জেলখানায় আবার উল্টো গল্পও শুনেছি। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম অভিযুক্ত ছিলেন ঢাকার কমরেড গোপাল বসাক। ১৯৪৯ সালে তিনি গ্রেফতার হন। গ্রেফতার হওয়ার পর তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তিনি আগে কোনোদিন গ্রেফতার হয়েছিলেন কি? অর্থাৎ সে এক অজ্ঞতার গভীর অন্ধকারের যুগ। আর এ সুবাদে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটিতে কমিউনিস্ট বা সমাজতন্ত্রী অর্থে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুদেরই বোঝাত। তবে এ সুযোগ আমার কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুরাও নিয়েছেন। তাঁরা বলতেন, তারাই একমাত্র সাচ্চা কমিউনিস্ট। আর সবাই সাম্রাজ্যবাদের দালাল। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে বলা মানে সমাজতন্ত্রের বিপক্ষে বলা। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে যাঁরা বলেন, তাঁরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট। সে অর্থে কমিউনিস্ট বন্ধুদের ভাষায় আমরা ছিলাম সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট। আমরা যেমন লেনিন পরবর্তী স্ট্যালিনের নীতি ভুল বলতাম। যেমন বলতাম যে পূর্ব ইউরোপে আদৌ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়নি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের জয়ের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের লাল ফৌজ দেশে ফিরে যাবার পথে পূর্ব জার্মানি পোল্যান্ড, চেকোশ্লাভিয়া, বুলগেরিয়া এবং আলবেনিয়ার কমিউনিস্ট পার্টিকে উপর থেকে ক্ষমতায় বসিয়ে দিয়ে গেছে। শুধুমাত্র রুমানিয়া যুগোশ্লাভিয়ায় বিপ্লবের পরিস্থিতি ছিল। কিন্তু লাল ফৌজের হস্তক্ষেপে সেখানে বিপ্লব হওয়ার পরিবর্তে তাবেদার সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তাই আমরা বলতাম, পূর্ব ইউরোপে কোনো বিপ্লব হয়নি এবং প্রতিবিপ্লব অবশ্যম্ভাবী। কমিউনিস্ট বন্ধুরা বলতেন জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব হয়েছে এ সকল রাষ্ট্রে। তবে তকালীন কোনো তাত্ত্বিকই বলতে পারেননি যে সেই জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব থেকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব উত্তরণের পথ কী। আমাদের এ সমালোচনার জবাব দিতে না পেরে আমাদের নির্ভেজাল মার্কিন দালাল বলে অভিহিত করা হয়।
চীনের বিপ্লব সম্পর্কেও আমাদের ভিন্ন বক্তব্য ছিল। চীন কখনো দাবি করেনি যে চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়েছে। এ নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবে জাতীয় বুর্জোয়ারা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। আমাদের সমালোচনা ছিল এই বিপ্লবও বিপদে পড়বে। বিপ্লবের সহযোগী বলে কথিত জাতীয় বুর্জোয়ারা ষড়যন্ত্র করবে। দেশি-বিদেশি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সহযোগিতায় প্রতি বিপ্লব ঘটাতে চাইবে নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। শ্রেণি সমন্বয়কারী জোটের নেতৃত্বে শ্রেণিসংগ্রাম করা যায় না।
আমরা এখনো বিশ্বাস করি পূর্ব ইউরোপ সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য সঠিক ছিল। চীন সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য যে সঠিক ছিল তার প্রমাণ দিয়ে গেছেন প্রয়াত কমরেড মাও সে তুং। শ্রেণি সমন্বয়ের রাজনীতির বিরুদ্ধে তিনি সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু করেছিলেন। কিন্তু সফল হননি। সেকালে আমাদের এ সমালোচনার জন্যেও আমরা মার্কিন দালাল বলে অভিহিত হতাম।
তবে আগেই বলেছি সব কিছুর একটা পরিবর্তন আসে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব শুরু হলে। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের কাছে তাদের বিরোধী সকলের ছিল সাম্রাজ্যবাদের দালাল। তারাই ছিল একমাত্র সাচ্চা বিপ্লবী। তাদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বললে বলা হতো নিশ্চয়ই এরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অর্থ পেয়েছে।
চীন-রাশিয়া দ্বন্দ্ব শুরু হলে এ চিত্রের পরিবর্তন হয়। কমিউনিস্ট আন্দোলন মুখ্যত মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী হিসেবে ভাগ হয়ে যায়। তাদের নিজেদের মধ্যকার গালিগালাজ মুখ্য হয়ে ওঠে। কতটুকু সাচা বিপ্লবী সে তত্ত্ব প্রমাণেই সকলে গলদঘর্ম এবং আমাদের বিরুদ্ধে ছুঁড়ে দেয়া মন্তব্যগুলোই তাদের ঝগড়ার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াল। একটি বড় ধরনের সর্বনাশ হয়ে গেল পৃথিবীর কমিউনিস্ট আন্দোলনে। দল ভাগাভাগির নামে যে কেউ এখন দলের সদস্য পদ পেতে শুরু করল। নতুন নেতৃত্ব এল যাদের জ্ঞানের পরিধি একান্তই সীমিত। রাতারাতি মস্কোপন্থী পিকিংপন্থীতে পরিণত হল। আবার অনেক পিকিংপন্থী পরিণত হলো মস্কোপন্থীতে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেল। নেতৃত্ব রক্ষাই বড় হয়ে উঠল।
সেকালের সে সর্বনাশা চিত্রের একটি আবছা আদল আজকের জাতীয় রাজনীতিতে আছে। লক্ষ করলে দেখা যাবে সেকালে যারা পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট বলে পরিচিত ছিল তাদের মধ্যে অনেকে এখন বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলের সদস্য। মস্কোপন্থী বলে পরিচিত অনেকে আওয়ামী লীগের সদস্য।
লক্ষণীয় যে আজকের এ পরিণতির ইতিহাস শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে। ষাটের দশকেই মস্কো-পিকিং দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। এই দ্বন্দ্বে কমিউনিস্ট পার্টি দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। আর এ ষাটের দশকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন বাহ্যত দানা বাঁধতে শুরু করে। তাই আমার নিজের ধারণা ব্যক্তি বা উপদল হিসেবে বামপন্থীদের কিছু নেতা ও কর্মী বিচ্ছিন্নভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সম্পর্কে ভাবলেও মস্কোপন্থী বা পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট বলে পরিচিত দলগুলোর পক্ষে তখন বাংলাদেশ স্বাধীন করা সম্পর্কে স্থির কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব ছিল না।
এছাড়া মনে রাখতে হবে যে আমি যে ধরনের পিকিংপন্থী বা মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির কথা বলেছি সে ধরনের কোনো পার্টি তল্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে কাজ করত না। দুটি দলকেই ভাসানী, ন্যাপ ও মোজাফফর ন্যাপ নামে কাজ করতে হতো। ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপকে বলা হতো পিকিংপন্থী। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের নেতৃত্বে পরিচালিত ন্যাপকে মস্কোপন্থী বলা হতো। এ দুটি দল কোন অর্থেই কমিউনিস্ট পার্টি ছিল না। এ দুটি দলে বিভিন্ন মত শ্রেণি ও পেশার লোক ছিল। ফলে এ দুটি দলের সাধারণভাবে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশ স্বাধীন করার লক্ষ্যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আন্দোলন পরিচালনা করা আদৌ সম্ভব ছিল না। এ দুটি দলের পেছনের শক্তি ছিল আত্মগোপনকারী মস্কোর অনুসারী কমিউনিস্ট পার্টি আর পিকিং অনুসারী বহুধা বিভক্ত কমিউনিস্ট দল ও উপদল। এই উপদলের মধ্যে একমাত্র মেননপন্থী ছাত্র ইউনিয়নে পক্ষ থেকেই ১৯৬৮ সালে স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গঠনের আহ্বান জানানো হয় প্রকাশ্যে। এর কিছুদিন পর থেকে অথবা একই সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে সিরাজ সিকদারের পূর্ববাংলা সর্বহারা পার্টি। তবে দল হিসেবে এরা কোনোদিনই প্রকাশ্যে আসেনি। তাই প্রথমেই আমি বলতে চেয়েছি যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের বয়স যতই হোক না কেন, এ আন্দোলন প্রথম দিকে কোনো রাজনৈতিক দলই সুসংগঠিতভাবে শুরু করেনি। প্রথম নেতৃত্ব এসেছিল বিক্ষুব্ধ সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের পক্ষ থেকে। তারাই আগরতলা ষড়যন্ত্র নামক বিদ্রোহের নেতা। আর প্রায় একই সময় ষাটের দশকের প্রথম দিকে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের একটি অংশ গোপনে হলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা বলতে শুরু করে।
