গণকণ্ঠের দু’ঘণ্টা ধর্মঘট হয়ে গেল। সরকার সব দাবিই মেনে নিলো। কিছুদিন পরে একটি অদ্ভুত প্রশ্ন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন প্রধানমন্ত্রী। শেখ সাহেব বললেন, আপনাদের দাবি তো মানলাম। কিন্তু কোনো দেশের কোনো সরকার কি এ ধরনের দাবি মানে?
গণকণ্ঠ জাসদের পত্রিকা। গণকণ্ঠ ছাপা হয় জনতা প্যাকেজিং-এ। প্রকৃতপক্ষে এ প্রেসটি ছিল দৈনিক সংগ্রামের। দেশ স্বাধীন হবার পর এই প্রেসটির মালিকানা সরকার গ্রহণ করে। প্রশাসক নিযুক্ত হন জাসদের এক নেতা। ওই নেতাই আবার গণকণ্ঠের পরিচালক। তিনি গণকণ্ঠের পরিচালক হিসেবে ওই প্রেসের পরিচালকের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন। চুক্তিতে বলা হয়েছে, গণকণ্ঠ ওই প্রেসে ছাপা হবে। সে জন্যে প্রেসকে গণকণ্ঠ কর্তৃপক্ষ মাসে পাঁচ হাজার টাকা দেবে। ঘটনাটি দু’দিক থেকেই অভিনব। প্রথম হচ্ছে, একই ব্যক্তি একটি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসক হিসেবে অপর একটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি চুক্তি করেছেন। উভয় প্রতিষ্ঠানের স্বাক্ষরদানকারী একই ব্যক্তি। দ্বিতীয় হচ্ছে একটি দৈনিক পত্রিকা ছাপার জন্যে প্রেসকে মাত্র মাসে ৫ হাজার টাকা দেয়া হবে।
তবে খবরের শেষ এখানেই নয়। শেখ সাহেব বললেন, গণকণ্ঠের জন্যে বাড়ি দেব, পানি দেব, ফোন দেব, টেলিপ্রিন্টার দেব, নিউজপ্রিন্ট দেব–এ বাবদ তারা কোনো পয়সাই পরিশোধ করবে না। পরিবর্তে তারা শুধু আমাদের সরকারের সমালোচনা করবে। আপনাদের এ দাবি পৃথিবীর কোনো দেশের সরকার মানবে কি? প্রকৃতপক্ষে সেদিন আমার কাছে এ প্রশ্নের কোনো জবাব ছিল না। এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাথে জড়িত আছি। অনেক সময়ই অনেক কাজ করেছি, যা আমার মনপুত ছিল না। আর আমার করারও কিছু ছিল না।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হয়েছি জুলাই মাসে। আগস্ট মাসে আমন্ত্রণ এল পূর্ব জার্মানি অর্থাৎ (জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিকান) জার্মান গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। সেকালের কমিউনিস্ট জার্মানির পক্ষ থেকে। পূর্ব জার্মানের লাইপজিগ শহরে প্রতি বছর শিল্পমেলা অনুষ্ঠিত হয়। সেই শিল্পমেলায় আমাদের আমন্ত্রণ। পূর্ব জার্মানি তখনও জাতিসংঘের সদস্য নয়। তাই জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের নিতে তাদের বেশি আগ্রহ। এছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তারা অকুণ্ঠ সমর্থন করেছে। সাহায্য করেছে অঢেল। সেদিক থেকে আমাদের আমন্ত্রণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
সিদ্ধান্ত হলো ইউনিয়নের তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পূর্ব জার্মানিতে যাবে। ইউনিয়নের সভাপতি আমি, যুগ্ম সম্পাদক শামসুল হক, আল নূর ও অন্যতম সদস্য মোজাম্মেল হোসেন। প্রশ্ন দেখা দিলো আমার যাওয়া নিয়ে। পাকিস্তান আমলে আমি কোনোদিন পাসপোর্ট পাইনি। এ আমলেও পাওয়া যাবে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম না। ১৯৬২ সালের কথা। আইয়ুব খানের আমল। জেল থেকে এসেছি। তখন পাসপোর্টের অন্যতম কর্মকর্তা কাজী বাহাউদ্দিন আহমেদের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে দেখে বলেছিলেন, আপনি এসেছেন কেন? আমাদের কাছে ৫ ব্যক্তির একটি নামের তালিকা আছে। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জিজ্ঞেস না করে তাদের পাসপোর্ট দেয়া বারণ। এর মধ্যে আপনি একজন। এ তালিকায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ বড় নেতাদের কারো নাম নেই। আমি বললাম, আমি নিজের পাসপোর্টের জন্যে আসিনি। এসেছি আমার কাকার পাসপোর্টের জন্যে। বাহাউদ্দিন সাহেব বললেন, এ পাসপোর্টও দেয়া হবে না। ওই দরখাস্ত আপনি বহন করছেন। মাস কয়েক পর অন্য কাউকে দিয়ে একটি দরখাস্ত পাঠিয়ে দেবেন। আপনার কাকাকে পাসপোর্ট দেয়া হবে। বাহাউদ্দিন সাহেব কথা রেখেছিলেন। আমার কাকাকে পাসপোর্ট দিয়েছিলেন তাও মাত্র দু’মাসের জন্য।
দেশ স্বাধীন হলো ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর। কিন্তু এ ধরনের কোনো ঘটনাই আমি ভুলতে পারিনি। আমি ও আলী নূর পাসপোর্টের জন্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলাম। স্বরাষ্ট্র সচিব টি আহমেদ। আমি বললাম, আমাদের দরখাস্তে একটি সই করে দিন। তিনি প্রথমে কোনো কথা বললেন না। তিনি আমার কথায় খানিকটা বিস্মিত হলেন। বললেন, দরখাস্তটা রেখে যান। পরে জানাব। আমি বললাম, তা হবে না। পাকিস্তান আমলে অনেক জ্বালিয়েছেন। এবার আমি আপনাকে কোনো সময় দিতে রাজি নই। আমাদের ব্যাপারে তদন্তের কোনো অবকাশ নেই। তখন দুপুর একটা। আমি বললাম, আপনাকে বেলা তিনটা পর্যন্ত সময় দিলাম। আলী নূর এখানে থাকবে। আমি প্রেস ক্লাবে অপেক্ষা করব। তিনটার মধ্যেই আলী নূর স্বরাষ্ট্র সচিবের সই নিয়ে এসেছিল। খুশি হয়েছিলেন বাহাউদ্দিন সাহেব। পাসপোর্টের জন্যে তার কাছে গেলাম। তিনি হাসলেন।
বললেন, আজ বড্ড ভালো লাগছে। আমার চাকরিকালেই আপনাকে আমি পাসপোর্ট দিতে পারলাম।
সেপ্টেম্বরে প্রথম সপ্তাহে পূর্ব বার্লিন যেতে হবে। ঢাকা থেকে দিল্লি। দিল্লিতে একরাত হোটেলে। পরদিন ভোরে তেহরান হয়ে মস্কো। মস্কো থেকে পূর্ব বার্লিন। জীবনের প্রথম বিদেশ যাত্রা। ইতিপূর্বে শৈশবের স্বদেশ, যৌবনের বিদেশ ভারতে গিয়েছি। গিয়েছি যৌবনের স্বদেশ ও পরবর্তীকালে বিদেশ পাকিস্তান। পাকিস্তান গিয়ে তুরখাম সীমান্তে আফগানিস্তানে পা রেখেছি। ওটাই আমার বিদেশ পদার্পণ। সে অর্থে এবারই আমার বিদেশে পদার্পণ। শুধু বিদেশ নয়, সমাজতান্ত্রিক দেশ। ঠিক হয়েছে শুধু পূর্ব জার্মানি নয়, ফেরার পথে হাঙ্গেরি ও সোভিয়েত ইউনিয়নে যাব। তাই দীর্ঘদিন ধরেই দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছিলাম।
