১০. প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে আমরা স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু করলে আমাদের সহায়ক শক্তি কে হবে? এ প্রশ্নে কারো সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, দেশ স্বাধীন হলে কোন ধরনের বাংলাদেশ গঠিত হবে? কোন সমাজ কাঠামো আমরা পাব? আমি যতোটুক জানি, ৭১-এর সংগ্রাম শুরু করার পূর্বে এ ধরনের প্রশ্ন নিয়ে আলোচনার কোনো অবকাশ ছিল না। আবার আলোচনা হলেও মতানৈক্য হওয়ার কোনো সম্ভাবনাও ছিল না। তাহলে আমরা কী সংগ্রাম করলাম? কোন যুক্তিতে সংগ্রাম করলাম? কাকে বন্ধু ভেবে সংগ্রাম করলাম? কোন সমাজের জন্যে সংগ্রাম করলাম? এ ধরনের কোনো প্রশ্নের জবাব না খুঁজেই আমরা কি ৭১-এর সংগ্রাম শুরু করেছিলাম না? এর পরিবর্তে বলা যায়, আমাদের ওপর হঠাৎ করে সগ্রাম চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। এ • সগ্রামের জন্যে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম না। তাই কথাটা এভাবে বলা যায় যে, পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের কর্ণধাররা পূর্ব পাকিস্তানকে তাদের হিসেব্বে খাতা থেকে খারিজ করে দিয়েছিল। তাদের পূর্ব পাকিস্তানের কাছ থেকে পাওয়ার মতো তেমন কিছু ছিল না। তাদের শোষণে পূর্ব পাকিস্তান তখন রিক্ত। পূর্ব পাকিস্তানকে যেনতেন প্রকারে ছুঁড়ে ফেলে দেয়াই তাদের একমাত্র কাজ ছিল। হয়তো তারা ভেবেছিল ১৯৭০-এর নির্বাচনে তাদের তাঁবেদাররা জয়লাভ করবে। তাদের তাঁবেদাররা জয়লাভ করলে হয়তো আরো কিছুদিন পূর্ব পাকিস্তানকে দাবিয়ে রাখা যাবে। কিন্তু ১৯৭০ সালে নির্বাচনে তাদের দালালরা পরাজিত হয়। একটি নতুন শক্তির উন্মেষ ঘটে। পাকিস্তানি শাসকদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায় যে, পূর্ব পাকিস্তানে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসন বা শোষণ চলবে না। আজ হোক, কাল হোক এক ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে তাদের বিদায় নিতে হবে। তাই তাদের সিদ্ধান্ত ছিল শেখ সাহেবের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার। বাংলাদেশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাক, এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করা। ৭০-এর নির্বাচনের পর এ ধরনের নীতি গ্রহণ করা না হলেও কিছুতেই ইয়াহিয়া কিংবা ভুট্রোর ভূমিকা ব্যাখ্যা করা যায় না। ব্যাখ্যা করা যায় না গঙ্গা নামক একটি ভারতীয় বিমানকে ছিনতাই করে লাহোরে ভস্মীভূত করা। এ ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে যুদ্ধটা পাকিস্তান সরকারই এগিয়ে এনেছে। এ যুদ্ধে জড়িয়েছে ভারতকে। আমাদের বিক্ষুব্ধ করেছে প্রতিদিনের ঘটনা। আজ সেকালের ঘটনার হিসেব দিলে দেখা যাবে আমরা সকলে প্রতিদিন সমঝোতার কথা বলেছি। আপোষের কথা বলেছি। আমাদের দাবি মেনে নেয়ার কথা বলেছি। কিন্তু আমাদের কোনো দাবি মেনে নেয়া হয়নি। আজকের অনেক রাজনৈতিক ভাষ্যকার বলেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কিছু করার ছিল না। তিনি সামরিক বাহিনীর হাতে বন্দি ছিলেন। ৭১-এর নাটকে খলনায়ক ছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। কিন্তু এ ভাষ্যকাররা কিছুতেই বলতে চায় না যে, ওটাই ছিল পাকিস্তানের রাজনীতি। ইয়াহিয়া, ভুট্টো, সেনাবাহিনী বা পাকিস্তানের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের এ ব্যাপারে ঐকমত্য ছিল। সে পরিপ্রেক্ষিতে আমার ধারণা ৭১-এর যুদ্ধ আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমাদের মধ্যে অনেকে এটা আঁচ করলেও নেতৃত্ব পর্যায়ে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না। জনসাধারণ ছিল একেবারে অন্ধকারে। নইলে ২৫ মার্চ রাতে লাখো লাখো মানুষ বেঘোরে প্রাণ হারাত না। একটি মুক্তিযুদ্ধের জন্যে যে জাতি প্রস্তুতি নেয়, তারা এভাবে কোনোকালে কোনোদিন প্রাণ দেয় না। আজকে সাহস করে বলতে হবে যে, সে রাতে হানাদার পাকিস্তানিদের হাতে লাখ লাখ সচেতন মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়নি। মারা গেছে নিরীহ নির্বিরোধ সাধারণ নাগরিক। এ মৃত্যুর জন্যে রাজনীতিকদের দায়িত্ব অস্বীকার করা যাবে না।
আমার এ লেখা দেখে মনে হতে পারে ৭১-এর সংগ্রামকে আমি একটি নেতিবাচক জায়গায় দাঁড় করাচ্ছি। যেন সবকিছুর জন্যেই দায়ী ছিল পাকিস্তান সরকার। পাকিস্তানই যেন আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম করতে বাধ্য করেছিল। আমার লেখা সম্পর্কে এ ধরনের ব্যাখ্যা সঠিক হবে না। আমি বলতে যাচ্ছি যে-তল্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের অধিকাংশ মানুষের উদাত্ত কামনা ছিল পাকিস্তানের শাসন বাঙালিদের হাতে থাকতে হবে। বাঙালিরা শাসন ক্ষমতায় না গেলে সকল ক্ষেত্রে আমরা বঞ্চিত এবং শোষিত হব এবং এ লক্ষ্যেই বাঙালিরা নৌকায় ভোট দিয়েছিল। প্রার্থীর যোগ্যতা সম্পর্কে কোনো চিন্তা তারা করেনি এবং সে নির্বাচনে বাঙালিরা জয়লাভ করেছিল। কিন্তু বাঙালির হাতে ক্ষমতা এল না এবং এ পরিপ্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন মুখ্য হয়ে উঠল। প্রশ্নটি হচ্ছে-বাঙালির হাতে যদি ক্ষমতা দেয়া না হয় তাহলে বাঙালিরা কী করবে? নির্বাচনের বিকল্প কী? বাঙালি কি হাতে অস্ত্র নেবে? বাঙালি কি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে দেশকে স্বাধীন করবে? মিছিলে-সমাবেশে এবং জনসাধারণ এ ধরনের স্লোগান উঠলেও সারাদেশের মানুষের কাছে সগ্রামের এ অধ্যায়টি স্পষ্ট ছিল না। এ ধরনের অভিজ্ঞতা তাদের থাকার কথা নয়। তাদের বলা হয়েছিল, নৌকায় ভোট দাও। বাঙালির প্রতিনিধি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গেলে সব দুঃখের অবসান হবে, সকল বঞ্চনার শেষ হবে।
কিন্তু ক্ষমতায় না গেলে কী হবে? ১৯৫৪ সালের মতো বাঙালিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে কী হবে? শ্লোগানে শ্লোগানে বলা হতো ছয় দফার শেষ কথা স্বাধীনতা স্বাধীনতা। কিন্তু সেই শ্লোগানের স্বাধীনতাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার কোনো রাজনীতি বা কৌশল ছিল না। তাতে মনে হচ্ছিল এ শ্লোগান ছিল শুধুমাত্র স্লোগানের জন্যে। এ শ্লোগান ছিল দর কষাকষির হাতিয়ার এবং এ পরিপ্রেক্ষিতে বামপন্থী একটি মহলের ধারণা ছিল আপাতত সব আন্দোলনের মূল কথা ছিল আপোষ। আপাতত আপোষে ক্ষমতা দখল। আর একবার ক্ষমতা দখল করতে পারলে পরবর্তীকালে বাংলাদেশকে স্বাধীন করার চেষ্টা হবে। এ প্রেক্ষাপটে নিশ্চই প্রশ্ন উঠতে পারে সেকালে বামপন্থীরা সর্বশেষ পর্যায়ে এসেও কেনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না। সে প্রশ্নের জবাবে পরে আসছি।
