অপরদিকে রাজনৈতিক দিক থেকেও আমি তখন মার খাচ্ছি। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে আমাদের অর্থাৎ শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন ছিল। দেশের সমস্ত চটকলে ছিল আমাদের একচ্ছত্র আধিপত্য। ঢাকা শহরের হোটেল কর্মচারীদের ইউনিয়ন আমাদের হাতে ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমাদের হোটেল শ্রমিক প্রতিষ্ঠান শাহবাগ হোটেল ফিরিয়ে দেওয়ার দাবিতে মিছিল করেছি। সে মিছিলে গুলি হয়েছিল। এটাই ছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কোনো মিছিলে প্রথম গুলি।
এই প্রেক্ষাপটে আমাদের উপর হামলা নেমে এল। সরকারি শ্রমিক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক লীগ একের পর এক আমাদের ইউনিয়ন হাইজ্যাক করতে শুরু করল। আমাদের ইউনিয়নের রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে নতুন রেজিস্ট্রেশন দেয়া হতে থাকল। আমাদের সংযুক্ত শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি মওলানা সাইদুর রহমানকে হাইজ্যাক করে শ্রমিক লীগের সভাপতি করা হয়।
এ সময় আমি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি। সারাদেশে তখন এক ধরনের নৈরাজ্য। মুক্তিযোদ্ধা নামে পরিচয় দিয়ে এক শ্রেণির যুবক সবকিছু দখল করছে। এর বিরুদ্ধে লেখা যাচ্ছে না। সরকারি কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা আছে সন্ত্রাসীদের। সেই সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস থাকা খুব সহজ ছিল না।
অপরদিকে বামপন্থী মহলে তখন বিভাজন চরম। মস্কোর অনুসারী কমিউনিস্ট পার্টি প্রকাশ্যে সরকারের সাথে সহযোগিতা করছে। পিকিংপন্থী বলে পরিচিত রাজনীতিকরা বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত। সিরাজ সিকদারের নেতৃত্বে সর্বহারা পার্টি ক্ষমতা দখলের ডাক দিচ্ছে। একের পর এক থানা লুট হচ্ছে। ১৬ ডিসেম্বর অর্ধ দিবস হরতাল ডেকেছে সর্বহারা পার্টি। বিজয় দিবসের এ হরতাল হঠাৎ সমর্থন জানালেন মওলানা ভাসানী। কেন জানালেন, কোন ভিত্তিতে জানালেন সে ব্যাখ্যা আজো আমার কাছে পরিষ্কার নয়। শুধু একটি ব্যাখ্যাই পরিষ্কার ছিল যে, ডান-বাম রাজনীতির অঙ্গনে নৈরাজ্য বিরাজ করছিল।
ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। সহযোগিতা করছে কমিউনিস্ট পার্টি এবং একতা পার্টি। এ সহযোগিতার ভিত্তি কখনো আমাদের কাছে পরিষ্কার নয়। তাদের শ্লোগান হচ্ছে-দেশ স্বাধীন করেছি। এবার দেশ গড়তে হবে ঐক্যবদ্ধভাবে। কমিউনিস্ট পার্টির এ ঐক্যের শ্লোগানটি আদৌ পরিষ্কার নয়। প্রশ্ন হচ্ছে-ঐক্য কার সাথে। কোনো শ্রেণির সাথে। সমাজতন্ত্রের কথা বলা হলে আওয়ামী লীগের সাথে কি ঐক্য করা যায়। আওয়ামী লীগ কি সমাজতন্ত্রের দল? তাহলে আওয়ামী লীগের শ্রেণি চরিত্র কি? আওয়ামী লীগের সাথে কমিউনিস্ট পার্টি ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পূর্বে এ প্রশ্নগুলো আলোচিত হতো বিভিন্ন অঙ্গনে। তবে এ কথা ঠিক যে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও একতা পার্টির রাজনীতির একটি উত্তরাধিকারের ঐকমত্য ছিল। এরা মস্কোর অনুসারী ছিল এবং মস্কোর তত্ত্ব অনুযায়ী খুব সোজা হিসেব ছিল মস্কোর সাথে দিল্লির ভালো সম্পর্ক। দিল্লি সরকারের সাথে ঢাকা সরকারের ভালো সম্পর্ক। ঢাকা সরকারে আছে আওয়ামী লীগ। সুতরাং আওয়ামী লীগের সাথে বাংলাদেশের মস্কোপন্থীদের ঐক্য হবে এটাই স্বাভাবিক। তবে এ ঐক্য নিয়ে মতান্তর ছিল আওয়ামী লীগেই দীর্ঘদিন। এই মতান্তরের শিকার আমিও হয়েছিলাম ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে, সে কাহিনীতে পরে আসছি।
আমি ঢাকা সংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হলাম জুলাই মাসে। মনে হলো ওই মাস থেকে আমার শক্ৰসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে শুরু করলো। সম্মেলনে প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন তকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি একটি সুন্দর ভাষণও দিয়েছিলেন। উল্লেখ করেছিলেন পাকিস্তান যুগে সাংবাদিকদের আন্দোলনের কথা। সেই আন্দোলনে তাঁর সমর্থনের কথা। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পূর্বে নতুন সভাপতি হিসেবে আমি ভাষণ দিয়েছিলাম। আমার কণ্ঠে ছিল ক্ষোভের সুর। আমাদের সভার প্রথম সারিতে পত্রিকার সম্পাদকেরা বসেছিলেন। এক সময় আমি তাঁদের উদ্দেশে বললাম, আপনারা সকলে সরকারের স্তুতি গাইছেন কেন? সব দায়িত্ব চাপিয়ে দিচ্ছেন সাংবাদিকদের মাথায়। নিজেরা কোনো ভূমিকা পালন করছেন না। প্রবীণ সাংবাদিকরা সুযোগ খুঁজছে উঁচু পদ পাওয়ার জন্যে। অবস্থা এমন হলে এ দেশের সাংবাদিকতাই থাকবে না।
সাধারণ শ্রোতারা খুশি হলেও রুষ্ট হলেন সম্পাদকেরা। আব্দুল গাফফার চৌধুরী সম্পাদিত দৈনিক জনপদে আমার নাম করেই চিঠি বের হলো। কিছু কিছু উপদেশ দেয়া হলো সম্পাদকীয় ও সাংবাদিকতা সম্পর্কে। এই সময় বিপদ দেখা দিল দৈনিক গণকণ্ঠ নিয়ে। গণকণ্ঠ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদের মুখপত্র। মাত্র কিছুদিন আগে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠিত হয়েছে। এই দলটির নেতৃত্ব দিয়েছেন ছাত্রলীগের এককালের নামিদামী নেতারা। আমার আগের লেখায় ছাত্রলীগের এই গ্রুপটি সম্পর্কে আমি লিখেছি। আমি বলতে চেয়েছি ৭১-এর সংগ্রামের মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে ছাত্রলীগের এই অংশটি। তাদের ত্যাগ তিতিক্ষা কিংবা সাহস সম্পর্কে প্রশ্ন তুলবার অবকাশ নেই।
আমার প্রশ্ন ছিল এরা কারা। এরা কী চায়? একটি ছাত্র সংগঠন দিয়ে বিপ্লব করা সম্ভব নয়। তাই আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে থেকেই এদের বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলতে হয়েছে। প্রথম থেকে আমার ধারণা ছিল দেশের স্বাধীনতা এদের কাছে শেষ কথা নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্থবহ করতে হলে সমাজ পরিবর্তনের কথা বলতে হয়। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এমন কথা তারা বলতে রাজি হননি। আমি আগেই লিখেছি ৭১-এর সংগ্রামের আগে এই গ্রুপটির সাথে আমাদের দলের বারবার আলোচনা হয়েছে। আমরা বলেছি, আমরা স্বাধীনতা চাই। সাথে সাথে স্বাধীন বাংলাদেশের একটা রূপরেখাও চাই। আমরা পাকিস্তানের মতো আর একটি শোষণমূলক রাষ্ট্র গঠনে রাজি নই। এই প্রশ্নটি ছাত্রলীগের নেতারা বারবার এড়িয়ে গেছেন। স্বাধীনতার পরে মনে হলো ছাত্রলীগের এ গ্রুপটি প্রচণ্ড শক্তিশালী। কিন্তু এ শক্তির ভবিষ্যৎ কী? প্রথমে লক্ষ করলাম এ গ্রুপটি মুজিববাদের শ্লোগান দিচ্ছে। পরবর্তীকালে শুনলাম এরা বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের কথা বলছে। প্রথম প্রথম সেই শব্দটা আমার মনে কৌতুক সৃষ্টি করত। আমার বোধগম্য হতো না সমাজতন্ত্রের সাথে তারা এ বৈজ্ঞানিক বিশেষণটি কেন লাগিয়েছে। একদিন শুনলাম ওরা প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানকে কমরেড শেখ মুজিব বলে সম্বোধন করছে। ওদের শ্লোগান হচ্ছে, কমরেড শেখ মুজিব লও সালাম, লও সালাম। আমি বুঝতে পারিনি কোন ভিত্তিতে ওরা শেখ সাহেবকে কমরেড বলছে। তাহলে ওরা কি ভাবছে যে দেশে সমাজতন্ত্র হবে এবং সেই সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের নেতা হবেন শেখ মুজিব। পরবর্তীকালে আমার মনে হয়েছে ভিন্ন কথা। দুঃখ হয়েছে এই ত্যাগ এবং সাহসী তরুণদের জন্যে এবং মনে হয়েছে যে কোনো মহল থেকেই হোক এ তরুণদের নিদারুণভাবে বিভ্রান্ত করা হয়েছে। এদের বলা হয়নি, পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। বলা হয়নি আওয়ামী লীগ সমাজ পরিবর্তনের রাজনৈতিক সংগঠন নয়। এও বলা হয়নি যে অন্য দেশের সহযোগিতায় স্বাধীনতা অর্জন করলে আমরা পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ব। আমার যতদূর ধারণা এদের কাছে স্বাধীনতার একটি রঙিন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। হয়তো এও বলা হতে পারে, ছাত্রলীগ থেকে যেভাবে আওয়ামী লীগকে ৭১-এর সংগ্রামে ঠেলে দেয়া গেছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তেমনিভাবে আওয়ামী লীগকে ঠেলে দেয়া যাবে সমাজ পরিবর্তনের দিকে। এ ধরনের ধারণা ছাড়া শেখ সাহেবকে কমরেড বলার কোনো অর্থ আছে বলে আজো আমার মনে হয় না। আমার আর ধারণা হচ্ছে–এ কাজটি যারা করেছেন তাঁরা ভীষণ ধুরন্ধর। অথচ একেবারেই নির্বোধ। ধুরন্ধর না হলে একের পর এক এমন মিথ্যা তত্ত্ব সাজিয়ে একটি বিরাট সাহসী তরুণ গোষ্ঠীকে এমন বিভ্রান্ত করা সম্ভব হতো না। এমনো হতে পারে, এই ধূরন্ধর গোষ্ঠীটি জানত যে আজ হোক কাল হোক পাকিস্তান ভাঙবেই। এই পাকিস্তান ভাঙার আন্দোলন বামপন্থীদের হাতে গেলে দেশি বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি বিপর্যস্ত হবে। অশান্তপূর্ব ভারতের বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু হবে স্বাধীন বাংলাদেশ। লক্ষণীয় যে তখন এই অঞ্চলের কতিপয় দল স্বাধীন বাংলা গঠনের শ্লোগান দিচ্ছিল।
