সেকালের পূর্ব পাকিস্তানের পঞ্চম আন্দোলন সীমান্তের বিরাট এলাকা জুড়ে শুরু করেছিল নকশালপন্থীরা। সে পটভূমিতে কেউ যদি মনে করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন নিজেদের কজায় রাখতে হবে, এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করতে হবে যেখানে সমাজ ব্যবস্থা অটুট থাকবে, সেকালের পরিস্থিতিতে এমন ধারণা উড়িয়ে দেয়া যায় না। কিন্তু ইতিহাস কারো আঙ্গুলি হেলানে চলে না। ইতিহাসের গর্ভেই নতুন শক্তির সৃষ্টি হয়। এমনি করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভারতের সাহায্যে হলেও এই স্বাধীনতা আন্দোলন বাংলাদেশের একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটায়। ৭১-এর যুদ্ধে সাধারণ মানুষ যোগ দেয়। নিজের বাঁচার তাগিদে অস্ত্র ধরে। যুদ্ধ শেষে তাদের মনে একটি প্রত্যাশার সৃষ্টি হয়। প্রত্যাশা হচ্ছে জীবনে সুদিন আসবে। পাকিস্তান আমলের মতো দুঃখ-বেদনা থাকবে না। অনাচার, অবিচার, স্বজনপ্রীতি থাকবে না। ৭১-এর যুদ্ধ তরুণদের নতুন সমাজ গঠনের আদর্শে অনুপ্রাণিত করে।
আর এখানেই দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় সেই ধূরন্দর নেতৃত্বের সাথে সাহসী ত্যাগী, তরুণদের। এ কথা স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, পুরানো কথায় কাজ হবে না। সমাজ পরিবর্তন এবং সমাজতন্ত্রের কথা বলতে হবে, নইলে এ তরুণদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। অথচ যে নেতৃত্ব এদের অনুপ্রাণিত করেছিল, এদের মৃত্যু হাতে নিয়ে জীবন যুদ্ধ ঠেলে দিয়েছিল, সে নেতৃত্ব আদৌ সমাজতন্ত্র বা সমাজ পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিল না। আমার মতে সেই পটভূমিতেই তারা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র আবিষ্কার করেছিল এবং শেখ সাহেবকে কমরেড বলে সম্বোধন করেছিল। আমি মনে করি তরুণদের বিভ্রান্ত করার জন্যে তারা এ পথ নিয়েছিল। অন্যথায় যে কথা আমি আগেই বলেছি তা হচ্ছে–এই মহলটি একেবারেই নির্বোধ ছিল। রাজনীতির ব্যাকরণে নিমতম জ্ঞান যাদের আছে তারা নিশ্চয়ই শেখ সাহেবকে কমরেড বলবে না। তরুণদের বোঝাবার চেষ্টা করবে না যে, শেখ সাহেব বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দেবেন।
তবে যে ব্যাখ্যায়ই তোক দেখা গেলো ছাত্রলীগের এই অংশটি বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের শ্লোগান দিচ্ছে। একই দিনে ছাত্রলীগের দু’টি অংশের সম্মেলন। হচ্ছে। এই পক্ষ থেকেই বলা হচ্ছে যে, শেখ সাহেব তাদের সম্মেলনে যাবেন। কিন্তু শেখ সাহেব তাঁর শ্রেণি চরিত্রে বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি পল্টন ময়দানে আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজের সম্মেলনে না গিয়ে পল্টন ময়দানে নূরে আলম সিদ্দিক, আব্দুল কুদুস মাখনের সম্মেলনে যোগ দিলেন। রব-সিরাজের সম্মেলনে নতুন ছাত্রলীগ গঠিত হলো। যার লক্ষ্য বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র। পরবর্তীকালে দল হিসেবে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ আত্মপ্রকাশ করল। বিস্ময়ে দেখলাম মেজর এমএ জলিল এই দলের সভাপতি হয়েছেন। সমাজতান্ত্রিক দল হিসেবেই গঠিত দলটি একটি বিভিন্ন শ্রেণির সমন্বয়ে দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। বিশ্বাস বা আদর্শের কোনো বালাই থাকল না এই দলের। আর এই দলের মুখপাত্র হিসেবে প্রকাশিত হলো দৈনিক গণকণ্ঠ। এই দলটি তখন চরমভাবে নির্যাতিত। আর এদের হঠকারিতার কোনো শেষ নেই। তারা প্রায় প্রতি সপ্তাহে সরকারকে আলটিমেটাম দিছে। কখনো কখনো থানা, পুলিশ ফাঁড়ি দখল করছে। প্রাণ দিচ্ছে। আহত হচ্ছে তার যেন কোনো হিসাব নেই। পুলিশ এদের তাড়াচ্ছে আর তাড়াচ্ছে। গ্রেফতারের খবরটি পত্রিকায় ছেপে দিন। পত্রিকায় ছাপা না হলে এই ছেলের আর খোঁজ পাওয়া যাবে না। অদৃশ্য হয়ে যাবে এই পৃথিবী থেকে। আমি দিনের পর দিন এই খবর ছাপাতে চেষ্টা করেছি। এদের বাঁচাতে চেষ্টা করেছি। এই ত্যাগী এবং সাহসী তরুণদের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করা যায় কিন্তু সহমর্মিতা প্রকাশ না করে পারা যায় না। আমার মনে আছে রব-সিরাজ ছাত্রলীগের সম্মেলনে আবুল হাশেম ও আমি গিয়েছিলাম। যাননি শেখ সাহেব। তাই তত্ত্বের দিক থেকে চরম বিরোধিতা থাকলেও এই তরুণদের সাথে অজান্তে একটি সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল আমার। আর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর তাদের পত্রিকা গণকণ্ঠ নিয়ে সমস্যা মোকাবেলা করতে হলো।
গণকণ্ঠ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সরকার অনমনীয়। এ ব্যাপারে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভা ডাকা হলো। সবাই চুপচাপ। শেখ সাহেবের সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে দ্বিধান্বিত। সকলেই প্রতিবাদ করছেন কিন্তু কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তাব দিলেন না। সকলের সাথে আলাপ হলো। সাংবাদিক এমএন হারুন পরামর্শ দিলেন একটি সীমিত কর্মসূচি নিতে। কর্মসূচি হচ্ছে সকল পত্রিকায় দু’ঘণ্টার ধর্মঘট। শেষ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। সরকার বিব্রত হলেন। পরের দিন তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আমাদের ডেকে পাঠালেন। তিনি বললেন, আপনাদের সব দাবি মেনে নেয়া হবে। কিন্তু তার আগে আপনাদের ধর্মঘট তুলে নিতে হবে। আমরা বললাম তা হয় না। এ প্রস্তাব পাল্টাতে হলে ইউনিয়নের বৈঠক করতে হবে। সে সময় এখন আর নেই। আমি তখনো বুঝতে পারিনি আমাদের সাথে আলাপের জন্যে যুগ্ম সচিবকে প্রতি মুহূর্তে নির্দেশ দিচ্ছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
আমরা সরকারি প্রস্তাবের সাথে একমত হলাম না। ইউনিয়নের প্রবীণ সদস্যদের মত, জরুরি ভিত্তিতে ইউনিয়নের সাধারণ সভা ডাকা হোক। তখন ইউনিয়ন তেমন বড় ছিল না। বিকেলে প্রেস ক্লাবের আমতলায় সাধারণ সভা বসল। একজন মাত্র সদস্য ইউনিয়নের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল। তাই ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি।
