স্ট্যালিন সম্পর্কে ক্রুশ্চেভের মূল্যায়ন এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের তত্ত্ব সমগ্র পৃথিবীকে মুখ্যত সমাজতান্ত্রিক শিবিরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে। চীনের এর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। চীনের কমিউনিস্ট পার্টি কুশ্চেভের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট নীতি গ্রহণ করে আর শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। একটি মস্কোপন্থী অপরটি পিকিংপন্থী।
সেকালের পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে। এককালে সবাই মিলে যারা মস্কোপন্থী বলে অভিহিত হতো তারা মস্কো ও পিকিং এ দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন সম্পর্কে যে অপবাদ ছিল যে–তারা দেশীয় রাজনীতির ভিত্তিতে কোনো কিছু নির্ণয় করে না। আন্তর্জাতিক নীতিই তাদের সবচেয়ে বড়ো নিয়ামক শক্তি। সেই অপবাদই আবার প্রমাণিত হলো। দেশের সমস্যার নিরিখে নয়, বিদেশের নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে গেলো। এককালে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সম্পর্কের নিরিখে দেশীয় কমিউনিস্ট পার্টি নিজস্ব সরকার সম্পর্কে নীতি নির্ধারণ করত। এবার সে রূপ পাল্টে গেল। পাকিস্তানের শাসন কর্তা আইয়ুব খানের সঙ্গে সমর্থন জানাল। মস্কো সরকারের সাথে আইয়ুব খানের সম্পর্ক ভালো নয় তাই মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি আইয়ুব বিরোধী হয়ে গেল।
তবে এ ক্ষেত্রে ভারতও একটি ফ্যাক্টর। ভারত সরকার তার জন্মলগ্ন থেকে রাজনৈতিক কারণে নিরপেক্ষ থাকতে চেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চোখে এ নিরপেক্ষ থাকার অর্থ হচ্ছে–সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে থাকা। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যেই ভারতের বিরোধিতা করত। আর ভারত সোভিয়েত ইউনিয়নের বন্ধু বলে নিশ্চয়ই চীনের বন্ধু নয় এবং পাকিস্তানেরও বন্ধু নয়। আর এ তত্ত্ব অনুসারে বাংলাদেশের মস্কোপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি কিছুটা ভারতপন্থী আর পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি কিছুটা ভারত বিরোধী। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীন বাংলাদেশের আন্দোলন ষাটের দশকের প্রথম দিকে মস্কোপন্থী কোনো কোনো মহলে হালে পানি পেলেও পিকিংপন্থীরা মনে করতে বাংলাদেশ স্বাধীন করার আন্দোলন হচ্ছে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র ষড়যন্ত্র। তাই ছয় দফা সম্পর্কে তীব্র প্রতিক্রিয়া ছিল বামপন্থী মহলে।
তবে সেকালের প্রেক্ষাপটে ভারতবর্ষ বা পাকিস্তান ভাঙার ব্যাপারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ভূমিকা ছিল না তা হলফ করে বলা যাবে না। তবে আমাদের বামপন্থীদের অসুবিধা হচ্ছে–আমরা কোনোদিনই কোনো ঘটনাকে নিজস্ব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেখতে চাই না। আমরা বুঝতে চেষ্টা করি না যে কোনো ষড়যন্ত্রই উর্বর ভূমি না থাকলে সবল হয় না। পাকিস্তান আন্দোলন সম্পর্কে আমরা বলতাম-এটা ব্রিটিশ ষড়ষন্ত্র। অথচ কেউ ব্যাখ্যা করিনি, আপামর মুসলিম জনসাধারণ কেন পাকিস্তানের পক্ষে চলে গেল। কেন আমাদের পক্ষে এল না। এ সত্যটি অনুসন্ধান করে জানতে পারলে এ উপমহাদেশের ইতিহাস ভিন্নরকম হতো।
একই ধরনের মনোভাব আমরা ছয় দফা নিয়ে দেখিয়েছি। শেখ মুজিবুর রহমান ছয় দফা দিলেন। আমরা বললাম সিআইএ’র দলিল। অথচ সাধারণ মানুষ তাঁর কথা গ্রহণ করল। কেন গ্রহণ করল এ সত্যটি বুঝবার চেষ্টা করলে নিশ্চয়ই এ আন্দোলনে আমরা নেতৃত্ব দিতে পারতাম। আমার ধারণা এ প্রশ্নে আমার কমিউনিস্ট বন্ধুরা আন্তর্জাতিক তত্ত্বের শিকার হয়েছেন। আন্তর্জাতিক শত্রু-মিত্রের পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় শত্রু-মিত্র নিরূপণের চেষ্টা হয়েছে। কখনো জাতীয় সমস্যা চোখের সামনে আসেনি। জাতীয় সমস্যা দেখা দিয়েছে আন্তর্জাতিক সমস্যার প্রতিক্রিয়া হিসেবে। তাই প্রতিটি সমস্যার কালে ইংরেজিতে বলা যায়–আমরা ইর্ড করিনি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বামপন্থীদের তেমন ভূমিকা ছিল না। ছিটেফোঁটা উপদল ছাড়া কেউ ১৯৭১ সালের ১ মার্চের আগে এ প্রশ্নটিকে গুরুত্ব দেয়নি।
তবে এর পরেও প্রশ্ন থাকে। প্রশ্নটি হচ্ছে ১৯৬২ সালে ছাত্রলীগ বাংলাদেশ স্বাধীন করার সিদ্ধান্ত নিলেও আওয়ামী লীগ তার ছয় দফা দাবি পেশ করতে আরো চার বছর কেন দেরি করল? ছাত্রলীগের এ চিন্তা-ভাবনায় কি ছিল? লক্ষণীয়, ছাত্রলীগের এ অংশটি ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে তেমন ভূমিকা নেয়নি। আবার এরাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল জাসদ গঠন করে। তাহলে কি জাসদ গঠনের প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল ষাটের দশকে? আমি এ প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করব পরবর্তী লেখায়।
সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে চীন আবির্ভূত হওয়ার পরে কমিউনিস্ট মহলে একটি নতুন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা অর্থাৎ আরএসপির সদস্যরা ব্যতীত এক সময় সকলেই ছিল মস্কোর অনুসারী। কমিউনিস্ট। গণতান্ত্রিক সমাজবাদ অর্থাৎ সোশ্যাল ডেমোক্রেসি পৃথিবীর এ অংশে তেমন ছাপ ফেলতে পারেনি। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট নেতৃত্ব সম্পর্কে আমাদের এই এলাকায় ধ্যান-ধারণা তখন তেমন স্বচ্ছ ছিল না। মনে করা হতে কমিউনিস্ট মাত্রই মস্কোপন্থী। অর্থাৎ সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুসারী। অজ্ঞতা ছিল একান্তই গভীর। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৪৮ সালে বরিশালে মে দিবস পালনের জন্যে পুলিশের কাছে অনুমতি প্রার্থনা করা হয়েছিল। পুলিশ লিখে দিয়েছিল, দিবসটি রাশিয়ার। সুতরাং এ দিবস পালনের অনুমতি দেয়া যাবে না। ১৯৫০ সালে আওয়ামী লীগ নেতা অধ্যাপক পুলিন দে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ ছিল তাঁর হাতে ম্যাক্সিম গোর্কির ‘মা’ বইটি ছিল! পুলিশের কাছে ম্যাক্সিম অর্থ মার্কসিজম অর্থাৎ কমিউনিজম। সুতরাং রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে এ পুস্তক বহনকারীকে গ্রেফতার করা একান্তই কর্তব্য।
