কলকাতায় গিয়ে শুনেছি-স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক রূপরেখা নিয়ে ভাবছেন। অর্থনৈতিক কাঠামো সম্পর্কে কমিটিও গঠন করেছিল। কিন্তু সে হচ্ছে অনেক পরের কথা। তাই সুস্পষ্ট করে বলা যায়, নেতা থেকে কর্মী পর্যন্ত সকল মহলকেই ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তানি হামলা আমাদের এ যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিল। সবাই স্বাধীনতা যুদ্ধটাকে একটি শ্লোগান বা কথার কথা বলে মনে করেছিল। কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতার সিদ্ধান্ত বা প্রস্তুতি না থাকার জন্যেই ২৫ মার্চের রাতে অসংখ্য মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল।
এ পরিস্থিতিতে দেশ স্বাধীন হওয়ার বেশ কয়েক মাস পর মুজিববাদ শ্লোগানটি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ শ্লোগান ছিল বাংলাদেশ ছাত্রলীগের। ছাত্রলীগের এককালীন প্রভাবশালী নেতা শেখ ফজলুল হক মনি তখন দৈনিক বাংলার বাণীর সম্পাদক। তিনি বাংলার বাণীতে একটি উপ-সম্পাদকীয় লেখেন। তাঁর লেখার শিরোনাম ছিল আইনের শাসন নয়, মুজিবের শাসন চাই। তার এ লেখার তীব্র বিরূপ সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছিল ভিন্ন কথা। আমার মনে হচ্ছিল ছাত্রলীগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করছে। দর্শনের জগতে সমাজ পরিবর্তনের জন্যে দুটি তত্ত্বই প্রচলিত ছিল। একটি হচ্ছে পুঁজিবাদ অপরটি সমাজবাদ। পুঁজিবাদী সমাজে মুক্তি নেই। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের সংগ্রামে একটি মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ছিল। সে আকাক্ষা শুধুমাত্র পাকিস্তান থেকে বন্ধন মুক্তির আকাক্ষা নয়, শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষাও। সাধারণ মানুষ বাংলাদেশের সংগ্রামে সেই স্বপ্ন দেখেছিল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে সমাজতন্ত্রের কথা বলতে হয়। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের শ্রেণি চরিত্রের পরিপন্থী। ফলে অবস্থাটা দাঁড়াল এমন যে শোষণমুক্তির কথা বলতে হবে আবার সমাজতন্ত্রের কথা বলা যাবে না। আমার ধারণা এ পরিস্থিতিতে জোড়াতালি দেয়ার জন্যে মুজিববাদের কথা বলা হয়েছিল। রাজনৈতিক বিচারে প্রথম দিকে মুজিববাদ ছিল গণতান্ত্রিক সমাজবাদেরই আর এক সংস্করণ। অর্থাৎ আমরা সমাজতন্ত্রের কথা বলব কিন্তু বৈপ্লবিক সমাজ পরিবর্তনের কথা বলব না। সমাজ যেমন আছে তেমনই থাকবে। যদিও পরবর্তীকালে মুজিববাদ উচ্চারিত হয়নি। সংবিধানে সমাজতন্ত্র সমাজ পরিবর্তনের সমাজতন্ত্র নয়। এ সমাজতন্ত্র ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের কোটি কোটি মানুষকে ভাওতা দেয়ার জন্যে এবং সমাজতন্ত্রের নামে স্বপ্ন দেখাবার লক্ষ্যে।
তবুও আমার মনে হয়েছে–যে গ্রুপের পক্ষ থেকেই এ শ্লোগান দেয়া হোক না কেন, তাদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে দীর্ঘদিনের সংযোগ ছিল। তাদের কেউ এ ব্যাপারে ভেবেছে। স্লোগান দিয়েছে। গল্প, কবিতা লিখেছে। মিছিল করেছে। এবং বালকসুলভ চপলতায় কখনো এ সংগ্রামের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারেনি। নির্ণয় করতে পারেনি স্বাধীনতা সংগ্রামের শত্রু ও মিত্র। তারা ভাবতেই চায়নি, জাতিসংঘের জন্মের পর বিপ্লবাত্মক রাজনীতি ছাড়া আলাপ-আলোচনা ও নির্বাচনের রাজনীতি দিয়ে একটি দেশ স্বাধীন করা যায় না এবং সে ক্ষেত্রেও পরাশক্তিকে উপেক্ষা করা যায় না।
এছাড়া ওলন্দাজের হাত থেকে ইন্দোনেশিয়ার মুক্তি কিংবা ফরাসির কবর থেকে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা যে সহজে আসেনি একথা মেধা ও বুদ্ধিসম্পন্ন নেতাদের বোঝানোর প্রয়োজন যে হয় না তা বলাই বাহুল্য। অথচ সবকিছু জেনে শুনেই সেকালের নেতৃত্ব আলোচনা ও কথার মারপ্যাঁচে একটি দেশ স্বাধীন করার চেষ্টা করেছে। সেই চেষ্টার রূপরেখা বা পরিণতি সম্পর্কে আওয়ামী লীগসহ কোনো দলেরই সুস্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। একটি মাত্র সংগঠনের মুজিববাদ ও পরবর্তীকালে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের শ্লোগান ছাড়া কেউ দাবিও করতে পারেন না, পঁচিশে মার্চের আগে দলগতভাবে আমরা দেশ স্বাধীন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ করেছিলাম। নেতা ও কর্মীদের সচেতন করেছিলাম। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অংশগ্রহণের মানসিকতা গঠন করেছিলাম। অর্থাৎ সব মিলিয়ে বলা যায় ২৫ মার্চের হামলার পূর্বে কোনোদল বা কোনো ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি, আমরা এ সংগ্রামকে স্বাধীনতা সংগ্রামে পরিণত করব। এ সংগ্রাম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শেষ সংগ্রাম, ইতিহাসে তেমন কোনো স্বাক্ষর নেই বলে আমার দৃঢ় ধারণা।
জানি আমার এ বক্তব্যে অনেকে একমত হবেন না। আমার তীব্র সমালোচনা করবেন। আমি তাই এ প্রশ্নটি ভবিষ্যতের জন্যে রেখে যেতে চাই। উৎসাহী গবেষকদের জন্যে এ প্রশ্নটি উত্থাপন করলাম। যারা প্রতিদিন ইতিহাস বিকৃত হচ্ছে বলে শোরগোল করছেন তাঁদের বলব আমার এ কথাগুলো ভেবে দেখুন। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই ২৫ মার্চের ঘটনার পূর্বে হয়তো তাত্ত্বিকভাবে অনেকে বলেছেন, এবারই দেশ স্বাধীন হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু তবুও কেউ বা কোনো দলও এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হলে জনসাধারণের সবকিছু জানা থাকলে ন্যূনতম প্রস্তুতি থাকলেও স্বাধীনতার ২৭ বছর পরে আজো গ্রামবাংলায় ৭১ সালকে হিড়িক বা গণ্ডগোলের বছর বলা হতো না।
