা এমন দেশে গেলাম, অদ্ভুত আথিথেয়তা পেলাম, মর্যাদা পেলাম। কিন্তু তাদের প্রস্তাবিত চুক্তি স্বাক্ষর না করে চলে এলাম। আমরা চুক্তি স্বাক্ষর না করায় বিপর্যস্ত হলো বারবারা পাফ। সে বলল, তোমার জন্য এ চুক্তি সম্ভব হলো না।
তাই বিমানবন্দরে তোমাদের বিদায় দিতে আমাকে যেতে দেয়া হলো না। তবে। এত বিতর্ক সত্ত্বেও দুটি সমস্যা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। সে আলোচনা ছিল অর্থবহ ১, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের যুদ্ধ অপরাধীদের বিচার এবং ২. পূর্ব জার্মানসহ অন্যান্য পূর্ব ইউরোপের কথিত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রসমূহের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে।
আমি পূর্বেই বলেছি সেকালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের রাজনীতির সাথে আমার মৌলিক তফাৎ ছিল। পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে তারা নয়া গণতান্ত্রিক বা জনগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বলে অভিহিত করতো। আমার বক্তব্য ছিল মার্কস ও লেনিনের পরিভাষায় দু’টি গণতন্ত্রের কথাই আমরা জানি। তা হচ্ছে–বুর্জোয়া গণতন্ত্র ও সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র। এর মাঝখানে কোনো গণতন্ত্র আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। সেকালে পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলোতে বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে গঠিত সরকার ক্ষমতায় ছিল। আমরা বক্তব্য ছিল ওই সমন্বয়ের সরকার টিকবে না। এ নিয়ে বারবার আমার বিতর্ক হয়েছে জার্মান সফরকালে।
