ফলে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আজকের সমাজের সাংবাদিকরা কেনাকাটার পণ্যে পরিণত হয়েছে। সবার একটা ধারণা জন্মেছে, এমনকি প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করলেও সাংবাদিকদের জন্যে ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক সংবাদপত্র অফিসে প্রেস রিলিজের সাথে বেশ কিছু টাকার অঙ্কের নোটও এসে পৌঁছে। সবচেয়ে ন্যক্কারজনক হচ্ছে-আমরা যারা সংসদে যাই তাদের সংসদে সংবাদ সংগ্রহের জন্য সকল পত্রিকা অফিস থেকে একটি নির্দিষ্ট অংকের টাকা দেবার কথা। অনেক পত্রিকা দিয়েও থাকে। তবুও দেখা যায় সাংবাদিকদের সংসদে যাওয়া-আসার জন্যে প্রেস ক্লাবে একটি সরকারি গাড়ি রাখা হয়। এটা যে সাংবাদিকতা নীতিমালার বিরোধী সে কথাও যেন আমরা সবাই ভুলে গেছি। এ কথাও সত্যি, বাংলাদেশের সব পত্রিকায় বেতন বোর্ডের রোয়েদাদ কার্যকর হয়নি। আনুষ্ঠানিকভাবে সপ্তম বেতন। বোর্ডের রোয়েদাদ প্রকাশিত হলেও ঢাকার অনেক দৈনিক কোনো বেতন বোর্ডের রোয়েদাদ-ই কার্যকর হয়নি। মালিকপক্ষ বেতন বোর্ডের রোয়েদাদের তোয়াক্কাই করেন না। অপরদিকে বাজারে অসংখ্য দৈনিক, সাপ্তাহিক ও পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। নতুন নতুন সাংবাদিক সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের কোনো নিয়োগপত্র নেই। বেতন কাঠামো নেই। ছুটি-ছাটা নেই। চাকরির শর্ত নেই। আজকে নিযুক্তি পেয়ে কালকে চাকরি যাওয়া বাংলাদেশে আজ খুব অস্বাভাবিক নয়। নতুন সাংবাদিকরা বলতে পারেন-এ পরিস্থিতিতে আমাদের কোনো কিছুই করার নেই। দরকষাকষির অবস্থায় আমরা নেই। আর আমাদের আজকের পূর্বসূরিদেরও তেমন কোনো নেতৃত্ব নেই। সবকিছুই মুক্তবাজার অর্থনীতির মতো। নীতি বা নীতি মানার প্রশ্নটি একান্তই উহ্য।
এ কথাগুলো মেনে নিয়েও একটি কথা অস্বীকার করা যাবে না, আমরা আজ আর তেমন জনগণের আস্থাভাজন নই। আমাদের কোনো খবরই পুরোপুরি সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে না। এর জন্যে একমাত্র সাংবাদিকরা দায়ী আমি বলব না। আমার দুঃখ হচ্ছে–আজকের পরিস্থিতির বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে তেমন নিমতম প্রতিবাদ পর্যন্ত নেই।
৮. পুরনো কথায় ফিরে আসি
এবার আমি পুরনো কথায় ফিরে আসি। আমি কথা শুরু করেছিলাম শেখ সাহেবকে কেন্দ্র করে। বলেছিলাম আজো অনেকে অভিযোগ করে থাকেন–সেকালে আমার জন্যেই অনেক কিছু সুযোগ-সুবিধা থেকে সাংবাদিকরা বঞ্চিত হয়েছে। শেখ সাহেবের কাছে চাইলে অনেক কিছু পাওয়া যেত। শেখ সাহেব তখন প্রধানমন্ত্রী, তাজউদ্দিন আহমেদ অর্থমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী মিজানুর রহমান চৌধুরী। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গিয়াস কামাল চৌধুরী। আমি আগেই উল্লেখ করেছি, দৈনিক আজাদ তখন মালিকহীন। প্রশাসক নিয়োগ করে কাগজটি চালানো হচ্ছে। কাগজটির নিদারুণ অর্থ সঙ্কট। কাগজ চলছে না। আমি তখন সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাহী সদস্য। গিয়াস কামাল এসে বলল–আপনাকে আমাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতে হবে। টাকা আনতে হবে তাঁর কাছ থেকে। আজাদ ইউনিয়নের নেতৃত্বে আছেন সৈয়দ জাফর, আব্দুর রহিম, আজাদ ও ফকির আশরাফ। আমরা কোনো খবর না দিয়েই প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে পুরনো গণভবনে গেলাম। গণভবনের গেটে গিয়ে খবর দিলাম, আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে চাই।
তারপর আমরা সবাই অবাক বিস্ময়ে চুপ হয়ে গেলাম। সামনে দেখি প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান দাঁড়িয়ে। আমি বললাম, আপনি এখানে! প্রধানমন্ত্রী বললেন, এ কী কথা বলছেন? আপনারা আসবেন, আমি গেটে আসব না? আপনারা একটা খবর দিয়ে আসবেন তো। আমি কিছুই জানব না অথচ আপনারা আসবেন আমার সাথে দেখা করতে। গণভবনের গেটে তখন তেমন আঁধার নামেনি। সন্ধ্যার বিজলী বাতি জ্বলছে। অদ্ভুত বিস্ময়ে তাঁর পেছনে আমরা হাঁটতে থাকলাম। প্রধানমন্ত্রী জানতে চাইলেন আমার আত্মীয় স্বজনের খবর। আর কথায় কথায় বললেন, আমি সব জানি।… আমি সব জানি।
তাহলে আপনারা কেন এসেছেন? গণভবনে বৈঠকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করলেন প্রধানমন্ত্রী। গিয়াস কামাল বলল, আজাদের মালিক পালিয়েছে, কাগজটির দায়িত্ব সরকার নিয়েছে। অথচ চালাবার টাকা নেই। কারো বেতন হচ্ছে না। এভাবে তো চলতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী বললেন, নির্মল সেন, বলুন, এবার কী করা যাবে? আমি একটি অদ্ভুত প্রস্তাব দিলাম। আমি বললাম, আজাদ পত্রিকা ইউবিএল অর্থাৎ বর্তমান জনতা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছিল। সে ঋণ পরিশোধ করেনি। জনতা ব্যাংককে বলুন পত্রিকাটির ঋণের দায় গ্রহণ করতে এবং সাংবাদিক কর্মচারীদের টাকা দিতে। এরপর অদ্ভুত একটা কণ্ঠ আমার কাছে এল। প্রধানমন্ত্রী ফোন তুললেন। চাইলেন জনতা ব্যাংকের এমডি জনাব খায়রুল কবিরকে। বললেন, কবির ভাই, নির্মল সেন ও গিয়াস কামাল এসেছে। নির্মল সেন তো বিপ্লবী, ওকে তো কথা শোনানো যাবে না। গিয়াস কামাল আমাদের লোক। ওরা বলছে, আজাদ পত্রিকা নাকি আপনাদের কাছে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেনি। আপনারা ঋণের দায়ে ওই পত্রিকাটি টেকওভার করেন। ওদের কিছু টাকা দেন।
আমি বললাম, প্রধানমন্ত্রী, এ তো হয় না। এ ব্যাপারে আইন করতে হবে তো। আইন না করে আজাদ তো টেকওভার করতে পারবেন না। আপনি আপাতত কবির ভাইকে আমাদের কিছু টাকা ধার দিতে বলুন। প্রধানমন্ত্রী আমাকে থামিয়ে দিলেন। বললেন–আইনের কথা পরে হবে। আগে আপনাদের বাঁচাতে হবে। ঠিক আছে, কবির ভাইকে বলে দিচ্ছি আপনাদের কিছু টাকা দেয়ার জন্য। প্রধানমন্ত্রীর কথামতো আজাদ পত্রিকায় কিছু টাকা দেয়া হয়েছিল। যাদের টাকা দেয়া হয়েছিল, তাদের আমি চিনি। আজাদ কর্তৃপক্ষ কোনোদিন সে টাকা পরিশোধ করেছেন বলে আমার মনে হয় না। আর আজাদ পত্রিকা নিয়ে পরবর্তীকালে কাহিনী অনেক দীর্ঘ। সে কাহিনীতে আমি আরো পরে আসব। আর নিশ্চয়ই আমি মেনে নেব, প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে সেকালে চাইলে অনেক কিছুই পাওয়া যেত। সে চেষ্টা আমি করিনি। কেন করিনি সে কথা আমি আগেই বলেছি।
