কিন্তু হলো না। একটা চরম গণহত্যা নেমে এল। লাখো লাখো অপ্রস্তুত মানুষ জীবন দিল। এক সময় আশ্রয়ের আশায় সীমান্ত পাড়ি দিল। তবে নির্জলা সত্য, সীমান্ত পাড়ি দিতে কেউ কাউকে নির্দেশ দেয়নি। অধিকাংশ মানুষ সীমান্তের ওপারে গিয়ে আশ্রয় নিল। আর এক সময় ভারতের সহযোগিতায় যুদ্ধ শুরু করল বাংলাদেশকে স্বাধীন করার জন্যে।
এ যুদ্ধের সময় আমিও ভারতে গিয়েছি। বারবার আসা যাওয়া করেছি। আমাদের ছেলেরাও ট্রেনিং নিয়েছে এবং যুদ্ধ করেছে। যে কথাটি আমি আগে বুঝিনি, ভারতে গিয়ে আমাকে সে কথাটি বুঝতে হয়েছে। ২৫ মার্চের পূর্বে আমার ধারণা ছিল শেখ সাহেবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ কিছুতেই বাংলাদেশ স্বাধীন করতে পারবে না। কারণ নীতিগতভাবে আওয়ামী লীগ সশস্ত্র সংগ্রামে বিশ্বাসী কোনো সংগঠন নয়। অথচ সশস্ত্র সংগ্রাম ব্যতীত বাংলাদেশ স্বাধীন করা সম্ভব নয়। সে সত্য ছিল যখন দিনের সূর্যের মতো স্পষ্ট। ভারতে গিয়ে বুঝলাম আমার ব্যাখ্যা সঠিক হলেও আমি জানতাম না, এ যুদ্ধের আর একটি দিক আছে। সে দিক ভারতের সহযোগিতা। ভারতের সহযোগিতার দিকটি আমার জানা ছিল না। ভারতে গিয়ে স্পষ্ট হয়ে গেল, এ যুদ্ধের নিয়ামক শক্তি আমরা নই।
আমার ধারণা, এ যুদ্ধ নিয়ে প্রথম দিকে আওয়ামী লীগসহ প্রায় সকল মহলে বিভ্রান্তি ছিল। এ যুদ্ধ করা করবে, কোনো দল কবে। এ যুদ্ধের যে মিত্র তা আদৌ স্থির ছিল না। এপ্রিলে আসতলার পৌঁছে এ বিভ্রান্তির চরম রূপ দেখলাম। ভারতের মাটিতে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরম রূপ নিয়েছে। ছাত্রলীগ তাজউদ্দিন সরকারকে সমর্থন করছে না। ভারতের মাটিতে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি আত্মপ্রকাশ করেছে। মুজাফফর (ন্যাপ) সভা সমাবেশ করছে যুদ্ধের জন্যে যুক্তফ্রন্ট গঠনের দাবিতে। পিকিংপন্থীরা মওলানা ভাসানীকে সামনে রেখে সংগ্রামের জন্যে কমিটি গঠন করেছে। বিপদে পড়েছি আমরা। আমরা পিকিংপন্থী নই, মস্কোপন্থীও নই। নিজেদের লেনিনপন্থী বলে দাবি করি। আমাদের ছেলেরাই বাংলাদেশ সীমান্তে নদীয়ার গেদেতে প্রথম মুক্তিবাহিনী শিবির স্থাপন করে। আমাদের শিবির জেনারেল ওসমানী ও তাজউদ্দীন পরিদর্শন করেন। কিন্তু আমাদের সাথে ভারতের আরএসপির সম্পর্ক থাকায় মুজিবনগর সরকার ওই শিবিরে সাহায্য সহযোগিতা বন্ধ করে। তখন আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, এ যুদ্ধ কোথায় যাচ্ছে এবং কাদের নেতৃত্বে শেষ হচ্ছে! শেষ পর্যন্ত সমস্যার জোড়াতালি দিয়ে এক সমাধান করা হয়। মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়। সেই পরিষদে স্থান হয় কমরেড মনি সিং, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ, মনোরঞ্জন ধর এবং মওলানা ভাসানীর অর্থাৎ দেখাবার চেষ্টা করা হয়, সর্বদলীয় এবং জাতীয় ভিত্তিতে এ যুদ্ধ পরিচালিত হচ্ছে এবং এই পরিবেশে ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর যুদ্ধ শেষ হয়।
আমি বাড়ি ফিরলাম ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। ১০ জানুয়ারি শেখ সাহেব ফিরলেন। ছাত্রলীগে তখন বিতর্ক তুঙ্গে। বাংলাদেশে তখন একটি নতুন শ্লোগান শোনা গেলো। শ্লোগানটি হচ্ছে–বিশে এসেছে নতুনবাদ, মুজিববাদ, মুজিববাদ। খোন্দকার ইলিয়াস মুজিববাদ সম্পর্কে একটি বই লিখে ফেললেন। বইয়ের দাম ৩০ টাকা। মুজিববাদের স্লোগান শুনে আমার যেন চমক ভাঙল। এ ধরনের রাজনৈতিক আদর্শের কথা পৃথিবীর কোনো অভিধানে নেই। ছাত্রলীগের যে অংশটি এই শ্লোগান দিল তারা গণতান্ত্রিক সমাজবাদে বিশ্বাসী বলে জানতাম। তত্ত্বের দিক থেকে বিশ্ব প্রধানত দুটি ভাগে বিভক্ত বলে জানি। একটি পুঁজিবাদ অপরটি সমাজবাদ। তবে সমাজতন্ত্র লক্ষ্য হলেও সেই লক্ষ্যে পৌঁছাবার পথ নিয়ে অনেক বিভক্তি আছে। মোটামুটিভাবে যারা গণতান্ত্রিক উপায়ে সংসদের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের গণতান্ত্রিক সমাজবাদী বলে অভিহিত করা হয়। যেমন ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমিক দল বা ভারতের এক সময় জয় প্রকাশের নেতৃত্বে সমাজতন্ত্রী দল। সতন্ত্রে বিশ্বাসী অপর অংশটি বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলে বিশ্বাসী। তারা বিশ্বাস করে বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে রাষ্ট্রযন্ত্র চূর্ণ করতে না পারলে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। বিশ্বাস ও আদর্শের জগতে এ পরিস্থিতিতে মুজিববাদের স্লোগান আমাকে কৌতূহলী করে তুলল। অন্তত আমার মনে হলো ৭১-এ সংগ্রামের মধ্যে একটি স্রোত অন্তত ছিল যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলেছে। স্বাধীনতা চেয়ে এবং শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বতন্ত্র প্রমাণের জন্যে মুজিববাদের কথা বলেছে। কী বা কেন সেই মুজিববাদ আমার ধারণা শেখ সাহেব এ মুজিববাদ সম্পর্কে তেমন অবহিত ছিলেন না। এখানটাই ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আর এক সঙ্কট।
এ পরিস্থিতিতে সকলে চমকে গিয়েছিল–১৯৭১ সালের ১ মার্চ। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সেই দিন জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আদৌ এ পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পারেনি। ফলে ১ মার্চের পর নাম পাল্টাবার হিড়িক পড়ে যায়। দলের নামের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তান শব্দটি তুলে বাংলাদেশ বসানো হলো। শুধু আমাদের তেমন কোনো সমস্যা ছিল না। আমাদের দলের নাম ছিল শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল। দল গঠনকালে আমরা পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করেছিলাম। দাবি করেছিলাম পাকিস্তানের বিভিন্ন অংশের স্বাধীন স্বত্ব স্বীকার করে নিয়ে একটি কনফেডারেশনে রূপান্তর করা। কিন্তু সে আন্দোলন গড়ে তোলার আগেই একাত্তরের সংগ্রাম এসে গেল। অন্য সকলের মতোই সে যুদ্ধে আমরা জড়িয়ে পড়লাম। যুদ্ধ সম্পর্কে নতুন অভিজ্ঞতা হলো। ইতোপূর্বে সে ইতিহাস আমি লিখেছি। আমার সুস্পষ্ট ধারণা হচ্ছে, কেউ কোনো প্রস্তুতি না নিয়েই এ যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। কোনো দলের কোনো স্থির সিদ্ধান্ত ছিল না। ব্যক্তি হিসেবে অনেকের বাংলাদেশকে স্বাধীন করার আকাঙ্ক্ষা ছিল। গোষ্ঠী হিসেবে কেউ কেউ হয়তো কাজ করেছে। কিন্তু কোনো দল সুনির্দিষ্ট কর্মপন্থা নিয়ে দিনক্ষণ ঠিক করে রণকৌশল কিংবা রণনীতি নির্ধারণ করে এ সংগ্রামে যোগ দেয়নি। দেশকে স্বাধীন করার আকাক্ষা থাকতেও কেউ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে সংগ্রামে নামেনি বা এ সংগ্রাম সংগঠিত করেনি।
