৭১-এর সগ্রামে বামপন্থীদের কী ভূমিকা ছিল? এ প্রশ্ন আমি বারবার আলোচনা করেছি। তবুও প্রশ্ন উঠেছে ১৯৭০ সালে নির্বাচনের পর বামপন্থীরা কেন নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হলো? কেন তারা বুঝতে পারল না, কেন্দ্রের পাকিস্তান সরকার এ নির্বাচন মেনে নেবে না। ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা হয়ে উঠবে অবশ্যম্ভাবী।
এ ধরনের প্রশ্ন খুব প্রাসঙ্গিক হলেও বামপন্থীদের পক্ষে তখন এ ধরনের নেতৃত্ব নেয়া আদৌ সম্ভব ছিল না। আমি আগেই বলেছি পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির জন্মলগ্ন থেকেই বাপন্থী রাজনীতি ছিল নিষিদ্ধ। আইন দিয়ে নিষিদ্ধ না করে প্রতিটি বামপন্থী দলকে নির্যাতন চালিয়ে প্রায় অকেজো করে দেয়া হয়েছিল। দলের নামে কোনোদিনই তারা প্রকাশ্যে কাজ করতে পারেনি। সুতরাং কমিউনিস্ট পার্টি বা আমাদের শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল মুখ্যত এককালে যারা আরএসপি করতেন তাদের পক্ষে এ ধরনের নেতৃত্ব দেয়া আদৌ সম্ভব ছিল না। দ্বিতীয়ত অসুবিধা সৃষ্টি হয়েছিল মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্বের পর। মস্কো কেন্দ্রিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের মূলধারা বিভক্ত হয়ে যায়। মতানৈক্য দেখা দেয় রণনীতি ও রণকৌশল নিয়ে। আমরা আন্দোলনের স্তরকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর বললেও মস্কোপন্থী কমিউনিস্টদের কাছে এ আন্দোলনের স্তর ছিল জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর। পিকিংপন্থীদের কাছে ছিল জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তর। আমাদের তত্ত্ব অনুযায়ী এই স্তরে জাতীয় বুর্জোয়াদের কোনো ভূমিকাই ছিল না। মস্কোপন্থীদের তত্ত্ব অনুযায়ী জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে জাতীয় বুর্জোয়াদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। শ্রমিক শ্রেণির দলের সাথে তাদের নেতৃত্বের ভূমিকা থাকলেও বিপ্লবের নিয়ামক ভূমিকা পালন করে শ্রমিক শ্রেণির দল। অপরদিকে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরে জাতীয় বুর্জোয়াদের সহযোগী ভূমিকা থাকে গৌণ। মুখ্য ভূমিকা পালন করে শ্রমিক শ্রেণির দল।
এ তিন তত্ত্বকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই তিন তত্ত্বের দলগুলো জাতীয় বুর্জোয়াকে আদৌ তেমন দাম দেয়নি। এছাড়া প্রকৃতপক্ষে তকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আকাঙ্ক্ষায় বুর্জোয়া থাকলেও জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল না। তাই বামপন্থীদের কাছে এই শ্রেণিৰু কোনো স্বাধীন-নির্ভর ভূমিকা ছিল না। মনে করা হতো এদের সকল নীতি এবং কৌশলই বিদেশিদের দ্বারা প্রভাবিত। তাই আওয়ামী লীগের ৬ দফাঁকে প্রথমে সিআইএর দলিল বলে সকল বামপন্থী প্রত্যাখ্যান করেছিল।
তবে এরও একটি প্রেক্ষাপট ছিল। এ পটভূমির সৃষ্টি হয়েছিল দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়ন একটি বড় শক্তিতে পরিণত হয়। ইউরোপের একটি বড় অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব বলয়ে চলে যায়। সৃষ্টি হয় সমাজতান্ত্রিক শিবির। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ঔপনিবেশিক কবল থেকে স্বাধীনতা পায়। ১৯৪৯ সালে চীনের বিপ্লব হয়। এক-তৃতীয়াংশ পৃথিবীর সমাজতান্ত্রিক শিবিরে চলে যায়। পৃথিবী দুটি পরস্পর বিরোধী শিবিরে বিভক্ত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পাশ্চাত্যের শিবির। এই দুই শিবিরের সংঘাত ছিল প্রতিটি ক্ষেত্রে। এই সংঘাত বড় যুদ্ধে পরিণত হয়নি। তাই এই সংঘাতের কালটাকে স্নায়ু যুদ্ধ বা ঠাণ্ডা যুদ্ধের কাল বলে অভিহিত করা হূয়। এই ঠাণ্ডা যুদ্ধের অর্থ হচ্ছে আমরা আমরা এবং তোমরা তোমরা। অর্থাৎ আমরা যদি হই সমাজতন্ত্রী, তাহলে তোমরা সাম্রাজ্যবাদ। আমরা ছাড়া সবাই সাম্রাজ্যবাদী বা সাম্রাজ্যবাদীর এজেন্ট। মাঝখানে কেমনো কিছু নেই।
এই দুই শিবিরের তত্ত্ব শথিবীর দেশে দেশে এক সর্বনাশা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বামপন্থীরা জাতীয়তাবাদী শক্তিকে বিভিন্ন দেশের সাম্রাজ্যবাদীর এজেন্ট বলে অভিহিত করতে থাকে। আর অবশ্যম্ভাবী প্রতিফলন হয় আমাদের দেশে। ৬ দফার মধ্যে আমাদের দেশের মানুষের আশা আকাতার কথা থাকলেও আমাদের দেশের বামপন্থীরা তাকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ-এর দলির বলে প্রত্যাখ্যান করে।
তবে এখানে একটি ভিন্ন প্রশ্নও ছিল এবং সে প্রশ্নে বামপন্থীরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলেই আমার ধারণা। প্রশ্নটি হচ্ছে ৬ দফা আদায় নিয়ে। ৬ দফার শেষ কথা যে স্বাধীনতা, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর তা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব কে দেবে? পূর্ব পাকিস্তানের উঠতি বুর্জোয়াদের একটি অসংগঠিত দল আওয়ামী লীগ। এ দল স্বাধীনতার নেতৃত্ব দেবে, এ বিশ্বাস কোনো বামপন্থীর থাকার কথা নয়। এটাও লক্ষণীয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে কোন্দল ছিল। এই সংগঠন নিয়ে স্বাধীনতা আন্দোলন করা যাবে, এ বিশ্বাস কারো থাকার কথা নয়। বামপন্থীদের বিচারে এ ক্ষেত্রে আপোষ অবশ্যম্ভাবী ছিল।
সশস্ত্র সংগ্রামের পরিবেশেও ভারতবর্ষের নেতারা ব্রিটিশের সাথে আপোষ করেছে। সে ক্ষেত্রে ভারতের কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের শ্রেণিস্বার্থই ছিল মুখ্য। তাদের জনসমর্থন, অভিজ্ঞতা ও আন্দোলনের ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও তারা শুধুমাত্র শ্রেণিস্বার্থে ব্রিটিশের সাথে আপোষ করেছিল। তাদের ভয় ছিল অগ্নিগর্ভ ভারত এবং বামপন্থীদের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীতে বিদ্রোহ। সেই বিদ্রোহীদের নেতৃত্বে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হলে কংগ্রেস বা মুসলিম লীগের হাতে ক্ষমতা আসত না, যার কারণে ব্রিটিশের সাথে আপোষ। তাহলে আমাদের ক্ষেত্রে কী হবে। আওয়ামী লীগ বুর্জোয়াদের সংগঠন হিসাবেও কংগ্রেস বা মুসলিম লীগের মতো শক্তিশালী নয়। আওয়ামী লীগও চাইবে না বামপন্থীরা ক্ষমতায় আসুক। ফলে এই যুদ্ধে আওয়ামী লীগের সহায়ক শক্তি কে হবে? রাজনৈতিক ভুগোলের কারণে ভারত এ যুদ্ধের সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু ভারত একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। ভারত নিশ্চয়ই একটি শোষণমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের জন্যে বাংলাদেশের সাথে সহযোগিতা করবে না। ভারতের সহযোগিতায় যে দেশ স্বাধীন হবে সেই দেশের কাঠামোর সাথে পাকিস্তান নামক দেশটির কাঠামোর সাথে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে এ পরিবর্তন কাদের স্বার্থে? তাহলে নিঃসন্দেহে ভারত বা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এ আন্দোলনের বামপন্থীদের সহযোগিতা ভালো চোখে দেখবে না। তাদের খবরদারি কিছুতেই মানবে না।
