আমার দোভাষী বা সমবায়ের সেই প্রখ্যাত মহিলা আমার কথার জবাব দিতে পারলেন না। অথবা আমি তাদের বোঝাতেই পারলাম না আমার কথা। তাঁরা আমাকে দৈনিক নয়া জার্মানি পত্রিকায় যাবার অনুরোধ জানালেন। বললেন, ওই পত্রিকার কৃষি বিভাগ আমাকে তথ্য দিতে পারে। পরবর্তীকালে ওই পত্রিকায় গিয়েছিলাম। শেষ পর্যন্ত আমাকে কৃষি মন্ত্রণালয়ে যেতে হয়নি। সে অনেক কথা এবং অনেক পরের কথা।
তবে এ প্রশ্নের জবাব পেয়েছিলাম হাঙ্গেরিতে। হাঙ্গেরির কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে আলোচনাকালে একই প্রশ্ন তুলেছিলাম। প্রশ্নটি শুনে তারা যেন চমকে গেলেন। বললেন, এ জমি নিয়ে আমরা বিপাকে পড়েছিলাম। কৃষক জমি দিতে চায়নি। এর ফলে ১৯৫৬ সালে আমাদের দেশে বিপ্লব হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম–সকলের সকল জমি প্রথমেই নিয়ে নেয়া হবে না। যে সকল পরিবারের পুরান যুগের মানুষ আছে, যাদের সাথে জমির এক ধরনের আত্মীয়তা আছে–সে সকল পরিবারের কিছু জমি রেখে দেয়া হবে ব্যক্তি মালিকানায়। ওই বৃদ্ধদের মৃত্যু হলে সে জমি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হবে।
সমবায় খামারে সন্তোষজনক জবাব মিলছে না। সকালে সংবাদ সম্মেলনের তেমন জবাব পেলাম না। সারাক্ষণ আর একদফা বিতর্ক করেছি একটি সংবাদ সংস্থার সাথে। এই সংস্থাটি পূর্ব জার্মান সংস্থাকে বিভিন্ন তথ্য প্রচার করে। সংস্থার নাম প্যানরোমা। সংবাদ সম্মেলনের পর সেখানে গিয়েছিল সকল দেশের প্রতিনিধি। প্যানরোমার পথ থেকে জানতে চাওয়া এক পূর্ব জার্মান সম্পর্কে আপনার ধারণা কী। সকল দেশের প্রতিনিধি গড়গড় করে জবাব দিচ্ছিল। আমি বললাম, মাত্র দু’দিন হলো পূর্ব জার্মানিতে। তেমন কিছু দেখিনি, শুনিনি। আলোচনা হয়নি কারো সাথে। কী করে তোমাদের প্রশ্নের জবাব দেব? এ মুহূর্তে এ ব্যাপারে আমার কোনো জবাব নেই। প্যানরোমার প্রধান এলেন। বললেন, তুমি কী বলতে চাও? আমি বললাম যা জানি না সে সম্পর্কে কী করে বলব? তুমি আমাকে তোমাদের প্রচারপত্রগুলো দাও। আমি পড়ব। তোমাদের লোকদের সাথে আলোচনা করব। সম্ভব হলে আমার মতামত লিখে পাঠাব তোমার কাছে। আজ কোনো কিছু বলা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এই তিন দফা মতান্তরের পরে চতুর্থ দফা মতান্তর হলো সন্ধ্যায়। সন্ধ্যায় এক হোটেলে এক পার্টি। আমাকে বলা হয় তোমার দোভাষী লিন্ডে আর থাকছে না। পরিবর্তে আসবে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী বারবারা পাফ। বারবারা এক সময় ক্যাস্ট্রো এবং এনজেলা ডেভিসের দোভাষী ছিল। তোমার সাথে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। তাই তোমার দোভাষী পরিবর্তন করা হলো।
আমি বললাম, তা হবে না। সাংবাদিক লিন্ডে আমার সাথে থাকবেই। অনেক বলার পর ঠিক হলো আমার জন্যে দুজন দোভাষী থাকবে। ইতিমধ্যে আর এক ভভদ্রলোক এলেন। বললেন, সংবাদ সম্মেলনে তুমি আমাদের বিপদে ফেলেছ। তোমার সাথে কথা বলবেন ভভদ্রলোক, তিনি পূর্ব জার্মান সরকারের তথ্য দফতরের প্রধান। পরে সাথে এলেন অর্থ দফতরের আর এক ভভদ্রলোক।
এবার দোভাষী লিন্ডে নয়, বারবারা। আলোচনা নয়, বিতর্ক। এবার বিতর্ক লেনিন নিয়ে। প্রায় তিন ঘণ্টা দেখলাম দোভাষী বারবারা শ্রান্ত। আমি জার্মান বন্ধুদের বললাম, দেখো লেনিন সম্পর্কে তোমাদের সাথে আমি একমত নই। লেনিন মৃত। তাই তোমাদের সাথে বিতর্কের শেষ হবে না। এসো, আমরা একমত হই যে লেনিন সম্পর্কে আমাদের ঐকমত্য নেই। এর বেশি কিছু নয়। আলোচনা শেষ হলো। হোটেলে ফিরতে ফিরতে দোভাষী বারবারা বলল, তুমি আচ্ছা তোক দেখছি। তুমি কি ভেবেছ ওদের তুমি বোঝাতে পারবে? ওরা কোনোদিন তোমার সাথে একমত হবে না।
পরবর্তীকালে আমার প্রধান দোভাষী বারবারা পাফ। দীর্ঘ সময় কারো সাথে বিতর্ক হলে বারবারা হাসত। সে বলত, এই আলোচনায় কোনো লাভ নেই। তুমি তাদের বুঝতে পারবে না। শুধু শুধু পণ্ডশ্রম করছে। পরে জেনেছিলাম বারবারা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য নয়। কমিউনিস্ট পার্টিকে সমর্থনও করে না। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি পশ্চিম জার্মানি চলে যাচ্ছ না কেন? তোমার মতো দোভাষী সে দেশে হাজার হাজার ডলার কামাতে পারবে। বারবারা বলত পশ্চিম জার্মানিতে গেলে আমি হাজার হাজার ডলার পাব। কিন্তু আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের কী হবে। আমি কৃষক পরিবারের মেয়ে। বাবা-মা বৃদ্ধকালীন ভাতা পাচ্ছেন। আমার ভাই বোন বিনে পয়সায় লেখাপড়া করছে। পরীক্ষায় পাস করলে ওরা চাকরি পাবে। আমি বিয়ে করলে বার্লিন শহরে ফ্ল্যাট পাব। সন্তান হলে এককালীন সাহায্য পাব সন্তান বড় করার জন্যে। এ সুযোগ তো পশ্চিম জার্মানিতে পাওয়া যাবে না। তাই দেশ ছেড়ে যাবার প্রশ্নই ওঠে না।
এই দেশ ছেড়ে যাবার প্রশ্ন তুঙ্গে উঠল একদিন বার্লিন দেয়ালের কাছে গিয়ে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর জার্মানি ভাগ হয়ে যায়। পূর্ব জার্মানি এবং পশ্চিম জার্মানির সৃষ্টি হয়। পশ্চিম জার্মানি তত্ত্বাবধান করত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স এবং ব্রিটেন। পূর্ব জার্মানির কর্তৃত্ব ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের হাতে। পঞ্চাশের দশকে ক্রুশ্চেভের আমলে পূর্ব পশ্চিম সংঘর্ষ চরমে ওঠে। তখন বার্লিন শহরের মাঝখানে দেয়াল দেয়া হয়। এই দেয়ালই ঐতিহাসিক বার্লিনের প্রাচীর নামে খ্যাত। এই দেয়াল ভেঙে ফেলা হয় নব্বই-এর দশকে। যখন একর পর এক সমাজতান্ত্রিক শিবিরের রাষ্ট্রগুলোর পতন হতে থাকে। এই দেয়াল সম্পর্কে পূর্ব জার্মানির ব্যাখ্যা হচ্ছে–দেয়াল না থাকলে পশ্চিমা শক্তিবর্গ দিনের পর দিন নাশকতামূলক কাজ চালাবে। পাশ্চাত্যের পচা গলা সংস্কৃতি দিয়ে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যাবে আমাদের তরুণ-তরুণীদের।
