এবার আমি দ্বিতীয় প্রশ্নের জবাব দিতে চাই। বলা হয়ে থাকে ১৯৬১ সালে প্রথম বেতন বোর্ড শুধুমাত্র সাংবাদিকদের জন্যে হয়েছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার জন্যে পাকিস্তানের দ্বিতীয় বেতন বোর্ড আমাদের জন্যে কার্যকর ছিল না। ফলে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বেতন বোর্ড গঠনের দাবি ওঠে। উল্লেখ্য, প্রথম বেতন বোর্ডে প্রেস শ্রমিক ও সাধারণ কর্মচারীদের সম্পর্কে কোনো সুপারিশ ছিল না। ফলে তারা ছিল সব ব্যাপারে বঞ্চিত। অথচ এ কথা সত্য, বিশেষ করে প্রেস শ্রমিকদের সহযোগিতা ছাড়া অন্তত সংবাদপত্রে ধর্মঘট করা যায় না। তারা মালিকদের সাথে সহযোগিতা করলে মালিকরা পত্রিকা বের করতে পারে। এ তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন ভাতার আন্দোলন নিয়ে। আমাদের অভিজ্ঞতা হয়েছিল যে তাদের সাথে সহযোগিতা না করলে পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ করা যাবে না। তাই ১৯৭০ সালে অন্তর্বর্তীকালীন ভাতা আন্দোলনের সময় আমার পূর্বসূরি সেকালের ইউনিয়ন নেতৃবৃন্দ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে দ্বিতীয় বেতন বোর্ড হবে সংবাদপত্রের সম্পাদক থেকে দারোয়ান পর্যন্ত সকল শ্রেণির কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের নিয়ে। সাংবাদিকদের জন্যে পৃথক বেতন বোর্ড হবে না। ১৯৭২ সালে আমি যখন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের এবং ১৯৭৩ সালে আমি ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি নির্বাচিত হই তখন আমার ওপরই ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি বর্তায়। তবে সে ক্ষেত্রেও অনেক প্রতিবন্ধকতা ছিল। স্বয়ং সেকালের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের ভিন্ন কথা বলেছিলেন। সে কথায় আমি পরে আসব।
সংবাদপত্র জগতে কী হবে আমাদের ঠিক মাথায় আসছিল না। আমি বার বার লিখেছি–তখন সবকিছু আমার গোলেমেলে মনে হতো। স্বাধীনতার পরবর্তীকালটা কোনো ব্যাখ্যা দিয়ে আমি মেলাতে পারতাম না। তখন আমার মুক্তিযুদ্ধের সময়কার এক সহযোগী আমার সাথে থাকত। তার বাড়ি ভোলা। দৈনিক পূর্বদেশে চাকরি করতো। তার অসীম সাহস। বারবার আমার সাথে সীমান্ত পারাপার করেছে। আমাকে সব সময় সতর্ক পাহারায় রেখেছে। তার সে ভূমিকা ভুলবার নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সে পূর্ব দেশেই চাকরি পেয়েছিল। চাকরির পূর্বে বহু চেষ্টা করেও সে প্রবেশিকা পরীক্ষার চৌকাঠ পার হতে পারেনি।
একদিন সে রাতে আমার কক্ষে এল। বলল–স্যার, আমি যদি ম্যাট্রিকে প্রথম হই তাহলে কি সংবাদপত্রে আমার ছবি ছাপা হবে? সাংবাদিকরা কি আমার সাক্ষাৎকার নিতে আসবে? তার কথা শুনে আমি অবাক হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, কী করে তুই পরীক্ষা দিলি? তুই আমার বাসায় থাকিস অথচ আমি জানি না যে তুই ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। সে হেসে ফেলল। বলল–স্যার পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছি। পরীক্ষা দেবে দু’জনে। দুটি অ্যাডমিট কার্ড জোগাড় করেছি। একটি আমার নামে, অপরটি আমার বন্ধুর নামে। আমার বন্ধু বিএ পাস। পরীক্ষার হলে সে আমার খাতায় লিখবে আর আমি তার খাতায় লিখব। তাই আমার ভয় হচ্ছে আমার বন্ধু আমার বদলে পরীক্ষা দিলে সে নিশ্চয়ই প্রথম বা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করবে। কিন্তু সকলে জানবে যে আমি প্রথম বা দ্বিতীয় হয়েছি। তখন আমি বিপদে পড়ে যাব। তখন সাংবাদিকরা আমার খোঁজে আপনার বাসায় আসবে। আপনার সুবাদে সকলেই আমাকে চেনে। আমরা দু’জনেই বিপদে পড়ে যাব। তার কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। এ কী কথা আমি শুনছি। ছেলেটি কী বলছে। এই ছেলেটি একাত্তর সালের ন’মাস আমাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেছে। সামরিক বাহিনীর হাতে পড়ে পালিয়ে এসেছে। আমার জন্য সব কিছু করেছে। ঢাকার বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে আমার জন্য টাকা সংগ্রহ করেছে। ভিন্ন নামে পত্রিকা বের করেছে। আমি কখনও ওর চোখেমুখে মৃত্যুর ভয় দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধের কালের সেই ছেলে এখন অবৈধভাবে পরীক্ষায় পাস করতে চাচ্ছে? আমার বাসায় থাকে অথচ ঘৃণাক্ষরে আমি কিছু জানতে পারিনি। তাহলে এ ছেলে মুক্তিযুদ্ধে কেন গিয়েছিল? কোন লক্ষ্যে? কোন আশায়? সে কোন স্বপ্ন দেখেছিল মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে? কথাগুলো আমি বারবার বলতে চেষ্টা করেছি আমার পূর্বের লেখায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মুক্তিযুদ্ধ এদের কাছে ছিল সাময়িক উত্তেজনা। সেই উত্তেজনা কেটে গেছে। তারা আবার পূর্ব জীবনে ফিরে গেছে। ওদের আমরা আদর্শ দিতে পারিনি। ওদের অনুপ্রাণিত করতে পারিনি। সামরিক উত্তেজনায় জীবন দিতে শিখিয়েছিলাম। আমি সাংবাদিক এবং রাজনীতিক। আমার চোখের সামনে ঘটনাগুলো এমনি করেই প্রতিভাত হচ্ছিল। কেউ লাগাম টেনে ধরার চেষ্টা করিনি।
দেশ স্বাধীন হলো। মুক্তিযোদ্ধা তরুণেরা ঘরে ফিরে এল। যুদ্ধের জন্যে তাদের পড়া হয়নি। অনেকে পরীক্ষা দিতে পারেনি। তাই সকল মহল থেকেই এ দাবি উঠল, আমাদের বিশেষ পরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে। আমরা জীবন হাতে নিয়ে যুদ্ধ করেছি। সুতরাং আমরা পাস করতে চাই। সরকার সম্মত হলো। অদ্ভুত এক বিধান করল। সকলকে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দিল। বাৰু বছরের তরুণ থেকে শুরু করে সত্তর বছরের বৃদ্ধ পরীক্ষার্থী হলো। পরীক্ষার হলে নকলই হয়ে উঠল বৈধ কাজ। স্বামী-স্ত্রীকে নকল দিচ্ছে। পিতা পুত্রকে নকল দিচ্ছে। ভাই বোনকে নকল দিচ্ছে। সে এক নকলের মহোৎসব। পরীক্ষায় পাসের হার হলো ৯৮%, ৯৯%। প্রায় সকলের বাড়িতে আনন্দ এবং উচ্ছ্বাস। কেউ ভাববার চেষ্টা করল না দেশটাকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি। আজো সে ট্রাডিশন চলছে।
