আর একদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সবাইকে ডেকে পাঠালেন। আমি একটু দেরিতে পুরনো গণভবনের বৈঠকে পৌঁছালাম। সেখানে গিয়ে শুনি সিদ্ধান্ত হয়েছে সকল সাপ্তাহিক কাগজের কাছে নাকি ৫শ টাকা করে জামানত দাবি করা হয়েছে। কারণ সাপ্তাহিক হক কথায় লেখা হয়েছে নৌবাহিনীতে বিদ্রোহের কথা। আর এক সাপ্তাহিক লিখেছে কে নাকি কিশোরগঞ্জ থেকে লিচু এনে প্রধানমন্ত্রীকে খাইয়েছে। আমি প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, দেশে এ ধরনের কোনো আইন নেই। আপনি এভাবে পত্রিকায় জামানত চাইতে পারেন না। আর এ ধরনের লেখালেখি বিবেচনা করতে হলে দেশ চলে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী উড়িষ্যার জনসভায় ভাষণ দিতে গেলে তাকে ঢিল মারা হয়েছিল। তাঁর নাক দিয়ে রক্ত ঝরেছিল। কিন্তু এ জন্যে পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করেনি বা সে সভায় পুলিশ লাঠিচার্জ করেনি। প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। বললেন, ঠিক আছে। এবার কিছু বলা হলো না। পত্রিকাগুলোকে সংযত হতে বলবেন।
সাংবাদিকদের এখনো অভিযোগ–স্বাধীনতার প্রথম দিকে নাকি একটু নরম হলে অনেক কিছুই পাওয়া যেত। আমি নাকি কোনোদিনই সরকারের সাথে সমঝোতায় রাজি হইনি। প্রধানমন্ত্রী ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। সাংবাদিকদের অদেয় কিছুই তাঁর ছিল না। শেখ সাহেব সম্পর্কে এ মন্তব্য ভুল তা আমি বলতে চাই না। কিন্তু পাওয়া যায় বলেই একজনের কাছে সব কিছু চাইতে হবে এ তত্নে আমি বিশ্বাসী নই। আমার ধারণা এভাবে চাইতে গেলে আমরা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলি। মনে হয় সাংবাদিকরা একটা ভিন্ন জাত। এরা বিশেষ সুবিধার অধিকারী। আমি এই ধারায় কোনোদিন বিশ্বাসী ছিলাম না। আমি জানতাম শেখ সাহেবের কাছে চাইলে অনেক কিছুই পাওয়া যেত কিন্তু সে চেষ্টা আমি করিনি। আবার সাংবাদিকদের বিশেষ অধিকার সম্পর্কেও আমি কোনোদিন একমত ছিলাম না। এ ব্যাপারে কখনো আমি তাদের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছি। আবার কখনো তদের মতো করেই সাংবাদিকদের পক্ষে দাঁড়িয়েছি।
এ ধরনের দুটি ঘটনা আমার মনে আছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার বেশ পরের কথা। পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশংকর রায় বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। এ উপলক্ষে একটি সভা ছিল জোনাকী সিনেমা হলে। আমি সেই সভায় যাইনি। প্রেস ক্লাবে বসে ছিলাম। তাদের অভিযোগ, তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করা হয়নি। তাদের বসবারও জায়গা ছিল না। তাই তারা চলে এসেছে। তাদের দাবি–ওই সভার কোনো ছবি বা খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হবে না। আমি একমত হলাম না। আমি বললাম সংবাদ সংগ্রহ করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কোথায় বসতে দেয়া হলো বা না হলে এটা আদৌ মুখ্য বিষয় নয়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষ দিকে বার্লিনের পতন হচ্ছিল। মিত্রবাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন জেনারেল আইসেন হাওয়ার। সোভিয়েত বাহিনীর সর্বাধিনায়ক ছিলেন মার্শাল জুকভ। বার্লিন পতনের ছবি তুলতে চল্লিশজন আলোকচিত্রী গুলিতে প্রাণ দিয়েছিল। তারা কিন্তু দাঁড়াবার বা বসার জায়গার জন্যে বিতর্ক করেনি। আমরা ঝড়-ঝঞ্ঝা এবং দুর্ঘটনার ফলে এ ধরনের সুযোগ-সুবিধার পরোয়া করি না। এটাই সাংবাদিকতার নীতিমালা। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সভার বিবরণ যাবে কি যাবে না এ নিয়ে সাংবাদিক ইউনিয়নের কিছু বলার নেই। এ ব্যাপারে সকল দায়িত্ব পত্রিকা কর্তৃপক্ষের। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা বিপর্যস্ত হলে নিশ্চয়ই ইউনিয়ন পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু কোনো সভা কিংবা বৈঠকে গিয়ে সাংবাদিকরা চেয়ার বা চা-নাস্তা পেল কিনা এ প্রশ্ন একান্তই অপ্রাসঙ্গিক।
তবে শেখ সাহেবের আমলে ভিন্ন ভূমিকাও ইউনিয়ন পালন করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান দাউদকান্দি যাবেন। সেখানে তিনি এক জনসভায় ভাষণ দেবেন। সাংবাদিকদের অভিযোগ টেলিভিশন, বেতার, বিএসএস, এনা’র প্রতিনিধি ব্যতীত আর কাউকেই হেলিকপ্টারে নেয়া হবে না। সকলকে যেতে হবে সড়ক পথে। তখন সড়ক পথে দুটি খেয়া ছিল। মেঘনা ও দাউদকান্দিতে সেতু নির্মিত হয়নি। সাংবাদিকদের দাবি তাদের হেলিকপ্টারে নিতে হবে। অন্যথায় সবাইকেই যেতে হবে সড়ক পথে। এ দাবির কথা আমি গণভবনে জানিয়ে দিলাম। আমি বললাম, যাওয়া-আসার ব্যাপারে দু’ধরনের ব্যবস্থা হতে পারে না। সকলে একইভাবে যেতে হবে। গণভবন থেকে পাল্টা ফোন এল। বারবার অনুরোধ জানানো হলো তাদের ব্যবস্থা মেনে নেয়ার। আমি রাজি হলাম না। গণভবনকেই রাজি হতে হলো। প্রধানমন্ত্রী তাঁর সহযোগীদের নিয়ে হেলিকপ্টারে চলে গেলেন। আর সবাই গেলেন সড়ক পথে। এই গণভবনের রাজি হওয়ার পেছনে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আমি এখনও মনে করি সেই মানুষটির পক্ষেই এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব ছিল। আর আমি আজো মনে করি যে সেদিন ইউনিয়নের নেতা হিসেবে আমার দাবি সঙ্গত ছিল না। সরকারি হোক বেসরকারি হোক যে কোনো অনুষ্ঠানে সংবাদ সংগ্রহ করা পত্রিকা বা সংবাদ সংস্থার কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। তাতে অন্য কারো কিছু করবার নেই। অথচ আমাদের দেশে একটি বিপরীত ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এমন অবস্থার সৃষ্টি করেছি যে সভা, সেমিনার ও মিছিলের সংগঠকরা আমাদের ভাষায় আমাদের খুশি করতে চায়। এমনকি অনেক সংগঠন আমাদের আনা নেয়ার ব্যবস্থা করে। অথচ সাংবাদিকদের বেতন বোর্ডের রোয়েদাদে সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহের জন্যে বিশেষ ভাতা দেয়ার নিয়ম আছে। অনেক সংবাদপত্র এই ভাতা দিয়েও থাকেন। অথচ এর পরও আমাদের সাংবাদিক বন্ধুরা সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে যতদূর সম্ভব সরকারি বেসরকারি সংস্থার কাঁধে চেপে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেন।
