সমস্যা শুধু আজাদ পত্রিকা নিয়ে নয়। সমস্যা ছিল দৈনিক পয়গাম নিয়েও। পয়গাম ছিল পূর্ব পাকিস্তানের এক সময়ের গভর্নর মোনায়েম খানের পত্রিকা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পত্রিকাটি মালিকবিহীন হয়ে যায়। সরকারি তত্ত্বাবধানে আসে। পরিবর্তিত নাম হয়–স্বদেশ। কিন্তু এ পত্রিকা চালাবে কে? এ পত্রিকার সাংবাদিক কর্মচারীদের বেতন কোথা থেকে আসবে? পয়গাম কোনোদিন লাভজনক পত্রিকা ছিল না। সরকারি বিজ্ঞাপনে চলত। পয়গামের প্রচার সংখ্যাও তেমন বেশি ছিল না। এ পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন হবার পরে ওই কাগজের দায়িত্ব সরকারের ওপর বর্তায়। আজকে যারা আমার লেখা পড়ছেন তাদের পক্ষে সেদিনের পরিস্থিতি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। আমি সেদিন ভেবেছি আজকেও ভাবছি, তখন সরকারের কী করার ছিল? দৈনিক পাকিস্তান, মর্নিং নিউজ, পাকিস্তান অবজারভার, পূর্বদেশ, আজাদ ও স্বদেশ চালাবার দায়িত্ব সরকারের ওপর পড়েছে। দৈনিক পাকিস্তান দৈনিক বাংলা হয়েছে। পাকিস্তান অবজারভার হয়েছে বাংলাদেশ অবজারভার। দৈনিক বাংলা, মর্নিং নিউজ, বাংলাদেশ ও পূর্বদেশে নিজেদের চলবার মতো কিছু সঞ্চয় ছিল। কিন্তু আজাদ ও স্বদেশে তেমন কোনো সঞ্চয় ছিল না। তাহলে এ দায়িত্ব কে নেবে? দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে এ ধরনের সমস্যার কথা কেউ নিশ্চয় ভাবেনি। কেউ ভাবেনি যে পত্রিকা চালাবার দায়িত্বও সরকারের ওপর ন্যস্ত হবে। ফলে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত কোনো মহলে ছিল না। তাই সাধারণ বিবেচনায় এই পত্রিকাগুলো পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত হলো তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর। কোনো নির্দিষ্ট নীতি প্রণয়ন করা হলো না। এ পত্রিকাগুলোর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কোনো চিন্তা-ভাবনা হলো না। তাৎক্ষণিকভাবে খবরদারি দেয়া হলো তথ্য মন্ত্রণালয়কে। কিন্তু পত্রিকাগুলোকে অধিক হারে বিজ্ঞাপন দিলেও রাতারাতি বিজ্ঞাপনের টাকা পাওয়া যাবে না। অর্থ সাহায্যের জন্যে যেতে হবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়কে বোঝানো অত সহজ নয়। তখন অর্থমন্ত্রী মরহুম তাজউদ্দিন আহমদ। তাঁকে কথায় ভোলানো যায় না। যুক্তিগ্রাহ্য না হলে কোনো কথাই তিনি শুনবেন না। তাঁর কাছ থেকে পত্রিকার জন্য টাকা আনা আদৌ সহজ নয়। তাঁর প্রথম কথা হলো–এ অর্থ কেন দেব? অর্থের মালিক আমি বা সরকার নয়। এ অর্থের মালিক রাষ্ট্রের জনগণ। এ অর্থ ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়? এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার সাধ্য আমাদের ছিল না। কারণ ওই পত্রিকাগুলো নিয়ে কী করা হবে, আদৌ এ পত্রিকাগুলো চালু রাখা হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত একান্তভাবেই সরকারকে নিতে হবে। এ ব্যাপারে ইউনিয়নের তেমন কোনো ভূমিকা নেই। ইউনিয়নের দায়িত্ব হচ্ছে সাংবাদিক কর্মচারীদের স্বার্থ রক্ষা করা। কোনো শিল্প কারখানা বা সংবাদপত্র বন্ধ হলে কর্মচারীদের পাওনা আদায়ে নিশ্চয়তা বিধান এবং সম্ভব হলে প্রতিষ্ঠানটি বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা।
কিন্তু পাকিস্তানে তখনো সংবাদপত্র শিল্প হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পত্রিকাগুলো ছিল ব্যক্তি মালিকানায়। মাত্র দৈনিক বাংলা ও মর্নিং নিউজ-এর মালিক ছিল পাকিস্তান প্রেস ট্রাস্ট। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই মালিকানার প্রশ্নই মুখ্য হয়ে দেখা দিল। সঙ্কট দেখা দিল পত্রিকাগুলো চালু রাখা নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে আজাদ পত্রিকার জন্যে কিছু টাকা পেলেও শেষ রক্ষা হলো না। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ এ ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত চাইলেন। জানতে চাইলেন পত্রিকাগুলোর ভবিষ্যৎ। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে কোনো কিছুই বলার সুযোগ ছিল না।
সরকারের পক্ষে দৈনিক স্বদেশের প্রশাসক নিযুক্ত হলেন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা কোরবান আলী। কোরবান আলীর বিরুদ্ধে স্বদেশের সব সম্পদ বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগ উঠল। শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেলো স্বদেশ। আমাদের শুধুমাত্র দেখা ছাড়া কোনো কিছু করার অবকাশ ছিল না। তবে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হয়েছিল সাংবাদিকদের পুনর্বাসনের। আজাদ পত্রিকার সমস্যাও মিটল না। আজাদ পত্রিকার মালিকানা নিয়ে বিরোধ ছিল। সমস্যার সাময়িক সমাধান হিসেবে আজাদের মালিকদের একটি অংশের হাতে আজাদের মালিকানা দিয়ে দেয়া হয়। শেষ হলো সরকারি নেতৃত্ব। কিন্তু সমস্যার সমাধান হলো না। সংবাদ সংস্থা বিপিআই অর্থাৎ বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনাল নতুন নাম নিল। নাম হলো ইস্টার্ন নিউজ এজেন্সি এনা। এ প্রতিষ্ঠানটিও দীর্ঘদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলল। সেই এনাও পরবর্তীতে নিজগুণে বন্ধ হয়ে গেল।
পত্রিকা জগতের এই পরিস্থিতিতে ১৯৭২ সালের জুলাই মাসে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচন হলো। আমি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সভাপতি হলাম। সাধারণ সম্পাদক হলেন গিয়াস কামাল চৌধুরী। একটি অস্থির পরিবেশে আমি ইউনিয়নের সভাপতি হলাম। চারদিকে অস্থিরতা। একাত্তরের সংগ্রামের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই সর্বত্রই অস্ত্র ছড়িয়ে গেছে। সকলেই মুক্তিযোদ্ধা এবং সশস্ত্র। সকলেই নিজের সংবাদ ছাপাতে চায়। সংবাদ না ছাপালে এসএলআর নিয়ে অফিসে হাজির হয়ে যায়। প্রকাশ্যে জীবননাশের হুমকি দেয়। এর মাঝখানে অধিকাংশ পত্রিকায় অনিশ্চয়তা। একাত্তরের সংগ্রামের কালে সংবাদ বন্ধ ছিল। সংবাদ তখনো সে বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠেনি। পাকবাহিনী ইত্তেফাক পুড়িয়ে দিয়েছিল। একাত্তরে সংগ্রামের সময় ইত্তেফাক প্রকাশিত হয়। কিন্তু ইত্তেফাক যুদ্ধের ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। প্রচার সংখ্যার দিক থেকে তখন দৈনিক বাংলা এগিয়ে। যুদ্ধ শেষে দৈনিক বাংলায় আমার চাকরির পরিবর্তন হয়েছে। দৈনিক পাকিস্তানে চাকরি নিয়েছিলাম সহসম্পাদক হিসেবে। দৈনিক বাংলায় আমি সহকারী সম্পাদক। আমি ঢাকায় ফিরেছি। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেছি জানুয়ারিতে। আমি অনিকেত ছদ্মনামে উপসম্পাদকীয় লিখছি দৈনিক বাংলায়। আমার লেখা তখন একান্তই বিতর্কিত। আমার লেখায় সরকার পক্ষ কিছুতেই খুশি নয়। আর এই সময়েই আমি ইউনিয়নের সভাপতি হলাম। তখন সাংবাদিকদের জাতীয়ভিত্তিক কোনো সংগঠন ছিল না। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নই জাতীয়ভিত্তিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিত। ফলে আমার অবস্থাও সঙ্গীন হয়ে উঠল।
