আমি মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, শ্রেণিসগ্রাম এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে বিশ্বাস করি এবং সেই রাজনীতিই করি। কিন্তু রাজনীতির হাতেখড়ি থেকে অনেক প্রশ্নে কমিউনিস্ট পার্টির সাথে আমি একমত নই। আমি মনে করি লেনিনের মৃত্যুর পর স্ট্যালিন ভুল পথে চলেছে। আমাদের দলের ব্যাখ্যা হচ্ছে স্ট্যালিনের জন্যেই বিশ্বে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। আমাদের দলের ব্যাখ্যা হচ্ছে পূর্ব ইউরোপের পূর্ব জার্মানি, পোল্যান্ড, চেকোশ্লোভাকিয়া, আলবেনিয়া, বুলগেরিয়া বা হাঙ্গেরি কোনো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবই হয়নি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষে সোভিয়েত বাহিনী এই সকল দেশের কমিউনিস্ট পার্টিকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন দলের সমন্বয়ে জগাখিচুরির এই সরকারগুলোকে বলা হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক সরকার। আমার দলের বক্তব্য হচ্ছে-পূর্ব ইউরোপের এই সকল দেশে প্রতি বিপ্লব অনিবার্য। আমার সঙ্কট হচ্ছে এই ধারণা এই বিশ্বাস নিয়েই আমি বাংলাদেশের প্রথম সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের নেতা হয়ে ওই দেশ সফরে যাচ্ছি। আমার বিশ্বাস তারা আমার খবর রাখে। সেখানে কমিউনিস্টদের ভাষায় আমি ট্রটস্কিপন্থী মার্কিন দালাল। আর আমি হলাম স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধিদের নেতা।
ফলে এই সকল দেশগুলোতে প্রতি মুহূর্তে আমার সাথে বিতর্ক হবে। জানি না সেই বিতর্ক কতদূর গড়াবে। এছাড়া ভয় ছিল নিজের জ্ঞান-বুদ্ধি সম্পর্কে। আগে এ ধরনের সফরে যাইনি। আমি একটি দেশের প্রতিনিধিত্ব করব। সেখানে দলবাজি ছেড়ে দেশের কথা বলতে হবে। আবার নিজের আদর্শকেও পরিহার করা চলবে না।
পূর্ব জার্মানির রাত ১২টায় বার্লিন বিমানবন্দরে পৌঁছলাম। আমাদের ঘড়িতে তখন ভোর ৫টা। নয়াদিল্লি থেকে যাত্রা করেছিলাম আমার ঘড়িতে বেলা সাড়ে ন’টায়। বিমানবন্দরের ভেতরেই পূর্ব জার্মানির সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ গাড়ি নিয়ে এলেন। আমার পোশাক দেখে নেতৃবৃন্দ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন–তুমি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছ? সেপ্টেম্বরে সেখানে কিছু শীত পড়লেও আমার পরনে পাজামা-পাঞ্জাবি, পায়ে স্যান্ডেল। ওদের তাই চিনে নিতে অসুবিধা হয়নি যে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। যারা নিতে এসেছিলেন তাদের মধ্যে একজন পূর্ব জার্মানির বিদেশ দফতরের ভদ্রমহিলা ছিলেন। বিমানবন্দরে চা খেতে খেতে তার সাথে আলাপ হলো। খানিকটা স্বস্তি পেলাম। নিজের কাছে মনে হলো জ্ঞানের গভীরতায় পাল্লা দেয়া আদৌ কোনো অসুবিধা হবে না। মনে হলো সাম্প্রতিক অনেক ঘটনা ওদের জানা নেই, বিশেষ করে পশ্চিম জগতের।
আমাদের একটি সুন্দর বাড়িতে থাকতে দেয়া হলো। আদৌ কোনো হোটেল নয়, কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় আসার আগে এক ধনবান ব্যক্তির বাড়ি ছিল। এ বাড়িতে সাধারণত বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের থাকতে দেয়া হয়। আমাদের বার্লিনের অবস্থান ছিল স্বল্পকালীন। তাই হোটেলে নেয়া হয়নি। পরদিন আমাদের যেতে হবে লাইপজিগ। সেখানে প্রথম অনুষ্ঠান আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সম্মেলন। আমাদের দোভাষী গানথার লিন্ডে। ষাট বছরের বৃদ্ধ। সাংবাদিক। রান্নার উপর বই লেখেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের বন্দিশিবিরে ছিলেন। পালিয়ে গিয়ে লন্ডনের বিবিসিতে কাজ করেছেন। পটাসডাম কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। লিন্ডে শিশুর মতো সরল। স্ত্রী ও একমাত্র পুত্র নিয়ে তার সংসার। লিন্ডে প্রকাশ্যে তাঁর সরকারের সমালোচনা করেন। গভীর রাতে লিন্ডে ফিরে গেলেন। ভোরবেলা এক বাঙালির কণ্ঠস্বরে চমকিত হলাম। বাঙালি রামদা নামে পরিচিত। নাম সুনীল দাশগুপ্ত। এককালের বাড়ি বরিশালের গৌরনদী থানার গৈলা। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। ভারত থেকে গিয়েছিলেন পশ্চিম জার্মানি, সেখান থেকে পূর্ব জার্মানি। বিয়ে করেছেন জার্মানির এক মহিলাকে। নাম বারবারা দাশগুপ্ত। থাকেন কোপেনেকে। বার্লিনের বাঙালি সমাজে রামুদা বিশেষ পরিচিত। সকলের সুখে-দুঃখে আছেন। পূর্ব জার্মানিতে গেলে সকলেরই তাদের বাড়ি যেতে হয়। সেই রামুদা ভোরবেলা আমাদের কাছে এলেন। আঁটি বরিশালের ভাষায় বললেন, কোনো ভয় নেই। আমিও লাইপজিগে যাব। সংবাদ সম্মেলনে আপনাদের সাথে আমি যাব। সংবাদ সম্মেলনে ইচ্ছে হলেই প্রশ্ন করা যায় না। আমি সব ব্যবস্থা করব। আর এই সংবাদ সম্মেলন থেকে আমার সাথে বিতর্কের শুরু। মনে হলো আমি একাই স্বতন্ত্র। আর কেউ যেন এমন প্রশ্ন করছে না। সবাই এসেছে যেন খেয়েদেয়ে ঘুরে ফিরে চলে যাবার জন্যে।
জীবনের প্রথম বিদেশ সফর সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব জার্মান ও হাঙ্গেরি। এই তিন রাষ্ট্রেরই কমিউনিস্ট পার্টি সরকারে। এই কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর সাথে আমার রাজনৈতিক মতানৈক্য ছিল। তাই বিতর্ক হয়েছিল তিনটি দেশেই। ১৯৭৪ সালে আবার ওই এলাকায় গিয়েছিলাম। সেবার সফর করেছি পূর্ব জার্মান, হাঙ্গেরি ও চেকোশ্লোভাকিয়া। দ্বিতীয় বারও আমার সাথে বিতর্ক হয়েছে। তবে সে বিতর্কের ধারা ভিন্ন। এই বিতর্ক সম্পর্কে আমার লেখা একটি বই আছে। বইটির নাম ‘বার্লিন থেকে মস্কো’। সেই বইতে এ ব্যাপারে বিশদ বিবরণ আছে। তবুও সেই বইতে তকালীন বাস্তব কারণে অনেক কিছু লেখা হয়নি। আমি সে বিশদ বিবরণে যাব না। শুধু কিছু কিছু ঘটনা তুলে ধরব। পূর্ব ইউরোপের এ দেশগুলোতে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সফর শেষে ঢাকায় ফিরে আমি দীর্ঘদিন দৈনিক বাংলায় আমার সফরগুলো লিখেছিলাম। এই দেশগুলো সম্পর্কে আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতা লিখেছিলাম। লিখতে লিখতে তল্কালীন চিলির সালবের আলেন্দের কথা লিখেছিলাম। বিতর্ককালে আমি পূর্ব জার্মান, হাঙ্গেরি এবং চেকোশ্লোভাকিয়ার নেতাদের বলেছিলাম, তোমাদের দেশে প্রতি বিপ্লব হতে পারে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট বন্ধুরা আমার লেখার সমালোচনা করেছিলেন। আমাকে মার্কিন দালাল বানানোর চেষ্টা করেছিলেন। সেকালের সেই বিতর্কের কিছু কিছু অংশ নিয়েই হবে আমার এই লেখা।
