তবে সে আন্দোলনও তখন তেমন জোরদার ছিল না। কারো মনে তেমন রেখাপাত করেনি। এবং সে আন্দোলন যে কত ঠুনকো তা প্রমাণিত হয় ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়। আমি তখন তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন কিভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। পরবর্তীকালে যারা দারুণ বাঙালি হয়েছে স্বাধীনতার পর অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছে বা এখনো পাচ্ছে, আমি তাদের দেখেছি পাকিস্তান বেতারে যেতে। দেখেছি গান লিখতে। গানে সুর দিতে। নিজেরা গান করতে। ঢাকা শহরে মিছিল করতে। গাড়িতে ‘ক্রাশ ইভিয়া স্টিকার লাগিয়ে শহরময় ঘুরে বেড়াতে। যারা স্টিকার লাগাইনি তারা হয়েছি তাণ্ডবের শিকার। আমাদের এককালের সকলের পরিচিত বন্ধু খালেকদাদ চৌধুরী এর মধ্যে একদিন প্রেস ক্লাবে এসে বললেন, নির্মল বাবু, এক আন্তর্জাতিক রায়টের ছবি দেখছি প্রতিদিন। আমরা দুটি রাষ্ট্রের মানুষ সকলে হিন্দু-মুসলমান হয়ে গেছি। আমরা পরস্পরের বিরুদ্ধে কথা বলছি। বিহার থেকে আসা শরণার্থী বিমানবাহিনীর আলম এখন আমাদের জাতীয় নেতা। কারণ সে ভারতের ১১টি বিমান ধ্বংস করেছে। অর্থাৎ সমগ্র দেশে ১৯৪৭ সালের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সে যেন ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’-এর পরিবেশ।
আমি কিন্তু খুব অবাক হইনি। আমি নিজেও তখন আশ্রয় খোঁজার জন্যে অস্থির। পাক-ভারত যুদ্ধ হচ্ছে। আমার বাবার নাম বাংলায়। আমি রাজনীতি করি। তাই আমাকে তো জেলে যেতেই হবে। পরদিন খবরের কাগজে দেখলাম কমিউনিস্ট, অ-কমিউনিস্ট সকল হিন্দু নেতাকেই গ্রেফতার করা হচ্ছে। আমি প্রখ্যাত সাংবাদিক মোহাম্মদ মোদাব্বেরকে ফোন করলাম। বললাম, দেখুন ছাত্ররাজনীতি করে দীর্ঘদিন জেল খেটেছি। হিন্দু হিসেবে জেল খাটতে রাজি নই। আমি তখন দৈনিক পাকিস্তানের সহসম্পাদক। আমি তাকে বললাম, আমি যাতে গ্রেফতার না হই তার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিভিন্ন কারণে মোদাব্বের সাহেব তখন সকল মহলে বিশেষ প্রভাবশালী। তিনি জানালেন, তুমি এ সময় ঢাকা ছেড়ে কোথাও যাবে না। দেৰি কী করা যায়। তখন দৈনিক পাকিস্তানের বার্তা সম্পাদক তোয়াব খান। আমি তাকে বললাম, আমি রাতের শিফটে কাজ করব প্রতিদিন। তখন রাতে যখন তখন সাইরেন বাজত। রাতে কেউই কাজ করতে চাইত না। সুতরাং আমি রাতের শিফটে বহাল হয়ে গেলাম।
কিন্তু দেখলাম, আমার এই রাতের শিফটের কাজও আমাকে বিপদে ফেলে দিবে। আমি সাংবাদিকতা ছাড়াও বিভিন্ন বাড়িতে তখন শিক্ষকতা করতাম। উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার থেকে বিশ্ববিদ্যালস্ত্রের অধ্যাপকদের বাড়ি পর্যন্ত শিক্ষক হিসেবে আমার অবাধ যাওয়া-আসা ছিল। আমি দেখলাম, আমার রাতে চাকরি করা নিয়ে সর্বত্রই সংশয় সৃষ্টি হয়েছে। আমার এক তরুণ ছাত্র একদিন বলেই বসল, স্যার, আপনাকে সত্যি সত্যি কেউ বিশ্বাস করে না। সবাই বলে রাতে দৈনিক পাকিস্তান থেকে আপনি ভারতে খবর পাঠিয়ে দেন। তাদের অজ্ঞতা আমার হাসি যোগাত। আমার এক প্রিয় ছাত্রী, যে বেতারে গান গেয়ে পাকিস্তানকে বাঁচাবার জন্যে সকাল-সন্ধ্যা পরিশ্রম করত, যুদ্ধের পর সেও একদিন আমাকে বলে বসল, স্যার যুদ্ধের সময় আপনাকে কখনো বিশ্বাস করিনি। আর এখন মনে হচ্ছে আপনার কথাই ঠিক। পৃথিবীতে একটি অনন্য যুদ্ধ হলো। যে যুদ্ধে দুই দেশই দাবি করে বসল যে, উভয়ই জিতেছে এবং বিজয়ীদের পুরস্কৃত করা হলো। এ ভাওতাবাজির তুলনা নেই।
আমি তখন এ সকল বিতর্কে যোগ দিতাম না। আমার কাছে ছিল সে এক বিরাট অভিজ্ঞতা। ছাত্র-যুবক রাজনৈতিক দলের সেকালের ভাষণ বিবৃতি আমার আজকেও মনে আছে। আমরা তখন নিখাদ পাকিস্তানি। মস্কোপন্থী কমিউনিস্টরা বিভ্রান্ত। সাহস করে কথা বলতে চাচ্ছে না। পিকিংপন্থীদের মুসলিম লীগের সাথে পৃথক করে দেয়া অসম্ভব হয়ে উঠত। অনেকের কাছে বিতর্কিত হলেও মওলানা ভাসানীকেই তখন আমার কিছুটা মনে হয়েছে তিনি জনগণের মন বুঝতেন। তিনি চেষ্টা করেছেন ওই সঙ্কটের সময়ও কিছুটা নেতৃত্ব দিতে। আমার কথা হচ্ছে–এর পরের ইতিহাস কি খুব চমকপ্রদ নয়? ১৯৬৫ সালে আমরা ভারতের সাথে যুদ্ধ করলাম। ভারতকে ধ্বংস করার শ্লোগান দিলাম। একটা নতুন পাকিস্তানি পরিবেশ সৃষ্টি করলাম। আবার বছর যেতেই ছয় দফা দাবি পেশ করা হলো। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে এটা কি ভোজবাজি? ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ রাতারাতি কি পাকিস্তানবিরোধী হয়ে গেল। পাকিস্তান রক্ষার জন্যে জান কোরবান করে আবার বছর না ঘুরতেই পাকিস্তান ভাঙতে চাইল।
আমার এ লেখা একান্তভাবে আমার অভিজ্ঞতাপ্রসূত। আমি সমসাময়িক খবরাখবরের ওপর ভিত্তি করে আমার বক্তব্য বলার চেষ্টা করেছি। আমার বিবেচনায় পাকিস্তানের জন্মের পর একাত্তর সালের সংগ্রাম পর্যন্ত আমাদের দেশের রাজনীতি অনেক বাঁক ও মোড় নিয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রশ্নটি পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে আসেনি। এমনকি আমার ধারণা হচ্ছে–১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে বাঙালিদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। পাকিস্তান আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এ আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল। আমি শুনেছি, পাকিস্তান সৃষ্টির পূর্বেই মুসলিম ছাত্রলীগের একটি অংশ কলকাতা থাকতেই বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার চিন্তা করছিল। তবে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল অর্থাৎ পূর্ব বাংলায় এ দাবি প্রথম তুলেছিল তমুদ্দিন মজলিশ, যারা শেষ পর্যন্ত ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিল। আমার এ ধরনের ব্যাখ্যা সম্পর্কে বহু কথায় আমি ইতোপূর্বে লিখেছি। সেই সকল ব্যাখ্যা একের পর এক সাজালে নিম্নরূপ দাঁড়ায়। আমার মতে–
