পূর্ব বার্লিন পৌঁছুবার পরের দিন লাইপজিগ পৌঁছেছিলাম। পরের দিন আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলন। লাইপজিগে একটি ভালো হোটেলেই আছি। বিকেলে দোষাভী লিন্ডে আমার কক্ষে এলেন। বললেন, তুমি কী প্রশ্ন করতে চাও তা লিখে দাও। আমি তার প্রস্তাবে রাজি হলাম না। পরের দিন সাংবাদিক সম্মেলনে দেখলাম রামুদা প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রথমেই হাত তুলেছেন। রামুদা আমাকে বললেন, এবার আপনি প্রশ্ন করুন। আমার প্রশ্ন ছিল, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনের সাহায্য নিয়ে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম তোমরা দাবি করছ তোমরা সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামো গঠন করেছ। আমাদের সরকারও সমাজতন্ত্রের কথা বলছে। তোমরা আমাদের সাহায্য করবার জন্যে বাংলাদেশে গিয়েছিলে। বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রশ্নে তোমাদের কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি? তোমরা কিছু ভেবেছ কি? তোমাদের অভিজ্ঞতা আমাদের দেশে আদৌ প্রযোজ্য কি? আমার প্রশ্নের তেমন কোনো সদুত্তর পেলাম না। বলা হলো, তোমার সাথে পরে আলোচনা করা হবে। আমার পরে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা প্রশ্ন করল। ঘন্টাখানেক পরে সংবাদ সম্মেলন শেষ হলো। মনটা খুবই ভালো ছিল না। সংবাদ সম্মেলন শেষ হলেই ভারতের প্রতিনিধিরা আমাকে ঘিরে ধরলেন। বললেন, দাদা জবাব কিছু পেলেন? এদেশে সব কিছুর জবাব পাওয়া যায় না। তাই বুঝেশুনে প্রশ্ন করতে হয়। যতদূর মনে হয় ভারতীয় প্রতিনিধিরা প্রশ্ন করেছিলেন মূলত প্রিন্টিং প্রেস সম্পর্কে। পরে চা খাবার পালা।
পাশের কক্ষে চাসহ অন্যান্য খাবার দেয়া হচ্ছিল। দেখলাম কতিপয় তরুণ বিভিন্ন প্রতিনিধিদের কাছে সংবাদ সম্মেলন সম্পর্কে মতামত জিজ্ঞেস করছে। খাতায় টুকে নিচ্ছে। আমার পাশে দাঁড়ানো ভারতীয় প্রতিনিধি দল। শুনলাম ভারতীয় দলনেতা সংবাদ সম্মেলনের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছেন। আমি অবাক হলাম। কারণে এই ভভদ্রলোক এইমাত্র কিছুক্ষণ আগে আমার সাথে ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন।
এবার আমার পালা। তরুণরা আমার কাছে এল। আমি বললাম, এখনো সংবাদ সম্মেলন সম্পর্কে আমি ভেবে উঠতে পারিনি। আর তোমরাও বা এ ধরনের প্রশ্ন করছ কেন? কী জানতে চাচ্ছ আমাদের কাছে? তোমরা তো দেখছি পুঁজিবাদী দেশের সরকারের মতোই আচরণ করছ। পুঁজিবাদী দেশে জরিপের শেষ নেই। ওই সকল দেশে কথায় কথায় জরিপ হয়। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজস্ব শ্রেণি স্বার্থে ওই জরিপ দিয়ে জনমনে সংশয় ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হয়। আমি বুঝছি না তোমরাও কী চাও। সংবাদ সম্মেলন শেষ হবার পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তোমরা কী জানতে চাও? আমাদের এই প্রতিক্রিয়া তোমাদের কোনো কাজে আসবে কি? আর এভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে আমি অভ্যস্ত নই।
তরুণরা চুপ হয়ে গেল। দেখলাম দূর থেকে এক ভভদ্রলোক আমাদের লক্ষ্য করছেন। এবার তিনি কাছাকাছি এলেন। বললেন, তিনি পূর্ব জার্মান সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের লোক। নাম কার্ল মার্ক। তিনি বললেন, তুমি কী জানতে চাচ্ছ। আমি বললাম, দেখো প্রথমে তোমাদের এ প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে আমার আপত্তি আছে। এ ধরনটি একেবারেই পুঁজিবাদী দেশের মতো। চা খেতে খেতে প্রশ্ন করে জবাব নিয়ে কোনো কাজ হয় তা আমি অন্তত বিশ্বাস করি না। এগুলো হচ্ছে লোক দেখানো ভড়ং। দ্বিতীয়ত সংবাদ সম্মেলনে তোমাদের উত্থাপিত বক্তব্য নিয়েই আমার আপত্তি আছে। তোমাদের বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে–তোমরা একটা স্বয়ংসম্পূর্ণ অর্থনীতির দেশ। এ বক্তব্য কিন্তু সঠিক নয়। তোমরা কমিউনিস্ট সাধারণ বাজার কমিশনের সদস্য। আদৌ স্বনির্ভর নয়। তোমাদের চারদিকে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। তাই তোমাদের পরিস্থিতি একটু ভিন্ন ধরনের। কার্ল মার্ক আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। বললেন, পরে তোমার সাথে আলাপ হবে, এখন নয়। চা খেয়ে আমি হোটেলে ফিরে গেলাম। শুনলাম বিকেলে একটি সমবায় দেখতে যেতে হবে। এই সমবায়ের নেত্রী নাকি লেনিন পুরস্কার পেয়েছেন। তার সাথে আমাকে আলাপ করতে হবে। দুপুরের খাবার পর কিছুটা বিশ্রাম। দোভাষী লিন্ডে এল গাড়ি নিয়ে। লাইপজিগ শহর থেকে সেই সময় খুব দূরে নয়। সেই সমবায়ের দিকে যতো এগুচ্ছিলাম, চারদিক তাকাতে তাকাতে ততোধিক মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিলাম। চারদিকে মাঠ আর মাঠ। জমিতে আল নেই। সবুজের ছড়াছড়ি। মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে সারি সারি আপেলের গাছ। আকাশের সূর্য পশ্চিমে হেলেছে। শীতের গরম। আদৌ উত্তাপ নেই। সেই সময়ে গিয়ে আবার একই বিতর্কে জড়িয়ে গেলাম। আমি বললাম, তোমরা সমবায় খামার করবে, যৌথ খামার করবে, কৃষকেরা মাঠে খাটবে, প্রচুর ফসল ফলাবে। এমনকি শিল্প শ্রমিকের চেয়ে মজুরিও বেশি পাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের অভিজ্ঞতায় বলে শিল্প শ্রমিকদের সাথে কৃষি শ্রমিকের একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। কৃষক জমি বড় ভালোবাসে। ভালোবাসে জমির ফসল। জমিতে ধানের চারা বাড়তে থাকলে সেই চারার গায়ে সে সোহাগে হাত বুলায়। আমাদের দেশের কৃষক স্ত্রীর চেয়ে গরুকে বেশ ভালোবাসে। ওদের মাটির জন্য দরদ। কৃষককে এই দরদমুক্ত করা কঠিন ব্যাপার। এ কাজটি তোমরা কী করে করবে। তোমাদের দেশে ব্যক্তি মালিকানা নেই। কোনো কৃষকই জমির মালিক নয়। তত্ত্ব হিসেবে এ কথা বলা সহজ। কিন্তু কার্যকর করা বড় কঠিন। তোমরা এ কাজটি কী করে করলে?
