যদিও ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের সহযোগিতা সকলের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। এমনকি অনাকাঙ্ক্ষিত ছিল না। অর্থাৎ সামগ্রিক বিচারে ১৯৭১ সালে পরিস্থিতির কোনো পুরো ছবি বামপন্থীদের চোখের সামনে ছিল না। এ সংগ্রাম কোথায় যাবে কেউ জানে না। কিভাবে হবে তারও কোনো প্রস্তুতি ছিল না। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই সকলে পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। সংগ্রামের রূপরেখা জানা থাকলে যে কাজটি আগে করা উচিত ছিল সে কাজটি করা হলো অনেক পরে। অর্থাৎ বামপন্থী কমিউনিস্ট নেতারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাহায্য ও সহযোগিতা করার জন্যে আবেদন জানাতে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোকে পেল অনেক পরে। তখন অনেক জল গড়িয়েছে। আমাদের সংগ্রামের নেতৃত্ব তখন ভারত সরকার তথা মুজিবনগর সরকারের হাতে।
ঐতিহাসিক কারণেই এ ঘটনা ঘটেছে। সেদিক থেকে বলা যায়, তৎকালীন বামপন্থীদের এর চেয়ে বড় কোনো ভূমিকা পালন করা সম্ভব ছিল না। তবে এ কথা সত্য, যুদ্ধে সাহায্য সহযোগিতা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বের একটি অংশ আবছা আবছা হলেও কিছুটা ধারণা ছিল। অধুনা তাঁরা বলছেন, শেখ সাহেব নাকি ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের ভারতের সহযোগিতার কথা বলেছেন এবং সেভাবেই তারা কাজ করেছেন। তাঁদের এ ব্যাপারে কোনো সুখ-দুঃখ নেই। যারা এ কথাগুলো বলেছেন তাদের আমি অবিশ্বাস করি না। তবে তারা যেভাবে কথাগুলো বলছেন, তাতে মনে হয় তাঁরা পরিস্থিতিরই সঠিক অনুধাবন করতে পারেননি। অথবা ভেবেছিলেন ভারতের সহযোগিতা ছাড়া আপোষেই সব রফা হয়ে যাবে। নইলে সমগ্র দেশবাসীকে অন্ধকারে রেখে দলে মাত্র কিছু সদস্যকে গোপনে খবরাখবর দিয়ে একটি দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম যে করা যায় না তা বলাই বাহুল্য। তবে অস্বীকার করার উপায় নেই যে এটাই আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস এবং এ খবরাখবর যারা জানতেন স্বাধীনতার পর তাদের ভূমিকা অন্য সকলের চেয়ে ভিন্নতর ছিল। অন্য কেউ না জানলেও এ মহলটি অন্তত কিছুটা হলেও জানতেন ভবিষ্যৎ সংগ্রামের কথা।
আমার এ পর্যায়ে লেখায় প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে ৭১-এর সংগ্রাম কারা করল? আমি বলেছি সামরিক-বেসামরিক আমলাদের নেতৃত্বে আগরতলা ষড়যন্ত্র নামক বিদ্রোহ হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে এ বিদ্রোহে রাজনীতিকদের কোনো ভূমিকা ছিল না। এ বিদ্রোহকে রাজনৈতিক রূপ দেয়ার জন্যে শেখ সাহেবকে এ বিদ্রোহে জড়িত করেছিল।
আমি বলেছি, রাজনৈতিক স্তরে মওলানা ভাসানী ও শেখ সাহেব শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাইলেও পাকিস্তানি কাঠামোতে এর একটা সমাধানের চেষ্টা করেছিলেন।
আমি বলেছি, রাজনৈতিক বিশ্বাস, ব্যাখ্যা এবং বাস্তব কারণে তখন বামপন্থীদের এ ধরনের আন্দোলনের নেতৃত্বে নেবার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।
আমি বলেছি, ১৯৬৯-এ অভ্যুত্থানের সময় স্বাধীনতার প্রশ্নটি সামনে আসে। তবে মুখ্যত সে প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একটি অংশ।
আমি বলেছি, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ তকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের নির্দেশে চললেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে ছাত্রলীগ যেমন দ্বিধাবিভক্ত ছিল তেমনি দ্বিধাবিভক্ত ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব। ছাত্রলীগের একটি অংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাইলেও কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্বাধীনতার দাবিতে প্রস্তাব উত্থাপন নিয়ে মতানৈক্য হয়। তবুও স্বাধীনতার প্রস্তাব গৃহীত হয়।
এই স্বাধীনতার ব্যাপারে বারবার শেখ সাহেবের দ্বৈত ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, শেখ সাহেব ছাত্রলীগের স্বাধীনতাপন্থীদের পক্ষে ছিলেন। কিন্তু সেই মুহূর্তে স্বাধীনতার পক্ষে কোনো প্রস্তাব গ্রহণ যুক্তিযুক্ত মনে করেননি।
উপরের বর্ণিত আমার কথা থেকে আমিই অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়েছি। তাহলে দেশে কী হলো বা কী হতে যাচ্ছে? একটি দেশকে স্বাধীন করা সহজ নয়। একটি দেশের রাজনৈতিক স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য বিপ্লব হতে পারে। ক্ষমতা দখলের সংগ্রাম হতে পারে। কিন্তু নতুন মুক্তি সংগ্রাম না করে একটি দেশ ভাগ করে স্বাধীন হওয়ার প্রশ্নটি একান্তই ভিন্নতর। মুক্তি সংগ্রামের শ্রেণি সমন্বয় ও নেতৃত্বের সাথে স্বাধীনতা সংগ্রামের শ্রেণি সমন্বয় নেতৃত্বের ফারাক আসমান-জমিনের। এ ধরনের সংগ্রাম স্লোগান মুক্তির সংগ্রামে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকায় প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি এ সংগ্রামে সহযোগিতা করে না। এ সংগ্রামে তাদের নেতৃত্বের প্রশ্নই ওঠে না। অথচ এমন একটি সংগ্রামই ১৯৭১ সালে আমাদের সামনে হাজির হয়েছিল। যে সংগ্রামের আকাক্ষায় শোষণমুক্তির আকাক্ষা আছে। এ সংগ্রামের নেতৃত্ব আদর্শিকভাবে আদৌ শোষণমুক্তির পক্ষে নয়। অথচ একটি সংগ্রাম একান্তই আসন্ন। আমরা সকলেই সংগ্রামের কথা বলছি। ৭ মার্চ শেখ সাহেব স্বাধীনতা ঘোষণা না দেয়ায় তাঁর তীব্র সমালোচনা করছি। আবার সাথে সাথে তত্ত্ব হাজির করছি, শেখ সাহেবের মতো বুর্জোয়া নেতার পক্ষে এ ধরনের আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া আদৌ সম্ভব নয়। পৃথিবীর কোনো আন্দোলনে এ ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বলে আমার জানা নেই। অথচ এ রকম বিভ্রান্তির মধ্যেই ২৫ মার্চ এল। আর ২৫ মার্চ পূর্ব পর্যন্ত প্রত্যাশা দেওয়া হলো, যে কোনো মুহূর্তে পাকিস্তান সরকারের সাথে আপোষ রফা হতে পারে।
