ইউনিয়নের প্রথম দিকে তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো না। সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে দীর্ঘদিন কমিউনিস্ট পার্টির প্রভাব অক্ষুণ্ণ ছিল। তাদের প্যানেলই জয় লাভ করতো। কখনো কখনো বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন হয়ে যেতো।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি পরিস্থিতি পরিবর্তন হয়। কমিউনিস্ট পার্টিতে মস্কো বনাম পিকিং দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। সাংবাদিক ইউনিয়নেও আওয়ামী লীগের রাজনীতি আত্মপ্রকাশ করতে থাকে। জামাতে ইসলামের পত্রিকা দৈনিক
সংগ্রাম আত্মপ্রকাশ করে। এছাড়া সেকালে কিছু ছিল সরকারপন্থী এবং মালিকপন্থী সাংবাদিক। ফলে ষাটের দশকের শেষ দিকে ইউনিয়নের নির্বাচনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো এবং তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেই দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচন হয়। নির্বাচনে আলী আশরাফ সভাপতি ও কামাল লোহানী সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। আমি নির্বাহী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হই।
ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত নেতা ছিলেন খোন্দকার গোলাম মুস্তফা, সিরাজউদ্দীন হোসেন, খন্দকার আবু তালেব, আতাউস সামাদ, এবিএম মুসা নেতৃত্বে থাকলেও ইউনিয়নের চেয়ে তারা প্রেস ক্লাবকেই বেশি পছন্দ করতেন।
একাত্তরের সংগ্রামে সব চিত্র পাল্টে গেল। সিরাজউদ্দীন হোসেন নেই, খন্দকার আবু তালেব নেই, শহীদুল্লাহ কায়সার নেই, আতাউস সামাদ আছেন তবে তাঁর নেতৃত্ব নিতে অনীহা। খোন্দকার গোলাম মুস্তফা কেন্দ্রীয় ইউনিয়নের নেতা হিসেবে ইউনিয়নকে বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন। কিন্তু এই ইউনিয়নে তাঁর পক্ষে আসা তখন সম্ভব ছিল না। এছাড়া দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি চাচ্ছিলেন কোনো দেশের রাষ্ট্রদূত হতে। তিনি রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন। কিন্তু সরকারি চাকরিতে যাবার আগে যতদূর সম্ভব ইউনিয়নকে চালু রাখতে সক্রিয়ভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন। অর্থাৎ দেখা গেল দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইউনিয়নের পূর্বতন নেতৃত্বের কেউই আর নেই। এর মধ্যে আর একটি কাণ্ড ঘটালেন ইউনিয়নের সভাপতি আলী আশরাফ। সরকার তাঁকে দৈনিক বাংলার প্রশাসক নিযুক্ত করলেন। একজন প্রশাসক ইউনিয়নের সদস্য হতে পারেন না। ফলে ইউনিয়নের সদস্যপদ থেকে তাঁকে সরে দাঁড়াতে হলো। ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হলেন সহসভাপতি গিয়াস উদ্দীন আহম্মদ। তিনি অবজারভারের রিডিং সেকশনে ছিলেন। অর্থাৎ ইউনিয়নেরই খোল-নলচে পাল্টে গেলো। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক দু’জনেই ভারপ্রাপ্ত। আর এ ভারপ্রাপ্তের খেলায় আমি যে কী করে ঢুকেছিলাম সে কথা এখন আর আমার মনে নেই। তবে সব দায়িত্ব যেন আমার ঘাড়ে এসে পড়ল। হয়তো বা কারো ধারণা থাকতে পারে, আমি গোপালগঞ্জের অধিবাসী বলে প্রধানমন্ত্রীর কাছাকাছি লোক হব এবং আমাকে সামনে নিয়ে এগোলে লাভ হবে। সেই লাভ-লোকসানের হিসাব মিলল না রাজনীতি করা নির্মল সেন-এর বেলায়।
বন্ধু আহমেদুর রহমান তখন প্রতিষ্ঠিত সাংবাদিক। ভীমরুল ছদ্মনামে কলাম লিখতেন ইত্তেফাকে। তাঁর কলাম মিঠেকড়া সেকালে খুবই জনপ্রিয় ছিল। শেষ পর্যন্ত তার অনুরোধেই ইত্তেফাকের সহকারী সম্পাদক হয়েছিলাম। তবে জেলে যাওয়া ঠেকানো যায়নি। আমি ইত্তেফাকে যোগদানের এক সপ্তাহের মধ্যে ইত্তেফাকের সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া গ্রেফতার হয়ে যান। আমি জেলে যাই এক মাস পর।
বছর তিনেক পর জেলখানা থেকে এসে ইত্তেফাকের মাসিক একশ’ টাকার চাকরিটা আর হয়নি। দৈনিক জেহাদে চাকরি দিয়েছিলেন মোজাম্মেল হক। সেই জেহাদও বন্ধ হয়ে গেলো ১৯৬৩ সালে। শেখ সাহেবের অনুরোধে যোগ দিয়েছিলাম সোনার বাংলায়। সোনার বাংলা থেকে মোজাম্মেল দা টেনে এনেছিলেন দৈনিক পাকিস্তানে। তবে সে চাকরির পটভূমি আরো বড়। ইতোপূর্বে সে কথা আমি লিখেছি।
সেই দৈনিক পাকিস্তানে একাত্তরের ৯ মাস আমি চাকরি করিনি। যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে দেখলাম আমার চাকরিটি নেই। অর্থাৎ আমার শূন্য পদে ইতিমধ্যে লোক নেয়া হয়ে গেছে। এ সময় দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক সানাউল্লা নূরী, নতুন পত্রিকা দৈনিক গণবাংলার সম্পাদক হয়ে গেলেন। ওই শূন্য পদে দৈনিক বাংলায় আমি সহকারী সম্পাদক রূপে চাকরি পেলাম। এই ধারাবাহিক চাকরির সুবাদে আমার রাজনৈতিক পরিচয়টা যেন স্মৃতির আড়ালে চলে গেল। বড়ো হয়ে দেখা দিল সাংবাদিক পরিচয়। তখন অনিকেত ছনামে দৈনিক বাংলায় আমি কলাম লিখতাম। এ কলাম লেখাও সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে আমাকে চরম বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেয়। একটি দেশ স্বাধীন হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের কথা বলা হচ্ছে। বেসরকারি খাতের হাল কী হবে কেউ জানে না। ইতোমধ্যে গোটা পাঁচ ছয়েক পত্রিকা এবং দুটি সংবাদ সংস্থার দায়িত্ব সরকারের ওপর ন্যস্ত হয়েছে। পত্রিকা কয়টি হচ্ছে বাংলাদেশ অবজারভার, পূর্বদেশ, দৈনিক বাংলা, মর্নিং নিউজ, দৈনিক স্বদেশ ও আজাদ। সংবাদ সংস্থা হচ্ছে এপিপি ও পিপিআই। এপিপি অর্থাৎ অ্যাসোসিয়েট অব প্রেস পাকিস্তান আর পিপিআই হচ্ছে পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল। এ ছয়টি পত্রিকা এবং দুটি সংবাদ সংস্থার মূল মালিক নেই। অপরদিকে উর্দু দৈনিক পাসবান বন্ধ হয়ে গেছে। পাসবান অফিস দৈনিক বাংলার বাণী অফিসে পরিণত হয়েছে। আর এ সময় অনিবার্য কারণে সাংবাদিক ইউনিয়নের পুরনো নেতাদের মধ্যে কেউই নেই।
