১. ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বাঙালিয়ানার কোনো সম্পর্ক ছিল না।
২. ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ভাষাভিত্তিক মানসিকতার একটি প্রাথমিক স্তর সৃষ্টি হয়।
৩. ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেও ক্ষমতা না পাওয়ায় বাঙালিদের মনে একটা স্বতন্ত্র ধারণা সৃষ্টি হয় এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের ২১ দফায় স্বায়ত্তশাসনের কথা প্রথম উচ্চারিত হয়।
৪. ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পরে বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের ফলে স্বতন্ত্র দেশ গড়ার আন্দোলন পিছিয়ে যায়। ১৯৫৬ সালের সমঝোতার মাধ্যমে একটি সংবিধান তৈরি হয়। সেই সংবিধানে দুই ইউনিটের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে ভাগ করা হয়। দুই ইউনিট অর্থাৎ পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানকে সব ব্যাপারে সমান সুযোগ দেয়ার বিধান রাখা হয়। অথচ পাকিস্তানের জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ জন ছিল বাঙালি। সংবিধানে এ ধারার বিরুদ্ধে জনমনে বিক্ষোভ ছিল। ধারণা করা হয়েছিল ১৯৫৮ সালে সাধারণ নির্বাচন হবে এবং এ নির্বাচনের পর হয়তো সমস্যার একটা সমাধান হবে। কিন্তু সে নির্বাচন এল না। ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি হলো। গণতন্ত্র নির্বাসিত হলো সমগ্র পাকিস্তান থেকে এবং তার প্রথম শিকার হলো নতুন গড়ে ওঠা বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ। বাঙালি সংস্কৃতির ওপর আঘাত এলো। একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে উঠল যে, বাঙালি হিসেবে বেঁচে থাকতে হলে একটা কিছু করতে হবে। কিন্তু তখনো রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের চিন্তা দানা বেঁধে ওঠেনি।
৫. সামরিক শাসনামলে বাঙালি সরকারি বেসরকারি আমলারা অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝতে শিখল যে, পাকিস্তানের কাঠামোয় তাদের জীবনের কোনো নতুন কিছু ঘটবে না। কর্মজীবনে কোনো উন্নতি করতে হলে বাঙালির শাসন প্রয়োজন।
৬. এই মানসিক পরিস্থিতিতে ১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের। যুদ্ধ হলো। এ যুদ্ধ চলেছিল ১৭ দিন। এ যুদ্ধের সময় প্রমাণিত হলো যে, ভৌগোলিক অর্থে আমরা পাকিস্তানের অঙ্গ নয়। আমরা পূর্ব পাকিস্তান ছিলাম একান্তই অরক্ষিত। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমাদের রক্ষা করা সম্ভব নয় এবং সম্ভব ছিলও না। ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের সময় যে কোনো মুহূর্তে আমাদের ধ্বংস্তূপে পরিণত করতে ভারতের কোনো অসুবিধা ছিল না। সবচেয়ে মজার হচ্ছে-১৯৬৫ সালের যুদ্ধ সকলকে কট্টর পাকিস্তানিতে পরিণত করেছিল। সে যুদ্ধে ভারতকে ধ্বংস করো’ এটাই ছিল আমাদের একমাত্র শ্লোগান। সে যুদ্ধের পরপরই সব কিছু পাল্টে গেল। যুদ্ধে প্রমাণিত হলো আমরা অরক্ষিত এবং সকলের মনে অনিবার্য সিদ্ধান্ত হলো যে, আমাদের নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকতে হবে। আমাদের কেউ বাঁচাতে আসবে না। অর্থাৎ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র চাই। আর এই পরিবেশেই যৌক্তিক হয়ে দেখা দিল ১৯৪০ সালের মুসলিম লীগের লাহোর প্রস্তাব। এ প্রস্তাবে বলা হয়েছিল দু’টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র নিয়ে পাকিস্তান গঠিত হবে। দু’টি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হলে তার নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকে। অথচ ১৯৪৭ সালে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়নি। দুটি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে পাকিস্তান নয়, পাকিস্তান একটি এককেন্দ্রিক সরকারে গঠিত হয়েছিল। ফলে পূর্ব পাকিস্তানের স্বতন্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকার আদৌ প্রশ্ন ছিল না। সেই প্রশ্নই বাস্তব হয়ে দেখা দিল ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর এবং আমার ধারণা ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের ধারণা পূর্ণতা লাভ করে। কারণ রাষ্ট্র স্বাধীন না হলে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও স্বাধীন হয় না।
৭. আমি বলার চেষ্টা করেছি যে, জাতীয়তাবাদী এ আন্দোলনের নেতৃত্ব বামপন্থীদের গ্রহণের কথা থাকলেও পাকিস্তানের নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বামপন্থীদের এ সংগ্রামে নেতৃত্ব গ্রহণের আদৌ কোনো সম্ভাবনা ছিল না।
৮. আমি আরো বলতে চেয়েছি যে, সর্বশেষ বিচারে শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা ভাসানী বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাইলেও পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা ও গভীর আত্মিক যোগাযোগ থাকার কারণে তাঁরা পাকিস্তানের কাঠামোতে একটি সমাধান বের করার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ঐতিহাসিক কারণেই তারা সফল হননি।
৯. আমার ধারণা ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পর খুব দ্রুত গতিতে ঘটনা পাল্টাতে থাকে। বিশেষ করে বিক্ষুব্ধ সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের একটি অংশ নিজেদের উদ্যোগেই একটা কিছু করার চেষ্টা করতে থাকে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কিংবা মানসিক দিক থেকে তেমন প্রস্তুত ছিলেন না। ফলে আগরতলা ষড়যন্ত্র নামক বিদ্রোহের ঘটনা সাধারণ মানুষকে যেমন স্তম্ভিত করে দেয় তেমনি রাজনৈতিক নেতৃত্বকেও বিপদে ফেলে দেয়। আজকে হয়তো অনেকেই স্বীকার করবেন না যে, তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার কথা প্রকাশ হওয়ার পরে জনসাধারণ কিন্তু স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রথমেই এ মামলাকে সমর্থন জানায়নি। এ মামলা নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি ছিল। অথচ রাজনৈতিক জীবন থেকে এ মামলাকে মুছে ফেলা যাচ্ছিল না। এ মামলার পাশাপাশি ছয় দফা ও এগারো দফা আন্দোলন ছাত্ররা গড়ে তোলে। প্রকৃতপক্ষে ছয় দফা ও এগারো দফা বাস্তবায়নের একটি ছোটোখাটো মডেল হিসেবে তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আবির্ভূত হয়। অর্থাৎ সেদিন যা কল্পনায় ছিল তা যে বাস্তবায়ন করা যায় তথাকথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা ছিল তার একটা নজির। এ মামলা মানুষের কাছে পরিষ্কার করে দেয় যে, আমরা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে সামরিক বাহিনীরও সমর্থন পাব। আর দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এ পরিস্থিতির জন্যে রাজনৈতিক নেতৃত্ব আদৌ প্রস্তুত ছিল না। ছয় দফা এগারো দফার আন্দোলন মুখ্যত ছিল আবেগ নির্ভর এবং স্বতঃস্ফূর্ত। এ ছাড়া ছয় দফা, এগারো দফা নিয়ে ডান ও বাম রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে মতানৈক্য ছিল। সুতরাং ছয় দফা ও এগারো দফার আন্দোলনকে স্বাধীনতা আন্দোলনে পরিণত করা যাবে ঠিক তার কোনো সত্যিকার ছবি কারো মাথায় ছিল না। সীমিত ক্ষেত্রে কেউ কেউ স্বাধীনতার কথা চিন্তা করলেও তাদের চোখের সামনে বাধা ছিল হিমালয় পরিমাণ।
