অথচ ভাবনা হওয়া উচিত ছিল ভিন্ন ধারার। ভাবনা হওয়া উচিত ছিল দেশ গড়ার। দেশ স্বাধীন হয়েছে, দেশকে গড়তে হবে। দেশ গড়ার জন্যে কারিগর চাই। ভালো ছাত্র চাই। দক্ষ কর্মী চাই। দক্ষ প্রকৌশলী, চিকিৎসক চাই। কিন্তু কারো যেন মাথায় এ কথাটি এল না। আমার ব্যাখ্যা ছিল এটাই স্বাভাবিক। কারণ কেউ ভেবে চিন্তে মুক্তিযুদ্ধে যায়নি। কেউ ধারাবাহিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন লালন করেনি। তার চোখের সামনে কোনো পরিকল্পনা ছিল না। নতুন সমাজ গঠনের কোনো স্বপ্ন ছিল না। যুদ্ধে নেতৃত্বেরও একই অবস্থা। যারা স্বাধীন বাংলা সরকার গঠন করেছিলেন, যারা সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন বা যারা এ সংগ্রামের সহযোগী বা সাহায্যকারী ছিলেন, কারো মাথায় এ সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গঠনের স্বপ্ন ছিল না। সবার মাথায় এ যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। তাই তাদের কাছে সমস্যা ছিল কোনোমতে এ যুদ্ধে জিতে দেশে ফিরে যাওয়া। পূর্ব পাকিস্তান নামক যে দেশটি ফেলে এসেছি তার নাম পাল্টে বাংলাদেশ করাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। এ ধরনের লক্ষ্য বা বিবেচনা না থাকলে এভাবে ঢালাও পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ বা নকল করার সুযোগ দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। কেউ ভাবলেন না যে, এ ধরনের পরীক্ষার সুযোগ দেয়ার ফলে পরীক্ষার্থীরা সমাজের ওপর বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। পরবর্তীকালে অবৈধভাবে পরীক্ষায় পাসের মতোই জীবনের সর্বত্রই অবৈধভাবে কাজের অনুসারী হবে। সবকিছুই পেতে চাইবে অবৈধভাবে। আমি তখন দৈনিক বাংলার পাতায় বারবার লিখতে চেষ্টা করেছি। আর ভীষণভাবে বিতর্কে সৃষ্টি করেছি এবং বিতর্কিত হয়েছি। সে সময় আর একটি দুঃখজনক ছবি আমি দেখেছি মুক্তিযোদ্ধা মহলে। সবাই মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কিছু পেতে চাচ্ছে। সকলেই মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সংগঠন করার চেষ্টা করছে। সকলেরই দাবি আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি সুতরাং আমাকে চাকরি দিতে হবে। আমি বাড়ি চাই, গাড়ি চাই, আমি সবকিছু চাই। আর এই দাবি নিয়েই চেনাচেনা বড় মুক্তিযোদ্ধারা বাড়ি আর গাড়ি দখল করতে শুরু করলেন।
এ সময়ে একটি মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মেলনে আমাকে ডাকা হয়েছিল। বহু আশা করেই আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। সেই সভায় গিয়ে আমি অবাক হয়ে গেলাম। দেখলাম সেখানেও একই দাবি, আমাদের সব চাই। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। সুতরাং সবকিছু আমাদের প্রথম পেতে হবে। আমি বলেছিলাম–একথা জানা থাকলে টেন্ডার দিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহ করা উচিত ছিল। তাহলে দর কষাকষি করা যেত। টেন্ডার দিয়ে সংগৃহীত মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ শেষে সবকিছু দাবি করতে পারত না। আমার কথা কারও মনে ধরেনি এবং অবাঞ্ছিত হয়ে আমাকে সভা ত্যাগ করতে হয়।
দীর্ঘদিন পরে আজ আমি এ কথাগুলো লিখছি একটি বিশেষ পটভূমিতে। তখন এ পরিস্থিতি সামাল দেবার দায়িত্ব ছিল রাজনীতিকদের। বিশেষ ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল সাংবাদিকদের। কিন্তু কেউ-ই সেই ভূমিকা পালন করলেন না। প্রথমদিকে শুধুমাত্র আওয়ামী লীগই দাবি করতে থাকল যে তারাই একমাত্র মুক্তিযুদ্ধ করেছে। তাই মুক্তিযুদ্ধের পর সব সুযোগ-সুবিধাই তাদের প্রাপ্য। কিছুদিন পর এ পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছিল। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি মিলে গণতান্ত্রিক ঐক্য জোট ‘গজ’ গঠন করেছিল। এবার তিনটি দল ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধের দাবিদার হলো। আর সবাই হলো ব্রাত্য।
এসময় সাংবাদিকরা বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারত। কিন্তু সাংবাদিক জগতেও দেখা গেলো ভাঙন। কেউ আর সাংবাদিকতা করতে চাচ্ছে না। সকলেই যুদ্ধ শেষে প্রাপ্য চাচ্ছে এবং সে সুযোগ সীমিত ক্ষেত্রে হলেও অনেকেই গ্রহণ করল এবং মোটামুটিভাবে এরাই ছিল এককালে সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা। তাই দেশের এ বেসামাল অবস্থার বিরুদ্ধে কে দাঁড়াবে? পাকিস্তান আমলের অভিজ্ঞতা ছিল–কোনো কিছু হলে দুটি মহল থেকে প্রথমে বাধা উঠত। একটি ছাত্র, অপরটি সাংবাদিক। পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বে কোনোকালেই কোনো সরকার সাংবাদিকদের সমর্থন পায়নি। সাংবাদিকরা শুধু কলমই ধরেনি; রাজপথে মিছিল করেছে। পুলিশের লাঠি খেয়েছে। জেলে গিয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সাংবাদিক ইউনিয়নে সেই পুরনো নেতৃত্বকে আর খুঁজে পাওয়া গেল না।
নতুন নেতৃত্ব তখন অপরিচিত। সংবাদপত্র জগতে তখন নিদারুণ সঙ্কট। দেশে ৯টি কাগজ। ছটি কাগজের ব্যবস্থাপনা সরকারের হাতে। দেশে দুটি সংবাদ সংস্থা। তার দায়িত্বও সরকারের ওপর ন্যস্ত। এই মুহূর্তে সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো বা সরকারের সমালোচনা করা আদৌ সম্ভব ছিল না। এর মাঝখানে ছিল আবার কিছু কিছু নতুন সাপ্তাহিকের দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা, কিছু কিছু রাজনৈতিক সাপ্তাহিকের চূড়ান্ত হঠকারিতা। এই দায়িত্বহীন সাংবাদিকতা এবং হটকারী সাংবাদিকতার জন্যে সেকালের সাংবাদিকদের তিন পা এগুলে পাঁচ পা পিছাতে হয়েছে।
এ ধরনের একটি ঘটনা ঘটেছিল সাপ্তাহিক গণশক্তি নিয়ে। পত্রিকাটি সাম্যবাদী দলের (এমএল) মুখপত্র। সাম্যবাদী দল তখনো বাংলাদেশ মেনে নেয়নি। তারা বাংলাদেশের পরিবর্তে পূর্ববাংলা শব্দই ব্যবহার করে। পত্রিকাটির সম্পাদক প্রখ্যাত বামপন্থী নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা। এ পরিস্থিতিতে একদিন তোয়াহা সাহেবের সাথে আলাপ করার জন্যে তার যোগীনগরের বাসায় গেলাম। পরের দিন গণশক্তি বের হওয়ার কথা। আমি তোয়াহা সাহেবকে বোঝাবার চেষ্টা করলাম বাস্তবতাকে মেনে নিতে। বাংলাদেশকে পূর্ববাংলা লিখবেন না। বিদেশের বহু রাষ্ট্র বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। আপনাদের স্বীকৃতি দিতে আপত্তি কোথায়? তিনি আমার সাথে একমত হলেন। আমি নিশ্চিন্তে বাসায় ফিরলাম। পরের দিন দেখলাম গণশক্তিতে বাংলাদেশের পরিবর্তে পূর্ববাংলাই লেখা হয়েছে। আমি হবাক হলাম। সরকার পত্রিকাটি বাজেয়াপ্ত করলেন। প্রেস বন্ধ করলেন। উভয়পক্ষের কাছেই দায়ী হলো সাংবাদিক ইউনিয়ন।
