এবার ভিন্ন আলোচনায় আসা যাক। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের অন্যান্য সমস্যার মতো সাংবাদিকদেরও এক নতুন সমস্যায় পড়তে হয়। সেকালে জামাতে ইসলামের মুখপত্র সংগ্রাম’ ব্যতীত কোনো পত্রিকাই পাকিস্তান সরকারকে সমর্থন দেয়নি। এমনকি পাকিস্তান প্রেস ট্রাস্ট পরিচালিত দৈনিক পাকিস্তান বা মর্নিং নিউজের অধিকাংশ বাঙালি সাংবাদিক কর্মচারী বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল। কিন্তু প্রকাশ্যে কিছু বলার সুযোগ ছিল না। অনেকেই সংগ্রামের ৯ মাস কাজে আসেনি। অনেকে সীমান্তের ওপারে গিয়েছে। আবার অনেকে দেশে থেকেছে। কিন্তু কাজে যোগ দেয়নি।
সেকালে পাকিস্তানে একটি কেন্দ্রীয় সংগঠন ছিল সাংবাদিকদের। সংগঠনের নাম পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন। সেকালের পূর্ব পাকিস্তানে তার দুটি অঙ্গসংগঠন ছিল। একটি ঢাকা কেন্দ্রীয় পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন। অপরটি চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়ন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ইউনিয়নে সমস্যা দেখা দিলো। পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন থাকল না। আমি ভারত থেকে ঢাকা ফিরতে ফিরতে পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের নাম বাংলাদেশ সাংবাদিক ইউনিয়ন হয়ে গেল। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি আলী আশরাফ বাংলাদেশ সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হলেন। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সহ-সম্পাদক গিয়াস কামাল চৌধুরী হলেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। কারণ সাধারণ সম্পাদক কামাল লোহানী যুদ্ধকালে স্বাধীন বাংলা বেতারে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সুবাদে তিনি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ বেতারে চলে গেলেন। এ সময় আমি ঢাকায় ফিরে দেখলাম এক ভিন্ন অবস্থা। আনুষ্ঠানিকভাবে আমি ইউনিয়নের কোনো নেতৃত্বের পদে ছিলাম না। তবুও স্বাধীনতার পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দলীয় রাজনীতি থেকে সাংবাদিক ইউনিয়ন করাই আমার কাছে মুখ্য হয়ে উঠল। দেশ স্বাধীন হয়েছে। পত্রিকার জগতে বেসামাল অবস্থা। পত্রিকা বলতে ছিল দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ, পূর্বদেশ, দৈনিক পাকিস্তান, দৈনিক আজাদ, পাকিস্তান অবজারভার, দৈনিক পাসবান, দৈনিক মর্নিং নিউজ, দি পিপলস ও দৈনিক পয়গাম।
২৫ মার্চের হামলা শুরুর পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী দৈনিক ইত্তেফাক, দি পিপলস ও দৈনিক সংবাদ পুড়িয়ে দেয়। পরবর্তীকালে ইত্তেফাক সামরিক সরকারের সহযোগিতা নিয়ে যুদ্ধের ৯ মাসের মধ্যেই প্রকাশিত হয়। সংবাদ, দি পিপলস যুদ্ধকালে আর বের হয়নি। পাকিস্তান প্রেস ট্রাস্টের পত্রিকা দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ ওই ৯ মাসে চালু ছিল। অবজারভার ও পূর্বদেশের মালিক হামিদুল হক চৌধুরী ও আজাদের মালিক পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাথে সহযোগিতা করে। পাসবান উর্দু দৈনিক। দৈনিক পয়গাম তৎকালীন গভর্নর মোনেম খানের মালিকানায়। তাই পত্রিকাও চালু ছিল। তবে এই বন্ধ ও ভোলা থাকার ভিত্তিতে তৎকালে এ পত্রিকা সাংবাদিক কর্মচারীদের সেকালের ভূমিকা ব্যাখ্যা করা যায় না। চাকরি করতে গিয়ে মারা পড়েছেন ইত্তেফাকের সিরাজউদ্দিন হোসেন। মর্নিং নিউজের আবুল বাশার, পূর্বদেশের আনম গোলাম মুস্তফা। অবজারভারের লাডু ভাই। চাকরি না করে মারা গেছেন সংবাদের শহীদুল্লাহ কায়সার। ফলে দেশ স্বাধীন হবার পর সংবাদপত্র জগত ছিল এক শোকের জগত-বিদ্বেষের জগত, অনিশ্চিত জগত। কী হবে পত্রিকা জগতে কারো জানা ছিল না।
আমি দেশে ফিরতে ফিরতে কিছুটা পরিবর্তন হয়ে গেছে। দৈনিক পাকিস্তান ও পাকিস্তান অবজারভারের শক্তিশালী ইউনিয়ন থাকায় তেমন অসুবিধা হয়নি। পাকিস্তান অবজারভার নাম পরিবর্তন করেছে। নেতৃত্বে এসেছে পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি খোন্দকার গোলাম মুস্তফা। সম্পাদক হিসেবে এসেছেন আবদুস সালাম। নতুন নাম হয়েছে বাংলাদেশ অবজারভার। দৈনিক পাকিস্তান নাম নিয়েছিল দৈনিক বাংলাদেশ। প্রতিবাদ এলো বগুড়া থেকে। বগুড়ায় দেশ স্বাধীন হবার পূর্বেই এ নামে একটি দৈনিক পত্রিকা ছিল। তাই দৈনিক বাংলাদেশ-এর পরিবর্তে দৈনিক পাকিস্তান হলো দৈনিক বাংলা। সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীনকে সরিয়ে দেয়া হলো। প্রধান সম্পাদক হলেন হাসান হাফিজুর রহমান, নির্বাহী সম্পাদক হলেন তোয়াব খান। তবে প্রথমে তোয়াব খানই সম্পাদক হয়েছিলেন। মর্নিং নিউজ থেকে গেল। আজাদ পয়গাম-এ প্রকাশক দেয়া হলো। পয়গামের নাম হলো স্বদেশ।
আমি কখনো তেমনভাবে সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলাম না। কখনো কখনো ইউনিয়নের সহসভাপতি কিংবা কোষাধ্যক্ষ ছিলাম। ১৯৬২ সালে জেলখানা থেকে বেরুবার পর বরাবরই আমি নির্বাহী পরিষদের সদস্য ছিলাম। আমি বারবার নির্বাচিত হতাম। কিন্তু কোনো দলে কোনো প্যানেলে সদস্য ছিলাম না। আমি স্বতন্ত্র সদস্য হিসেবেই দাঁড়াতাম। তবে দীর্ঘদিন কোষাধ্যক্ষের পদে থাকায় এই পদটিতে তেমন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতো না।
এককালে সাংবাদিক ইউনিয়নে তেমন নির্বাচন হতো না। পত্রিকার সংখ্যা ছিল কম। সদস্য সংখ্যাও তেমন নয়। সর্বজনীন ভোটাধিকারও ছিল না। বিভিন্ন ইউনিট থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই নির্বাহী কমিটি নির্বাচন করত। পরবর্তীকালে সে পদ্ধতির পরিবর্তন হয়। সর্বজনীন ভোটে নির্বাচনের পদ্ধতি চালু হয়। শুধুমাত্র ফেডারেল ইউনিয়নের ক্ষেত্রে প্রতিনিধিদের ভোটে নির্বাচন হওয়ার পদ্ধতি বহাল থাকে।
