বিস্ময়ের সাথে লক্ষ করলাম যে, আমার বন্ধুরা ভেবেই নিয়েছেন যে দেশে একটি সমাজতান্ত্রিক কাঠামো হতে যাচ্ছে। তাই তাদের প্রস্তাব হচ্ছে দেশের সকল সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থাগুলোকে সমবায়ের মাধ্যমে পরিচালিত করা হোক। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এমন কি ইত্তেফাক, সংবাদ, বাংলার বাণীও শ্রমিক সমবায়ের হাতে তুলে দেয়ার কথা বলা হয়।
আমার ধারণা একটি ভিন্ন বিবেচনা থেকেও সাংবাদিক ইউনিয়ন এ প্রস্তাব উত্থাপন করেছে। বিবেচনাটি হচ্ছে তাদের চাকরির শর্ত এবং মালিকদের সম্পর্কে তিক্ত অভিজ্ঞতা। পৃথিবীর এই এলাকায় শিল্প হিসেবে সংবাদপত্র গড়ে ওঠেনি। কেউ রাজনৈতিক লক্ষ্যে এবং সেই অর্থে ব্যবসায়িক স্বার্থে পত্রিকা বের করেছে। একমাত্র আজাদ ও মর্নিং নিউজই পাকিস্তান সৃষ্টির আগে জন্ম নিয়েছে। এদের একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল। ইত্তেফাক, সংবাদও রাজনৈতিক বিবেচনায়ই জন্ম নিয়েছিল। অবজারভার, পূর্বদেশ হামিদুল হক চৌধুরী তার ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যেই প্রকাশ করেছিলেন। এর কোনো পত্রিকায়ই সাংবাদিক ও কর্মচারিরা বেঁচে থাকার মতো বেতন পেত না। এই পটভূমিতে পাকিস্তান সরকার একটি বেতন বোর্ড গঠন করেছিল। এই বেতন বোর্ডের সুপারিশ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৬১ সালে। কিন্তু তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রায় কোনো সংবাদপত্রেই এই বেতন বোর্ডের সুপারিশ কার্যকর করা হলো না। এই নিয়ে বারবার তাদের আন্দোলন করতে হয়েছে। তখন অধিকাংশ সাংবাদিক কর্মচারীর বেতন ছিল ৫০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে। সেই বেতনও নিয়মিত দেয়া হতো না। ৪/৫ কিস্তিতে এক মাসের বেতন নিতে হতো। সাংবাদিক শব্দটি ছাড়া এ পেশায় তেমন মর্যাদা ছিল না। আমিও ১৯৫৯ সালে ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম ১০০ টাকা বেতনে।
১৯৬১ সালে বেতন বোর্ড সুপারিশের পর কিছুটা পরিবর্তন দেখা দেয়। নতুন পত্রিকাগুলো বেতন বোর্ডের রোয়েদাদ অনুযায়ী বেতন দিতে শুরু করে। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত দৈনিক জেহাদ বা ৬৪ সালে প্রকাশিত দৈনিক পাকিস্তান বেতন বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী বেতন দিতে শুরু করে। তবুও সংবাদ আজাদের অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি। এর মধ্যে সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে নতুন বেতন বোর্ড গঠনের দাবি উঠতে থাকে। বলা হয় যে, ১৯৬১ সালে প্রণীত বেতন বোর্ডের সুপারিশ অনুযায়ী নির্ধারিত বেতনে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাই নতুন বেতন বোর্ড ও নতুন বেতন কাঠামো চাই। ১৯৬১ সালে প্রথম বেতন বোর্ডের সুপারিশে ৫ বছর পর নতুন বেতন বোর্ড গঠনের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে সরকারের কোনোই উদ্যোগ ছিল না। ফলে পাকিস্তানব্যাপী আন্দোলন হয় এবং আমার যতদূর মনে আছে ১৯৬৯ সালে পাকিস্তান সরকার দ্বিতীয় বেতন বোর্ড গঠন করে। নতুন নতুন বোর্ডের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের অন্তর্বর্তীকালীন ভাতা মঞ্জুর করা হয়। কিন্তু কোনো মালিকই সেকালে এই ভাতা দিতে রাজি হয়নি। ফলে ১৯৭০ সালের প্রথমদিকে সাংবাদিকদের এই অন্তর্বর্তীকালীন ভাতার জন্যেই দীর্ঘদিনের জন্যে ধর্মঘটে যেতে হয়। সেই ধর্মঘটের অবসান হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয় বেতন বোর্ডের সুপারিশ তো দূরের কথা, প্রথম বেতন বোর্ডের সুপারিশও তখন কোনো কোনো পত্রিকায় কার্যকর হয়নি। এর মধ্যে স্বাধীনতার সংগ্রাম এগিয়ে আসে। দেশ স্বাধীন হয়। দুটি সংবাদ সংস্থা ও ৬টি পত্রিকা মালিকবিহীন হয়ে যায় এবং স্বাভাবিকভাবে সাংবাদিক ও কর্মচারীর মধ্যে ভয় ও শঙ্কার সৃষ্টি হয়। তাদের মধ্যে ভবিষ্যতের কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা ছিল না। এদের মধ্যে দৈনিক বাংলা, মর্নিং নিউজ প্রেস ট্রাস্টের কাগজ ছিল। ফলে এ দুটি পত্রিকার সাংবাদিক ও কর্মচারীর বেতনের কোনো অসুবিধা হয়নি। পূর্বদেশ ও অবজারভারের অর্থনৈতিক কাঠামো মজবুত ছিল। ফলে সেখানেও বেতন হয়েছে। এপিপি-এর পরিবর্তিত নাম বিএসএস। পাকিস্তান আমলে, এপিপি সরকারি সংস্থা ছিল। সেই সুবাদে বিএসএস-এর সাংবাদিক ও কর্মচারীদের বেতনের একটি হিল্লে হয়ে যায়। কিন্তু আজাদ, স্বদেশ এবং পিপিআই ছিল বেসরকারি মালিকানায়। এখানে কোনোদিনই সাংবাদিক কর্মচারীদের বেতনের নিশ্চয়তা ছিল না। তাই এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক ও কর্মচারীদের বেতন হচ্ছিল না। সে এক অস্বস্তিকর ও দুঃখজনক পরিস্থিতি।
এ অবস্থায় আমি দেশে ফিরেছি এবং আমার মনে হয়েছে এ তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই ইউনিয়নের পক্ষ থেকে নতুন প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে সমস্ত সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থা সমবায়ী মালিকানায় নেয়ার জন্যে। আমি দেশে ফিরে আর একটি ঘটনাও লক্ষ করলাম। লক্ষ করলাম যে শুধুমাত্র সাংবাদিক ইউনিয়ন নয়। সংবাদপত্রের শিল্পের সাথে জড়িত তিনটি ইউনিয়ন যৌথভাবেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই তিনটি ইউনিয়নের যৌথভাবে বসে আন্দোলনের একটি পটভূমি আছে। এ নিয়ে এখন অনেক বিতর্ক আছে। অনেক সময় এ বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু আমি। বিতর্ক হচ্ছে সংবাদপত্রের সকল কর্মচারীদের জন্য একই বেতন বোর্ড গঠন এবং সংবাদপত্রের সংশোধনী বিভাগের অর্থাৎ প্রুফ রিডারদের সাংবাদিক করা নিয়ে। আমার অনেক বন্ধুরা বলে থাকেন এ জন্য নাকি আমিই দায়ী। পৃথিবীর কোনো দেশেই নাকি প্রুফ রিডাররা সাংবাদিক নন এবং সংবাদপত্রের সকল কর্মচারীদের জন্যে একটি মাত্র বেতন বোর্ড নেই। সর্বত্রই সাংবাদিকদের জন্যে পৃথক বেতন বোর্ড। এ ক্ষেত্রে আমি বিতর্কে যাব না। শুধু সেকালের কিছু ঘটনা তুলে ধরব। ষাটের দশকের কথা। আমি তখন জেলে। সাংবাদিক ইউনিয়ন সম্পর্কে তখন আমার বেশি কিছু জানা নেই। জেলের বাইরে এসে শুনলাম আমাদের ইউনিয়নে গঠনতন্ত্র সংশোধন করে প্রুফ রিডারদের সাংবাদিক করা হয়েছে। অনেকে মনে করেন তৎকালীন ইউনিয়ন নির্বাচনে জিতবার জন্য প্রুফ রিডারদের সদস্যপদ দিয়েছেন। আমি কোনো দিন এ বিতর্কে যাইনি। লক্ষ্য করলাম এ ব্যাপারে তীব্র মতানৈক্য আছে। পূর্ব পাকিস্তানে প্রুফ রিডারদের সাংবাদিক করা হলেও পশ্চিম পাকিস্তানে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়া হলো। পশ্চিম পাকিস্তানে সাংবাদিক নে বৃন্দ উর্দু পত্রিকার প্রুফ রিডারদের সাংবাদিক বলে গণ্য করতে রাজি নয়। তাই পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের দুই অংশে দুই রীতি চালু আছে। পূর্ব পাকিস্তানে প্রুফ রিডাররা সাংবাদিক কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানে প্রুফ রিডার সাংবাদিক নয়। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত কোনো মীমাংসাই হয়নি। পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সর্বশেষ বৈঠক বসেছিল ১৯৬৯ সালে ইসলামাবাদে। ওই বৈঠকে কে জি মুস্তফা সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হন মিনজাহ বার্না। ওই সম্মেলনে এই সঙ্কট সমাধানের জন্যে আমি একটি প্রস্তাব তুলেছিলাম। আমাকে সমর্থন করেছিলেন কে জি মুস্তফা। পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করা হয়। তাঁদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ব্যাপারে তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তাঁদের আরো এক বছর সময় দেয়া হোক। সে সময় অতিবাহিত হওয়ার আগেই পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভিন্ন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সুতরাং প্রুফ রিডাররা পূর্ব পাকিস্তানে সাংবাদিক এবং পশ্চিম পাকিস্তানে সাংবাদিক নয় এই সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় এবং বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচন হয়েছে। সে নির্বাচনে প্রুফ রিডাররা সাংবাদিক হিসেবে অংশগ্রহণ করেছে। তাই তাদের বাদ দেওয়ার কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। পরবর্তীকালেও বারবার এ প্রশ্নে আমাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। অথচ ব্যক্তিগতভাবে আমার কিছু করার ছিল না।
