বার্লিন দেয়ালের কাছে গিয়ে এমন কথাই শুনলাম। আমার পাশে দোভাষী বারবারা। আমাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন সামরিক বাহিনীর একজন ক্যাপ্টেন। দেয়ালের কাছে উঁচু একটি টাওয়ার আছে। ওই টাওয়ারে একটি রেস্টুরেন্ট আছে। লিফটে ওই রেস্টুরেন্টে পৌঁছাতে ৩৬ সেকেন্ড লাগে। রেস্টুরেন্টটি ঘুরছে। চা খেতে খেতে কখনো রেস্টুরেন্ট থেকে পূর্ব বার্লিন এবং পশ্চিম বার্লিন দেখছি। এক সময় নিচে নেমে এলাম। ক্যাপ্টেনকে বললাম, তোমাদের এই রেস্টুরেন্ট কিন্তু তোমাদের একদিন সর্বনাশ করবে। আর তোমাদের দেয়াল দিয়ে সমাজতন্ত্র রক্ষার তত্ত্ব আমি বিশ্বাস করি না। মনে হলো ক্যাপ্টেন একটু উষ্ণ হলেন।
আমি বললাম, জার্মান ভাগ হলেও তোমরা কিন্তু একই জাতি। তোমাদের ধর্ম, ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য সবই এক। তোমাদের মানুষ যখন ওই টাওয়ারে উঠে পশ্চিম বার্লিনের কাছাকাছি যাবে তখন সে কিন্তু আবেগমথিত হবে। ওপারের আত্মীয়-স্বজনের কথা মনে হবে। এই আবেগ কিন্তু দেয়াল দিয়ে ঠেকাতে পারবে না।
এরপর কথা আছে তোমাদের দেয়াল তত্ত্ব নিয়ে। তুমি বলছো গত কয়েক দশকে তোমাদের লাখ লাখ তরুণ ডাক্তার ও প্রকৌশলী নাকি দেয়াল টপকে পালিয়ে গেছে। তোমরা বলছ এটা নাকি সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র। তোমাদের কথা সত্য হলে এর একটি উল্টো দিকও আছে। উল্টো দিক থেকে বলা যায় যে তোমরা দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও এই তরুণদের অনুপ্রাণিত করতে পারনি। সাম্রাজ্যবাদীদের ষড়যন্ত্রই সফল হচ্ছে। এছাড়া তুমি বলছো বারবনিতাদের লোভে নাকি তোমাদের তরুণেরা ওপারে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এই যুক্তি খুব ধোপে টেকেনি। এক রাত ঘুমাবার জন্যে তোমাদের দেশে মেয়ে পাওয়া কি খুবই দুর্লভ? আমার পাশের দোভাষীকেই জিজ্ঞেস করো না কেন। সে-ই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে। এবার মনে হলো ক্যাপ্টেন সাহেব রেগে গেলেন। তিনি বললেন, তুমি আমাদের নেতাদের সাথে কথা বলতে পার। আমার কাছে এর বেশি জবাব নেই। এবার আমার আলোচনায় ক্ষুব্ধ হলো বারবারা। তার অভিযোগ হচ্ছে সে অনেক প্রতিনিধি দলের দোভাষী ছিল। কিন্তু আমার মতো; নাকি উল্টা-পাল্টা প্রশ্ন করতে শোনেনি। এ পর্ব এখানেই শেষ হলো।
সন্ধ্যার দিকে পূর্ব জার্মানের সাংবাদিক ইউনিয়ন ও সরকারি নেতাদের। সাথে বৈঠক শুরু হলো। বুঝতে পারলাম আমার সকল মন্তব্যই তাদের কানে পৌঁছেছে। এক সময় কথায় কথায় আমি আমার কথা বলতে শুরু করলাম। আমি বললাম, আমার রাজনীতির সাথে তোমাদের রাজনীতির মৌলিক তফাৎ আছে। তবুও সমাজতান্ত্রিক দেশ সম্পর্কে আমাদের একটা স্বপ্ন আছে। দীর্ঘদিন সে স্বপ্ন আমরা লালন করেছি। সমাজতান্ত্রিক দেশ সম্পর্কে আমাদের অনেক প্রশ্ন আছে। কারণ এদেশগুলো সম্পর্কে পশ্চিমাদের প্রচার আমাদের কাছে অপপ্রচার বলে মনে হয়। তাই এদেশগুলো সফরে এলে আমরা তোমাদের নাজেহাল করার জন্যে এ ধরনের প্রশ্ন করি। আমরা ভাবি, তোমারা আমাদের প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করছ। তোমাদের পছন্দের জায়গাগুলো আমাদের দেখিয়ে এবং ভালো ভালো কথা বলে আমাদের বিদায় দিতে চাও। এ ব্যাপারে আমি একটি সুস্পষ্ট ঘটনার উল্লেখ করতে চাই।
এর আগে আমি কোনোদিন কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশে যাইনি। প্রথমে এলাম তোমাদের বার্লিন শহরে। বড্ড ভালো লাগল। বড় ছিমছাম, পরিষ্কার। কোথাও বিশৃঙ্খলার চিহ্ন মাত্র নেই। এক রাত থেকে পরের দিন গেলাম লাইপজিগ শহরে। পড়ন্ত রোদের বিকেলে লাইপজিগের রাজপথে অসংখ্য তরুণ-তরুণী দেখলাম। তারা নাচছে-গাইছে। জড়াজড়ি করে হাঁটছে। হিপ্লিদের মতো তালি দেয়া জামা-কাপড় তাদের অঙ্গে। তারা দেদার চুমু খাচ্ছে। আমি খানিকটা বিপর্যস্ত হলাম। দোভাষী লিন্ডেকে বললাম এটা কি তোমাদের সমাজতন্ত্র? এটা তোমাদের সংস্কৃতি? তাহলে পশ্চিম জার্মানির সাথে তোমাদের তফাটা কী? তোমাদের এ সমাজতন্ত্র থাকবে না। বিকল্প সংস্কৃতি সৃষ্টি করতে না পারলে দেয়াল দিয়ে সমাজতন্ত্র বাঁচাতে পারবে না। লিন্ডে বিষণ্ণ হলো। বৃদ্ধ লিন্ডের মুখে তখন মলিন হাসি। সে বলল, আমি তোমার সাথে একমত। কিন্তু করার কিছু নেই। নেতাদের আমি আরো বললাম, আমি ক’দিন ধরে তোমাদের সাথে আলোচনা করে এ কথাগুলো বলেছি। তোমরা তেমন পাত্তা দাওনি।
এবারও তেমনই ঘটল। সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং পূর্ব জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির নেতারা তেমন কথা বললেন না। প্রকৃতপক্ষে আমার সাথে কথা আর তেমন জমল না। অন্যান্য কথা বলেই আলোচনা শেষ হলো।
তবে ভিন্ন চিত্র দেখেছিলাম ১৯৭৪ সালে। ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে ওই লাইপজিগ মেলায় গিয়েছিলাম। তখন আমি বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। আমার সাথে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কামাল লোহানী।
একদিন হঠাৎ করে আমন্ত্রণ এল সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতাদের পক্ষ থেকে। আমাদের সাথে আলোচনা করতে চায়। সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নিজেই প্রশ্ন তুললেন। তিনি বললেন, তুমি গতবার বিকল্প সংস্কৃতির কথা বলেছিলে। প্রকৃতপক্ষে আমরা বিপদে আছি তরুণদের নিয়ে। এখন সুইচ টিপলেই পশ্চিম জার্মানির টেলিভিশন দেখা যায়। এদের প্রভাব পড়ছে ব্যাপকভাবে আমাদের তরুণদের ওপর। সমস্যাটি ভাবিয়ে তুলেছে সকলকে।
